পদ্মা-মেঘনা বহুমুখী সেতু বনাম টানেল


বাংলাদেশ একটি ক্ষুদ্র আয়তনের জনবহুল রাষ্ট্র। এ রাষ্ট্র সৃষ্টির মূল চেতনায় নিহিত ছিল ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য হ্রাস এবং আঞ্চলিক বৈষম্য ও আধিপত্যবাদের অবসান। গত এক দশকে দেশে যোগাযোগ অবকাঠামোর অভাবনীয় উন্নয়ন হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে যাতায়াত এখন অনেক দ্রুত ও সহজ। কিন্তু বাণিজ্যিক রাজধানীসহ দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ১১টি জেলার সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা যে তিমিরে ছিল সে তিমিরেই আছে। অতি দুর্বল যোগাযোগ অবকাঠামোর কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এখনও কাক্সিক্ষত উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। এ অঞ্চলের জনগণের প্রতি শাসক শ্রেণির আচরণ অনেকটা অষ্টাদশ শতাব্দীর বাংলার সামন্ত প্রভুদের মতো। এর ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশাল এলাকা জুড়ে এখনও বিরাজ করছে ঊনবিংশ শতাব্দীর আমেজ। চাকরি, ব্যবসা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবাসহ সব নাগরিক সুবিধা থেকে পিছিয়ে আছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল (খুলনা, বরিশাল বিভাগ ও বৃহত্তর ফরিদপুরের জেলাগুলো)।
কেবল পদ্মা সেতুর নির্মাণ সম্পন্ন হলেই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রতি সব বৈষম্যের অবসান হবে না, একই সাথে হরিণা ফেরিঘাট দিয়ে চাঁদপুর ও শরীয়তপুরের মধ্যে পদ্মা-মেঘনা বহুমুখী সেতু নির্মাণ করা হলে এ বৈষম্য উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে। বর্তমানে বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে চলাচলকারী যাত্রীদের ভায়া ঢাকা পথে গন্তব্যে পৌঁছার দূরত্ব, সময় ও পরিবহন ব্যয় ভায়া চাঁদপুর পথের দূরত্ব, সময় ও পরিবহন ব্যয়ের দ্বিগুণ। চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক রাজধানী হিসাবে খ্যাত। যেহেতু রাজধানী শব্দটি উচ্চারিত, দেশের সব অঞ্চলের মানুষের অবাধে চট্টগ্রামে যাতায়াত অপরিহার্য। কিন্তু বৃহত্তর ফরিদপুরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গণমানুষের চট্টগ্রামে যাতায়াত বাঁধাগ্রস্ত ও নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে চট্টগ্রাম-চাঁদপুর ট্রেন সার্ভিস ও চাঁদপুর-শরীয়তপুর ফেরি সার্ভিস অকার্যকর এবং উদ্বোধনের শুরু থেকেই চট্টগ্রাম-খুলনা মহাসড়কের শরীয়তপুুর অংশটি (প্রায় ৩৫ কিলোমিটার) অস্বাভাবিক সংকীর্ণ (অপ্রশস্ত) রাখা হয়েছে।
পদ্মা সেতু চালু হলে চট্টগ্রাম থেকে ভায়া ঢাকা পথে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে গমনকাল ১ ঘণ্টা হ্রাস পাবে। কিন্তু দূরত্ব, পরিবহন ব্যয় ও জ্বালানী ব্যবহার অপরিবর্তিত থাকবে। এ পথে যাতায়াতে ৫টি সেতুতে টোল দিতে হবে। পদ্মা সেতু দিয়ে ঢাকা-মাওয়া পথে চলাচলরত যানবাহনের সাথে যুক্ত হবে ঢাকা-পাটুরিয়া পথে চলাচলকারী যানবাহন। এর সঙ্গে যখন বন্দরনগরী চট্টগ্রাম থেকে আগত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহনও পদ্মা সেতু দিয়ে চলাচল করবে তখন সেতুর উপর পড়বে অস্বাভাবিক চাপ। সেতুর উভয় প্রান্তে সৃষ্টি হবে অকল্পনীয় যানজট। পদ্মা সেতুর স্থায়িত্বের উপর পড়বে নেতিবাচক প্রভাব।
