নিয়ন মতিয়ুল
দেশের নিউজমিডিয়াগুলো হয়ে পড়ছে অনেকটা ঢাকাই সিনেমার মতো। ‘কপিপেস্ট’ স্ক্রিপ্ট, ‘টিকটকমার্কা’ পরিচালক, ‘দাইমা গো’ বৈশিষ্ট্যের পর্দা ফাটানো অভিনয়, সঙ্গে ধামাকা ‘কাটপিস’ অফার। তবে ‘রুচির দুর্ভিক্ষে’’ হলগুলোতে হাহাকার। মূলত, আমাদের ঐতিহ্যের প্রিন্টমিডিয়া আক্রান্ত ‘ডায়াবেটিসে’, মিডিয়াস্টার হান্টার ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া পুরোপুরিই ‘হাইপারটেনশন’ রোগী আর অনলাইন নিউজমিডিয়া কখনও বাল্যবিয়ের শিকার, কখনও উঠতি বখাটের মতো ইঁচড়ে পাকা।
বেশিরভাগ নিউজমিডিয়ার মতামত কলামে চাণক্যবাণীসমৃদ্ধ রাজনৈতিক সুরসুরির ছড়াছড়ি। নীতিবাক্যের মোড়কে শব্দে শব্দে ফ্যান্টাসি আর চেনা লেখকের মুখস্থ গল্পের একঘেঁয়েমি। থাকে না গভীর বিশ্লেষণ, নির্দেশনা কিংবা নতুন দিগন্তের ছিটেফোঁটা। ডাইরেক্ট অ্যাকশনের বদলে শুধুই প্যাসিভ। টিভি নাটকের মতো স্যাটায়ার আর ভাঁড়ে ভারাক্রান্ত। কমেন্টে কমেন্টে শুধুই ‘হা-হা’ রিঅ্যাক্ট।
হাঁকডাক দিয়ে নতুন আসা মেগাবাজেটের নিউজমিডিয়াগুলো কয়েক মাসেই লিড সংকটে হাঁপিয়ে উঠছে। বাজার কাঁপিয়ে ঝড় তোলার কোনো আইডিয়া খুঁজে পাচ্ছে না। অনুসন্ধানের সময়-সক্ষমতার অভাবে পুরোনো গল্পেই চমক আনার ব্যর্থ চেষ্টা। বিটে বিটে রাজনৈতিক নেতাকর্মীতে গিজগিজ করা হাউজগুলোতে শুধু মেধাবী সংবাদকর্মীরাই কোণঠাসা। তাদের স্বপ্নের বড় বড় বেলুন প্রতিদিন চুপসে যাচ্ছে। ক্ষোভ আর হতাশায় ভারী নিঃশ্বাস ঝরে পড়ছে সোশ্যালমিডিয়ায়।
অথচ এমন ভরাডুবির মধ্যেই মিডিয়া মালিক-পরিচালকদের অনেকেরই ঝা-চকচকে গাড়ি, চোখ ধাঁধাঁনো বাড়ির খবর বাতাসে ভাসে। কেউ কেউ নাকি আবার আঙ্গুল ফুলে মিলয়নিয়ারও। বিপরীতে গা-গতরখাটা বাকি সাংবাদিকদের বেশিরভাগই টিসিবির পণ্য কেনার তালিকায় নাম তুলতে মরিয়া। সাংবাদিকদের কল্যাণে গঠিত সংগঠনগুলো সদা ব্যস্ত নেতা-আমলাদের ফুলেল শুভেচ্ছা বিতরণে। বছরে একবার সফল ‘ফেমেলি ডে’ বা পিকনিকের আয়োজন আর মাঝে মাঝে আবহাওয়ার অনুকূলে সাবধানী বিবৃতিতেই সীমাবদ্ধ প্রবীণ-তরুণ নেতৃত্ব।
মূলত, বিগত শতকের নেতা আর প্রবল রাজনৈতিক মতাদর্শীদের হাতেই পরিচালিত হচ্ছে আজকের গোটা নিউজমিডিয়া সেক্টর। অতিরাজনীতি বোধ আর শত্রুশত্রু দৃষ্টিভঙ্গির দাসত্বের কারণে আধুনিক প্রজন্মের সঙ্গে তাদের তৈরি হচ্ছে বিপজ্জনক দূরত্ব। তাদের মননে-মগজে গেঁথে থাকা আশি-নব্বই দশকের রাজনৈতিক সাংবাদিকতার আধুনিকায়ন তাই জটিল চক্রে আটকে থাকছে। অতিরাজনীতির ভারী হাওয়া লেগে জটিলতা আরও গভীর হচ্ছে।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ধাক্কায় বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যমের অভিযোজিত হওয়া বা বদলে যাওয়ার সঙ্গে নিজেদের নবায়ন করার সক্ষমতা পুরোপুরিই হারিয়েছেন বিগত কালের কিংবদন্তিরা। বিজ্ঞান-প্রযুক্তি আর জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে নিউজমিডিয়ার ভূমিকা তাই দিন দিন কমে আসছে। পরিবর্তে বাড়ছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, উগ্রতা, সংকীর্ণতা, অমানবিকতা। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের উপযোগী নিউজমিডিয়ার জন্য তাই এসব কিংবদন্তিদের বিদায় অবধি অপেক্ষা করতেই হবে।
০৬ এপ্রিল, ২০২৩।
