৯ বছর পাঠদান চলে হিন্দুদের বৈষ্ণব আখড়ায় ও খোলা আকশের নিচে!

মুরাদনগরে রামপুর দ. সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনটি পরিত্যক্ত

জাহাঙ্গীর আলম ইমরুল
প্রায় এক দশক আগে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয় কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার বাবুটিপাড়া ইউনিয়নের ১৪৩নং রামপুর দক্ষিণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একমাত্র ভবনটি। নতুন ভবন নির্মিত না হওয়ায় দীর্ঘ ৯ বছর ধরে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে হিন্দুদের বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের একটি আখড়ায়। ফলে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। আশংকাজনক হারে কমছে শিক্ষার্থী।
ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বিদ্যালয়ে একমাত্র ভবনটি ৯ বছর আগে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। এ অবস্থায় শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিপাকে পড়েন প্রধান শিক্ষক। পরে ঠাঁই হয় পাশের বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের আখড়ায়। খোলা আকাশের নিচে চলতে থাকে ৪১৩ জন শিক্ষার্থীর পাঠদান কার্যক্রম।
১৯৪০ সালে স্থাপিত হয় রামপুর দক্ষিণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ১৯৭৩ সালে চার কক্ষবিশিষ্ট একটি একতলা ভবন নির্মিত হয়। দীর্ঘ ৪০ বছর পর ভবনটি ব্যবহার অনুপোযোগী হয়ে পড়লে ২০১৩ সালে এটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে উপজেলা প্রশাসন। এ অবস্থায় শ্রেণিকক্ষ না থাকা টানা দুই বছর পাঠদান কার্যক্রম চলে হিন্দুদের বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের সমাধীস্থল বৈষ্ণব আখড়ার খোলা আকাশের নিচে। ২০১৫ সালে স্থানীয় উদ্যোগে বৈষ্ণব আখড়া ঘেষে নির্মিত একচালা টিনের ঘরেই চলছে স্কুলের সব কার্যক্রম। এমনটাই জানালেন, স্কুলের প্রধান শিক্ষক সুমিত্রা পাল।
প্রধান শিক্ষক আরো জানান, স্থান সংকুলানের অভাবসহ নানা সমস্যায় দিন দিন আশংকাজনক হারে কমতে থাকে শিক্ষার্থী সংখ্যা। বর্তমানে এ সংখ্যা নেমে দাঁড়িয়েছে ১৮০ জনে! এই অল্পসংখ্যক শিক্ষার্থীর পাঠদানেই রীতিমত হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। উপস্থিতির হার বেশি হলে এখনো পাঠদান করতে হয় খোলা আকাশের নিচে।
স্কুলের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা জানান, এভাবে বছরের পর বছর ধরে ভবনের সংকটের ফলে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। শিক্ষিকা তাছলিমা আক্তার, বিথী রাণী দেবী, সৈয়দা আইরিন পারভীনসহ অনন্য শিক্ষকরা জানান, ভবন না থাকার কারণে একটি মন্দিরে ক্লাস করতে হচ্ছে। যখন বৃষ্টি থাকে কিংবা প্রচণ্ড রোদে বাচ্চাদের মারাত্মক কষ্ট হয়। ফলে উপস্থিতি দিন-দিন কমে যাচ্ছে। পড়াশোনার অনেক ব্যহত হচ্ছে। আমরা চাই আমাদের ভবনটি যেন অতি দ্রুতই নির্মাণ করা হয়।
স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী বনলতা জানায়, স্কুল ভবন না থাকায় তাদের রোদ-ঝড়-বৃষ্টিতে তাদের অনেক কষ্ট হয়। পঞ্চম শ্রেণির অন্তরাও জানায়, ভবন না থাকায় তাদের অনেক কষ্ট হয়। অন্তরাসহ স্কুলের সব শিক্ষার্থী স্কুলে শীঘ্রই একটি নতুন ভবন নির্মাণের দাবি করে।
তবে, আশপাশে গড়ে উঠা কিন্ডারগার্টেন স্কুল এবং এই স্কুলের শ্রেণিকক্ষ সংকটেই শিক্ষার্থী কমছে বলে মনে করছেন মুরাদনগর উপজেলা শিক্ষা অফিসার ফওজিয়া আকতার। তিনি বলেন, আমরা মা সমাবেশ ও অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগ করে সেসব শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে আনার জন্যে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আর নতুন ভবনের জন্যে আমরা এই স্কুলটিকে প্রাধান্য দিয়ে সবসময়ই সংশ্লিষ্ট দফতরে প্রস্তাব পাঠিয়ে আসছি।
দ্রুতই এখানে একটি নতুন ভবন নির্মাণের ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিলেন মুরাদনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আলাউদ্দিন ভূইয়া জনী। তিনি বলেন, আমি দেখেছি রামপুর দক্ষিণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনটি অত্যন্ত জারাজীর্ণ। আমি জেনেছি এখানে চারশ’র বেশি শিক্ষার্থী ছিলো। ভবন সংকটে এখানে শিক্ষার্থী সংখ্যা কমে ১৮০ জনে দাঁড়িয়েছে। যা অত্যন্ত দুঃখজনক। রামপুর দক্ষিণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক একটি লিখিত আবেদন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের মাধ্যমে জমা দিলে আমি তা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দ্রুতই একটি ভবনের ব্যবস্থা করবো।

২১ নভেম্বর, ২০২২।