গত শতকের নব্বইর দশকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে নির্মিত মেঘনা ও মেঘনা-গোমতী সেতু ২টির মেয়াদ প্রাথমিকভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল একশ’ বছর। অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে সেতু ২টি চালু হওয়ার সিকি শতকেরও কম সময়ের মধ্যেই জরাজীর্ণ ও নড়বড়ে হয়ে পড়ে। এ বছর সেতু ২টির পাশে আরো ২টি সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে স্বল্প সময় ব্যবধানে একই স্থানে বারবার সেতু নির্মাণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এর ফলে দেশের অন্যান্য উন্নয়ন খাতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দে ঘাটতি দেখা দেয়।
পাটুরিয়া-দৌলদিয়া পয়েন্টে ২য় পদ্মা সেতু নির্মাণের দাবিও চলমান। এ দাবির পক্ষে ভৌগলিক অবস্থানও বিবেচনা করতে হবে। গুলিস্তান থেকে মাওয়ার দূরত্ব ৩৮ কিলোমিটার, অন্যদিকে পাটুরিয়ার দূরত্ব ৯০ কিমি। গুলিস্তান থেকে একই সময়ে দক্ষিণাঞ্চলগামী ২টি গাড়ি একটি মাওয়া পথে এবং অপরটি পাটুরিয়া পথে যাত্রা শুরু করলে দ্বিতীয়টি পাটুরিয়া পৌঁছার আগেই প্রথমটি মাওয়া-জাজিরা পদ্মা সেতু দিয়ে ফরিদপুর পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর প্রয়োজন আছে, কিন্তু তা কোনোক্রমেই অগ্রাধিকার পেতে পারে না। পদ্মা-মেঘনা নামটি যথার্থ, যেহেতু হরিণা ফেরিঘাটের পাশ দিয়ে পদ্মা-মেঘনার মিলিত স্রোত বহমান। বিপুল জলরাশির সত্তর শতাংশই পদ্মার কনট্রিবিউশন। চাঁদপুরের মেঘনার মধ্যবর্তী চরের পশ্চিমাংশের স্রোতধারাও পদ্মানামেই পরিচিত। চাঁদপুরের সাথে যেমন মেঘনা নামটি একাত্ম হয়ে আছে, তেমনি বৃহত্তর ফরিদপুরসহ গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পদ্মা নামটি। মেঘনা নামে বিভিন্ন পয়েন্টে কয়েকটি সেতু আছে। ভবিষ্যতে মেঘনা নদীর বিভিন্ন স্পটে একই নামে আরো সেতু হবে। গঠনশৈলী বিবেচনায় দেশের প্রধান যোগাযোগ অবকাঠামোর স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে পদ্মা-মেঘনা নামকরণই যৌক্তিক। সেতুটির দৈর্ঘ্য হবে অনধিক ৬ কিলোমিটার, এর মধ্যে মূল নদীর উপর থাকবে ৩ কিলোমিটার।
অনেকেই সেতুর বিকল্প হিসাবে টানেলের কথা বলছেন। টানেল নির্মাণ করতে হলে মূল নদীর উভয় পাশে অনেক দূর থেকে কাজ শুরু করতে হবে। এক্ষেত্রে টানেলের ন্যূনতম দৈর্ঘ্য হবে ২৫ কিলোমিটার। নদীর উভয় প্রান্তে স্থাপনা, বাড়িঘর, হাট-বাজার উচ্ছেদ করতে হবে। টানেলের পূর্ব প্রান্ত মূল নদী থেকে শুরু করে চাঁদপুর সদর উপজেলা, ফরিদগঞ্জ এবং লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। টানেলের নির্মাণ খরচ হবে ৮০ হাজার কোটি থেকে এক লাখ কোটি টাকা। অন্যদিকে সেতু নির্মাণে ব্যয় হবে আনুমানিক ৩০ হাজার কোটি টাকা। টানেল নির্মাণে সেতু নির্মাণের দ্বিগুণ সময় ব্যয় হবে। পদ্মা-মেঘনা বহুমুখী সেতু বাস্তবায়নে অর্থায়নের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। বার্ষিক বাজেট থেকে ৫/৬ হাজার কোটি টাকা করে বরাদ্দ দিলে ৫ বছরে সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ হবে। প্রতি বছরেই উন্নয়ন বাজেটের একটি অংশ অব্যবহৃত থাকে। সেতু নির্মাণে এই অর্থ ব্যয় করা যাবে। কল্পিত দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে ঋণ না দিয়ে অনুতপ্ত। এ সেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য দাতা গোষ্ঠীর সহায়তা নেয়া যেতে পারে। পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ প্রায় সমাপ্তির পথে। এ সেতু নির্মাণে বিদেশ থেকে আনা যন্ত্রপাতির অনেকটাই ব্যবহার করা যাবে পদ্মা-মেঘনা সেতু নির্মাণে।
