কাগজে-কলমে কঠোর বিধি-নিষেধ চললেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন

মোহাম্মদ হাবীব উল্যাহ্
দেশে লাফিয়ে বাড়ছে মহামারি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও মুত্যু। বিভিন্ন জেলার পাশাপাশি চাঁদপুরেও দ্রুত করোনাভাইরাসের (ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট) সংক্রমণ বাড়ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্তের হার প্রায় ৪০ শতাংশ। এর মধ্যে করোনাভাইরাসজনিত রোগ (কোভিড-১৯) এর বিস্তার রোধকল্পে গত ১৩ জানুয়ারি থেকে বিধি-নিষেধ আরোপ করে সরকার। এরপর দুই সপ্তাহের জন্য সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
অথচ করোনা সংক্রমণরোধে দেশে কাগজে কলমে কঠোর বিধি নিষেধ চললেও মাঠে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। মাস্কহীন অবাধ চলাফেরা করছেন মানুষ। কেউই মানছে না শারিরিক বা সামাজিক দূরত্ব। যাত্রী নিয়ে ঠাসাঠাসি করে চলছে সিএনজিচালিত স্কুটার, ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সা ও মিশুক। হোটেল-রেস্তোরাঁয় ভিড় লেগেই আছে। যেখানে উল্টো সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা অনেক বেশি। যার প্রমাণও পাওয়া গেছে।
গত ২০ জানুয়ারি সিভিল সার্জন কার্যালয়, চাঁদপুর থেকে প্রকাশিত এক তথ্যের আলোকে গেছে ২৯৪ জনের মধ্যে ৯৮ জনের করোনা পজেটিভ। এর মধ্যে চাঁদপুরের সদর উপজেলার ৬০ জন, ফরিদগঞ্জের ৭ জন, শাহরাস্তির ১২ জন, মতলব উত্তরের ৪ জন, হাজীগঞ্জের ২ জন, কচুয়ার ২ জন, হাইমচরের ৪ জন ও মতলব দক্ষিণ উপজেলার ৭ জন।
এর আগে দিন ১৯ জানুয়ারি ২৩০ জনের করোনা টেস্টে ৫৯ জনের পজেটিভ। এর মধ্যে চাঁদপুর সদর উপজেলার ৪৫ জন, মতলব উত্তরে ২জন, ফরিদগঞ্জে ৬ জন, হাজীগঞ্জে ১ জন ও শাহরাস্তিতে ২ জন। অর্থাৎ আগের দিনের চেয়ে পরের দিন ৩৯ জনের বেশি করোনা পজেটিভ।
বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, শহর কিংবা গ্রামে, পাড়া কিংবা মহল্লায়, সচেতন কিংবা অসচেতন, শিক্ষিত কিংবা অশিক্ষিত, তরুণ কিংবা বয়স্ক কেউ-ই সরকারের আরোপিত বিধি নিষেধ ও স্বাস্থ্যবিধি মানতে চাইছেন না। শুধুমাত্র স্কুল, কলেজ ও মাদরাসা বন্ধ থাকলেও হাট-বাজার, শপিংমল, হোটেল রেঁস্তোরা ও গ্রামের চায়ের দোকানে মানুষের ভিড় লেগেই আছে। যেন স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই।
এছাড়া বিনোদনের উদ্দেশ্যে শিশুদের নিয়ে বাবা-মা ও বন্ধুদের নিয়ে কিশোর, তরুণ যুবকসহ সব বয়সি লোকজনের ঘোরাফেরা এবং বিনোদন কেন্দ্রে আসা-যাওয়াসহ জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছেন সবাই। চলার এ পথে মুখে মাস্ক ব্যবহার না করে এবং স্বাস্থ্যবিধি না মেনে হরহামেশা ঘোরাঘুরি করছেন সবাই। আবার যারা মাস্ক পরিধান করছেন, তাদের অনেকের মাস্ক থুতনিতে। ব্যতিক্রম দুই/চারজন ছাড়া সবাই যেন স্বাস্থ্যবিধি মানতে নারাজ।
অথচ গত ১০ জানুয়ারি মন্ত্রী পরিষদ বিভাগ থেকে নির্দেশিত বিধি-নিষেধে বলা হয়েছে, দোকান, শপিংমল ও বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতা এবং হোটেল রোস্তোরাঁসহ সব জনসমাগমস্থল, অফিস-আদালতসহ ঘরের বাইরে সবাইকে বাধ্যতামূলক মাস্ক পরিধান করতে হবে। অন্যথায় তাকে আইনানুগ শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে এবং স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনে ব্যত্যয় রোধে মোবাইল কোর্ট (ভ্রাম্যমাণ আদালত) পরিচালনা করা হবে।
এছাড়া রেঁস্তোরায় বসে খাবার গ্রহণ এবং আবাসিক হোটেলে থাকার জন্য অবশ্যই করোনা প্রতিরোধক টিকা সনদ প্রদর্শন করতে হবে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে কোথাও এর বাস্তবায়ন হতে দেখা যায়নি। জেলার ৮টি উপজেলায় নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) দাপ্তরিক কাজে পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং পুলিশের কর্মকর্তারা মাঠে দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে, তবে সীমিত।
এদিকে গত ২১ জানুয়ারি মন্ত্রী পরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত অপর একটি নির্দেশনায় স্কুল, কলেজ ও সমপর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের কথা বলা হয়েছে। শুধুমাত্র ২১ তারিখের নির্দেশনাটি মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন হতে গেছে। বন্ধ রয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তবে খোলা রয়েছে কিন্ডারগার্টেন ও নূরাণী মাদ্রাসাগুলো।
এ ব্যাপারে কয়েকজন লোকের সাথে কথা হলে, তারা জানান, এলাকায় করোনায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা কম। তাই এলাকার লোকজন এ ব্যাপারে একেবারে উদাসীন। হাতেগোনা কিছু মানুষ ছাড়া কেউই মাস্ক পরিধান করে না এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখে না। দেদারছে হাট-বাজার চলছে, আড্ডা, চা খাওয়া সবই আগের মতো।
একজন শিক্ষকের সাথে কথা হলে তিনি জানান, সম্প্রতি করোনা সংক্রমণ বেড়ে গেলেও মানুষের মধ্যে সচেতনতা কিংবা করোনাভীতি চোখে পড়ে না। স্বাস্থ্যবিধি না মানলে যে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে বেশিরভাগ লোকজন তা বিশ্বাস করতে চায় না। তিনি বলেন, প্রতিদিনই যে যার মতো কাজ করছে, আড্ডা দিচ্ছে। অথচ স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো বিকল্প নেই।
সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাহাদাৎ হোসেনের সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি জানান, করোনা সংক্রমণ রোধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। আমরা মাইকিংসহ নিয়মিত প্রচার-প্রচারণা করছি।
জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিশ বলেন, মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য সচেতন করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রচার-প্রচারণার পাশাপাশি নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানাও করা হচ্ছে। তারপরও মানুষের মধ্যে সচেতনতা আসেনি। অথচ সংক্রমণ প্রতিরোধে ব্যক্তিগত সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। তাই সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহবান জানান তিনি।
এ সময় তিনি করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকারি বিধি-নিষেধ বাস্তবায়ন ও জনসচেতনতায় সংবাদকর্মীদের সহযোগিতা কামনা করেন।

২৪ জানুয়ারি, ২০২২।