স্টাফ রিপোর্টার
চাঁদপুরের বাবুরহাট-মতলব-পেন্নাই সড়কটি অবশেষে দুই লেনে উন্নীত হচ্ছে। চাঁদপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগ ইতোমধ্যে সয়েল টেস্টসহ সড়কের ডিজাইন ও অন্যান্য কার্যাদি সম্পন্ন করেছে। বর্তমানে জিওমেট্রিক ডিজাইন অর্থাৎ বাঁধ সরলীকরণ নকশা ও নারায়ণপুর বাজারের ব্রিজের ডিজাইন চূড়ান্তকরণের অপেক্ষায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
জানা যায়, বর্তমানে এ সড়কের চাঁদপুর অংশে প্রায় ২৮ কিলোমিটার ও কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দির ১৪ কিলোমিটারের মধ্যে ৫৬টি ছোট-বড় বাঁক রয়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি বাঁক মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে যানবাহনগুলো চরম ঝুঁকির মধ্যে ঐ সড়কে চলাচল করে।
এদিকে বাবুরহাট-মতলব-পেন্নাই আঞ্চলিক মহাসড়কে বাঁক পার হয়ে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলছে হাজারো যানবাহন। এতে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। হতাহত হচ্ছেন যাত্রীরা। সময় অপচয়ের পাশাপাশি গুণতে হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়া।
কুমিল্লা ও চাঁদপুর সওজ বিভাগ এবং স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৫ সালে চাঁদপুরের বাবুরহাট থেকে মতলব দক্ষিণ উপজেলা সদর হয়ে কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার পেন্নাই এলাকা পর্যন্ত বাবুরহাট-মতলব-পেন্নাই নামে ৩৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এ আঞ্চলিক মহাসড়ক নির্মাণ করা হয়। সড়কটি চালুর সময় বাঁক ছিল দুই শতাধিক। ২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সড়কটির বাঁক নিরসন, ভূমি অধিগ্রহণসহ অন্যান্য সংস্কার কাজে ব্যয় হয় ৮৯ কোটি টাকা। এতে ৪০টি বাঁক নিরসন করে সোজা করা হয়। প্রয়োজনীয় বরাদ্দের অভাবে ২০১৭ সালের শেষ দিকে বাঁক নিরসনের ওই কাজ বন্ধ হয়।
সড়কটির ভাঙ্গারপাড়, ধনারপাড়, নাগদা, নারায়ণপুর, আশ্বিনপুর ও নায়েরগাঁও অংশে দেখা যায়, সেখানকার কয়েক গজ পরপর একটি করে বাঁক। এসব বাঁকে কাত হয়ে, হেলেদুলে যানবাহন চলছে। বিপজ্জনক বাঁক থাকা সত্ত্বেও চালকেরা পূর্ণগতিতে গাড়ি চালাচ্ছেন। দুর্ঘটনার শঙ্কায় যাত্রীদের মধ্যে বিরাজ করছে আতঙ্ক।
এ সড়কপথে যাতায়াতকারী মতলব দক্ষিণের বাসিন্দা মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, বাসে বা অটোরিকশায় প্রায় প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এ পথে যাতায়াত করছেন। এর ২০-২৫ গজ দূরত্বে এক-দুটি করে বাঁক। কিছু বাঁক খুবই বিপজ্জনক। এগুলো অতিক্রম করতে গেলে গাড়ি কাত হয়ে পড়ে। মনে হয় গাড়িটি এখনই উল্টে যাবে। খুবই আতঙ্কে থাকেন তখন। ঝুঁকি নিয়ে তবু ওই পথে যাতায়াত করছেন। বাঁকের কারণে সময়ের অপচয় হচ্ছে এবং চালকেরাও দ্বিগুণ ভাড়া আদায় করছেন।
তিনি আরও বলেন, মতলব দক্ষিণ ও মতলব উত্তর উপজেলা এবং চাঁদপুর শহর থেকে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রামসহ আশপাশের আরও কয়েকটি জেলায় যাতায়াতের একমাত্র সহজ ও সময়সাশ্রয়ী যোগাযোগব্যবস্থা হচ্ছে এ সড়কপথ। প্রতিদিন এ সড়কপথে দুই থেকে তিন হাজার বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস, ব্যক্তিগত গাড়ি, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাসহ আরও অন্যান্য যানবাহন চলাচল করে।
এ সড়কপথের যাত্রীবাহী বাস জৈনপুরী এক্সপ্রেসের চালক আলমগীর হোসেন বলেন, ‘রাস্তাডার এট্টু পরপর বাঁক। বাঁকে গাড়ি টার্ন করা ঝুঁকিপূর্ণ। তবু ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি চালাইতে অয়। এতে দুর্ঘটনা ঘটে। গাড়ির চাকাও নষ্ট অয়। এইডা সড়ক নাকি নরক আমার প্রশ্ন।’ তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘হেগো (সওজ) অবহেলায় ১৭ বছরেও বাঁকগুলি ঠিক অইল না।’
মতলব-ঢাকা বাসচালক এবং মতলব-গৌরীপুর অটোরিকশাচালক সমিতি সূত্র জানায়, এ সড়কটিতে প্রতি মাসে গড়ে তিন-চারটি দুর্ঘটনা ঘটে। বছরে ঘটে ৪০-৪২টি ছোট-বড় দুর্ঘটনা। এসব দুর্ঘটনায় বছরে গড়ে দুই শতাধিক যাত্রী হতাহত হচ্ছেন।
চাদঁপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মোশারফ হোসেন জানান, এ সড়কের সব বাঁককে সরলীকরণ অর্থাৎ শূন্য বাঁকে নিয়ে আসার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আগামি সপ্তাহের মধ্যে ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠানো হবে। ডিপিপি চূড়ান্ত হয়ে আসলে খুব দ্রুত বাঁক সরলীকরণের লক্ষ্যে ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াসহ সড়ক নির্মাণ শুরু করা হবে।
তিনি আরো জানান, বর্তমানে সড়কটি ১৮ ফুট প্রশস্ত রয়েছে। দুই লেনে উন্নীত করার লক্ষ্যে সড়কটিকে ২৪ ফুটে প্রশস্ত করা হবে। এর ফলে এ সড়ক দিয়ে চাঁদপুর-ঢাকা যাতায়াত আরামদায়ক হবে ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমে আসবে। পাশাপাশি বর্তমান সময়ের চেয়ে দেড় ঘণ্টা কমেও যাতায়াত করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করেন।
চাঁদপুর সওজ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সামসুজ্জোহা বলেন, সড়কটির বাঁক নিরসনে বরাদ্দ চেয়ে সম্প্রতি একটি প্রকল্প তৈরি করে সেতু মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ এলে বাঁক নিরসনের কাজ ফের শুরু হবে।
১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২।
