এস এম সোহেল
চাঁদপুরের সর্বজন শ্রদ্ধেয়, ভাষাসৈনিক, বিশিষ্ট সংগঠক, শিক্ষানুরাগী, রোটারিয়ান, ডায়াবেটিক হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, সমাজসেবক আলহাজ ডা. এম এ গফুরের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল শুক্রবার ভোর ৫টায় ঢাকার শমরিতা হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহে………রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো প্রায় ৮৭ বছর। মৃত্যুকালে তিনি ২ ছেলে ও ১ মেয়েসহ অনেক আত্মীয়-স্বজন এবং শুভাকাক্সক্ষী রেখে যান। বাদ জুমা পৌর ঈদগায় জানাজা শেষে বাসস্ট্যান্ড গোর-এ-গরিবা কবরস্থানে স্ত্রীর পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
গতকাল শুক্রবার বাদ জুমা পৌর ঈদগাহে চাঁদপর প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠের সম্পাদক ও প্রকাশক অ্যাড. ইকবাল-বিন-বাশারের পরিচালনায় জানাজার আগে ডা. এম এ গফুরের কর্মময় জীবনের উপর বক্তব্য রাখেন পুলিশ সুপার মো. জিহাদুল কবির, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পৌর মেয়র নাছির উদ্দিন আহমেদ, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ ওচমান গণি পাটওয়ারী, চাঁদপুর চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি আলহাজ জাহাঙ্গীর আখন্দ সেলিম।
পরিবারের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন ডা. এম এ গফুরের ছোট ভাই অ্যাড. ফজলুল হক সরকার ও বড় ছেলে প্রফেসর ডা. শাকিল গফুর। জানাজায় ইমামতি করেন চাঁদপুর চৌধুরী জামে মসজিদের খতিব মাও. হোসেন আহম্মেদ।
জানাজায় অংশ নেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আব্দুল আল মাহমুদ জামান, চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি রোটারিয়ান কাজী শাহাদাত, ইকবাল হোসেন পাটওয়ারী, সাবেক সাধারণ সম্পাদক সোহেল রুশদী, জি এম শাহীন, দৈনিক চাঁদপুরজমিনের সম্পাদক ও প্রকাশক রোকনুজ্জামন রোকন, দৈনিক ইল্শেপাড়ের প্রধান সম্পাদক রোটারিয়ান মাহবুবুর রহমান সুমন, চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. জহিরুল ইসলাম, সাংগঠনিক সম্পাদক শাহীর হোসেন পাটওয়ারী, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক আলহাজ এম বারী খান, চাঁদপুর রোটারী ক্লাবের সাবেক সভাপতি অ্যাড. সাইয়্যেদুল ইসলাম বাবু, চাঁদপুর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মো. নাসিম উদ্দিন, জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা বাবু, বাগাদী ইউপি চেয়ারম্যান আলহাজ বেলায়েত হোসেন গাজী বিল্লাল, জেলা হোটেল রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আজিজ দেওয়ানসহ প্রশাসনিক, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ।
উল্লেখ্য, আলহাজ ডা. এম এ গফুরের মানব সেবার মাধ্যমে জীবনের প্রায় পুরোটাই চাঁদপুর জেলায় অনন্য ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। নিঃস্বার্থ এই সমাজসেবক পেশায় ছিলেন একজন চিকিৎসক। তিনি সার্বিক মেডিসিন ও রেডিওলজিতে অভিজ্ঞ। তিনি বাংলাদেশ রোটারী জেলা-৩২৮০ এর অন্যতম প্রবীণ রোটারিয়ান। তিনি চাঁদপুর রোটারী ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সহ-সভাপতি। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি একজন সক্রিয় রোটারিয়ান ছিলেন।
সুবক্তা এবং দক্ষ সংগঠক হিসেবে তাঁর ব্যাপক সুনাম ও পরিচিতি আছে। চাঁদপুর শহরের স্ট্র্যান্ড রোডে তাঁর বাবার নামে প্রতিষ্ঠিত পিয়ারস মেমোরিয়াল হাসপাতাল এবং চাঁদপুর এক্স-রে ক্লিনিকের পরিচালক ও স্বত্বাধিকারী ছিলেন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে বহু সমাজসেবায় ও জনহিতকর প্রতিষ্ঠানের সাথে জীবনের দীর্ঘ সময় জড়িত থেকে মানব সেবা করে দেশ ও বিদেশে প্রচুর প্রশংসা অর্জন করেছেন।
