এস এম সোহেল
৫১ বছরের পুরোনো (১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত) চাঁদপুর শহরের রেলওয়ে হকার্স মার্কেট। এ মার্কেটে ৪০৪টি দোকান রয়েছে। এর বিভিন্ন গলিতে দোকানগুলো এমনভাবে গড়ে উঠেছে যে পরিবেশটা একেবারে ঘিঞ্জি হয়ে পড়েছে। মার্কেটের ভেতরে-বাইরে হাঁটার জায়গাটুকু খুবই কম। গা ঘেঁষে পথ চলতে হয় ক্রেতাদের। ভেতরে প্রবেশ করলে গরমে সিদ্ধ হয়ে বের হতে হয়। জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন হাজার-হাজার লোক এখানে শপিংয়ের জন্য আসেন। এদের অধিকাংশই নারী। কারণ অনেক পুরুষই ভিড়ের কারণে এ মার্কেটে যেতে চান না। নারীদের শপিংয়ের জন্য পছন্দের তালিকার প্রথম দিকে চাঁদপুর রেলওয়ে মার্কেট থাকলেও, সেখানে নেই কোনো অগ্নি নিরাপত্তার ব্যবস্থা।
গত রোববার মন্ত্রণালয়ের নির্দেশক্রমে চাঁদপুরে প্রচ- দাবদাহ ও অগ্নিকা- প্রতিরোধে সতর্কতামূলক ব্যবস্থাগ্রহণ সংক্রান্ত মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে। জেলা প্রশাসক কামরুল হাসানের সভাপতিত্বে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রশাসনের কর্মকর্তা ছাড়াও চাঁদপুর শহরের মার্কেট কমিটির নেতৃবৃন্দ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় চাঁদপুর শহরের রেলওয়ে হকার্স মার্কেট ও পালবাজারের বিষয়ে বলা হয়, হকার্স মার্কেট ও পালবাজার রেড জোনের মধ্যে আছে। এখানে একবার আগুন লাগলে কিছুই থাকবে না। কী কারণে রেড জোনের আওতায় সে বিষয়ে তিনি বলেন, হকার্স মার্কেটের একটি দোকানেও অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র (ফায়ার এক্সটিংগুইসার) নেই। পুরো মার্কেটের গলিপথ একটু ফাঁকাও নেই। ঘিঞ্জি পরিবেশ। বিদ্যুৎ লাইনে ত্রুটি আছে। তাছাড়া রাতে মার্কেট বন্ধ করার পর কলাপসিবল গেট তালা দেয়া থাকে, কিন্তু লোক থাকে না। রাতে অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটলে ভয়াবহ পরিস্থিতি হবে। এভাবে ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা পালবাজারসহ অন্যান্য মার্কেটেও অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র না থাকাসহ নানা ত্রুটির কথা জানান।
জেলা প্রশাসক এ প্রসঙ্গে প্রত্যেক মার্কেটে নিজ নিজ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, বিদ্যুতের সর্টসার্কিট থেকেই অধিকাংশ অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে থাকে। আর এই সর্টসার্কিট হয় নিজেদের অসতর্কতার কারণে। দেখা গেছে যে, বিদ্যুতের তার লুজ কানেকশন, জোড়াতালি দেয়া, স্কচটেপ পেচানো, ইলেকট্রনিক সামগ্রী চার্জে দিয়ে ওভার সময় ফেলে রাখা ইত্যাদি কারণে বিদ্যুতের তারে আগুন ধরে যায়। এছাড়া জ্বলন্ত কয়েল থেকেও আগুন ধরতে পারে। তাই এসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। তিনি হকার্স মার্কেট ও পালবাজার ব্যবসায়ী সমিতিকে ফায়ার সার্ভিসের সাথে বসে অতি দ্রুত তাদের পরামর্শ ও নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন।
চাঁদপুর রেলওয়ে হকার্স মার্কেটে একবার আগুন লাগলে ভেতরের লোকরা বের হতে হতে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কোন কারণে মার্কেটের আগুন লাগলে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, পানি ও ফায়ার ফাইটিং সিস্টেমের ব্যবস্থা দূরে থাক, এ মার্কেটে অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা নেই। যাও কয়েকটি দোকানে আছে, তার মেয়াদ নেই। এ মার্কেটে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের সমাগম হয়। ঝুঁকি নিয়ে চলে কেনা-বেচা।
মার্কেটটি দেখভাল করার জন্য রয়েছে দুটি কমিটি। একটি হচ্ছে- চাঁদপুর হকার্স সমাজ সমিতি ও অপরটি হচ্ছে চাঁদপুর রেলওয়ে হকার্স মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতি। তাদের তত্তাবধায়নে চলছে এ মার্কেটটি। এ মার্কেটে কর্মরত আছে প্রায় ২ হাজার লোকেরও বেশি। একবার আগুন লাগলে যেমন হবে ব্যবসায়ীদের কোটি কোটি টাকা ক্ষতিসাধন, তেমনি হবে অনেক প্রাণহানী।
অগ্নিনির্বাপণ আইন অনুযায়ী, আগুনের ঝুঁকি এড়াতে মার্কেটে ছাদে ওঠার সিঁড়ি, ও চালের উপরের দিকে খোলা রাখা, আন্ডারগ্রাউন্ডে পানি মজুদ রাখা এবং মার্কেটে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আগুন নেভানোর কর্মী রাখার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এই আইন মেনে গড়ে ওঠেনি চাঁদপুর রেলওয়ে হকার্স মার্কেট।
দোকানিরা বলছেন, চাঁদপুর রেলওয়ে হকার্স মার্কেট অনেক পুরাতন। মার্কেটটি পরিকল্পনা অনুযায়ী গড়ে ওঠেনি। মার্কেটে অগ্নি দুর্ঘটনা ঘটলে সেটা হবে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা। স্বাভাবিকভাবে মানুষের গাদাগাদিতে মার্কেটের ভেতর পথ চলাই কঠিন হয়ে যায়। ফলে এসব মার্কেটে আগুন লাগলে অসংখ্য প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে।
চাঁদপুর হকার্স সমাজ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. জয়নাল আবেদীন জানান, চাঁদপুর রেলওয়ে হকার্স মার্কেটে ৩৯৫টি দোকান রয়েছে। মার্কের পূর্ব পাশে ২য় তলায় রয়েছে ৯টি দোকান, যা সমিতির আওতাভূক্ত নয়। ২য় তলার দোকানগুলো মসজিদের আন্তভূক্ত। অগ্নিনির্বাপক কোন যন্ত্র আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি জানান, আমাদের হকার্স মার্কেটে ২০/৩০ টি দোকানে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র আছে, বাকিগুলোতে নেই।
তিনি আরো জানান, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের বিষয়ে আমরা মার্কেটের সকল ব্যবসায়ী সভা করেছি। ঈদের পর ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের সাথে বসে সব দোকানে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখার ব্যবস্থা করা হবে। আর মার্কেটের নিজস্ব ৩১৫ কেভি বৈদ্যুতিক ট্রান্সমিটার রয়েছে। বিদ্যুতের লোড বেশি হওয়ায় ৫০০ কেভির বৈদ্যুতিক ট্রান্সমিটারের জন্য আবেদন করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের সভা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কিনা জানতে চাঁদপুর রেলওয়ে হকার্স মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতি সাধারণ সম্পাদক হাফেজ জাকির হোসেনের সাথে কথা বলতে চাইলে তিনি খুব ব্যস্ততা দেখান। তিনি কথা না বলেই ফোন রেখে দেন।
২০ এপ্রিল, ২০২৩।