১৯৫২ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নের সময় ভাষা আন্দোলনে ভাষা সংগ্রামী হিসেবে এবং স্বাধীনতা আন্দোলনে স্বীয় অবস্থানে থেকে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর পৈত্রিক বাড়ি পাক হানাদার বাহিনী আগুনে পুড়িয়ে দেয়।
একজন দক্ষ সংগঠক হিসেবে আলহাজ ডা. এমএ গফুর সমধিক পরিচিত। তিনি চাঁদপুর রোটারী ক্লাবের চার্টার (প্রতিষ্ঠাতা) সহ-সভাপতি ও প্রাক্তন সভাপতি এবং রোটারী দাতব্য চিকিৎসালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে এ প্রতিষ্ঠানে থেকে চাঁদপুরবাসীর সেবা করে যাচ্ছেন। তিনি রোটারী জেলা ৩২৮০-এর বিভিন্ন কমিটিতে সভাপতির দায়িত্বে থেকে একজন প্রবীণ ও অভিজ্ঞ রোটারিয়ানের কর্তব্য পালন করেন। তিনি রোটারী জেলার চক্ষু শিবির পরিচালনায় বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন এবং প্রজেক্টকে জনপ্রিয় করেছেন, তাতে দেশে বহু রোগী অন্ধত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়েছেন। তিনি ১৯৮২ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত মাজহারুল হক বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতালের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সুযোগ্য পরিচালনায় মাজহারুল হক বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতাল আধুনিক হাসপাতালে পরিণত হয়েছে। তিনি চাঁদপুর জেলা ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন, আধুনিক ও বিএমএ (বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন), চাঁদপুর শাখার প্রাক্তন সভাপতি। তিনি চাঁদপুর কলেজের প্রাক্তন পরিচালনা কমিটির সদস্য, চাঁদপুর মহিলা কলেজ, পুরাণবাজার ডিগ্রি কলেজ, চাঁদপুর ল’ কলেজ ও রোটারী দাতব্য চিকিৎসালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, চাঁদপুর জেলা কারাগারের বেসরকারি পরিদর্শক, চাঁদপুর সাহিত্য একাডেমীর প্রতিষ্ঠাতা সহ-সভাপতি, চাঁদপুর জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি, সনাক চাঁদপুর (টিআইবি)-এর সদস্য ও চাঁদপুর কমিউনিটি পুলিশের উপদেষ্টা, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির আজীবন সদস্য ছিলেন।
সংক্ষিপ্ত জীবন বৃত্তান্তঃ চাঁদপুর জেলার হাইমচর উপজেলার চর কোড়ালিয়া গ্রামের সরকার বাড়িতে ১৯৩৩ সালের ২৮ অক্টোবর আলহাজ ডা. এমএ গফুর জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মরহুম পিয়ার আলী সরকার ও মায়ের নাম মরহুমা সৈয়দুন্নেছা। আলহাজ ডা. এম এ গফুর চাঁদপুর গণি হাই স্কুল থেকে ১৯৪৮ সালে ম্যাট্রিক, ১৯৫০ সালে ঢাকা জগন্নাথ কলেজ থেকে আইএসসি ও ১৯৫৬ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন। একজন মেধাবী চিকিৎসক হিসেবে তিনি স্নাতকোত্তর চিকিৎসাবিদ্যা ও রেডিওলজিতে অধ্যয়নের জন্য ১৯৬৫ সালে লন্ডন ও এডিনবার্গে অবস্থান করেন। তাঁর স্ত্রী প্রফেসর মাহমুদা খাতুন চাঁদপুর জেলার মতলব উপজেলার আশ্বিনপুর গ্রামে ১৯৩৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম মরহুম শাহেদ আলী পাটওয়ারী (সাবেক স্পিকার)। মিসেস মাহমুদা খাতুন ১৯৬৪ সাল থেকে ১৯৬৭ পর্যন্ত চাঁদপুর সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেন এবং ১৯৬৭ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের প্রফেসর ছিলেন। এরপর তিনি স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেন।
ডা. এম এ গফুর ১ মেয়ে ও ২ ছেলের জনক। মেয়ে মিসেস মাহফুজা হক অর্থনীতিতে এমএ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), বড় ছেলে ডা. শাকিল গফুর এমবিবিএস, ডিটিসিডি, এমডি (কার্ডিওলজি) রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে অধ্যাপক পদে কর্মরত এবং কনিষ্ঠ ছেলে ড. শায়ের গফুর বিএসসি (আর্ক) ও পিএইচডি (অক্সফোর্ড) বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এ স্থাপত্য বিভাগের প্রফেসর পদে কর্মরত।
২৪ আগস্ট, ২০১৯।