সঠিক তথ্যের অভাবে অনেক বিজ্ঞজন বলছেন, হরিণা ফেরিঘাট দিয়ে সেতু নির্মাণ করা হলে নদীর প্রবাহ বাঁধাগ্রস্ত হবে। ভৈরবে মেঘনা নদীর উপর ১০০ মিটার দূরত্বের মধ্যে ২টি রেলসেতু এবং ১টি সড়ক সেতু আছে। ভৈরব থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে একই নদীর উপর পাশাপাশি ২টি সেতু আছে। অর্থাৎ ৫০ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে মেঘনা নদীতে ৫টি সেতু অবস্থিত। এতে মেঘনার প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। চাঁদপুর ও শরীয়তপুরের মধ্যে মাত্র ১টি সেতু নির্মাণ করা হলে প্রবাহ বাঁধাগ্রস্ত হবে- এ বক্তব্য কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সেতুর সাথে অহেতুক টানেলের বিতর্ক তুলে পদ্মা-মেঘনা বহুমুখী সেতুর নির্মাণ বিঘ্নিত ও দীর্ঘায়িত করা যাবে। এর ফলে দেশের সার্বিক উন্নয়নের গতিও ব্যাহত হবে। সম্প্রতি সরকারের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় উপমন্ত্রী জনাব একেএম এনামুল হক শামীম এমপি জাতীয় সংসদে শরীয়তপুর ও চাঁদপুরের মধ্যে সেতু নির্মাণের দাবি করেছেন।
দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ১১টি জেলার সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলাকে যুক্ত করবে পদ্মা-মেঘনা সেতু। দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম, পর্যটন নগরী কক্সবাজার, রাঙামাটি ও বান্দরবান। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে রয়েছে ২টি সামুদ্রিক বন্দর মোংলা ও পায়রা, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যাংগ্রোভ সুন্দরবন, কুয়াকাটা পর্যটন সৈকত, টুঙ্গিপাড়ায় জাতির জনকের সমাধি। তাছাড়া চাকরি, ব্যবসা, শিক্ষা আমদানি-রপ্তানির স্বার্থে বন্দরের ব্যবহার, বঙ্গবন্ধুর মাজার জিয়ারত ও তীর্থ ভ্রমণ প্রভৃতি কাজে দেশের উভয় অঞ্চলে প্রতিদিন হাজার-হাজার মানুষ যাতায়াত করে।
ইদানিং প্রকাশিত একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, গত শীত মৌসুমের ৩ মাসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মোট ১৫ লাখ পর্যটক কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত ভ্রমণ করেন। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে আগত পর্যটক প্রায় ২০% হলে এর সংখ্যা হবে ৩ লাখ। এতো বিপুলসংখ্যক পর্যটককে ঢাকা ঘুরে কক্সবাজার যেতে দীর্ঘ পথ পরিক্রমের দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। এসব পর্যটক চাঁদপুর হয়ে যেতে পারলে অর্থ, সময় ও জ্বালানীর অপচয় বহুলাংশে হ্রাস পেতো। পদ্মা-মেঘনা বহুমুখী সেতু নির্মাণ করা হলে নদীর উভয় তীরে গড়ে উঠবে সিমেন্ট, সার, ইস্পাত কারখানা, গার্মেন্টস ভিলেজ, ইপিজেড, বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প ও পর্যটন কেন্দ্র। খুলে যাবে নদী ভাঙন কবলিত হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের দ্বার। জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছাড়িয়ে যাবে লক্ষ্যমাত্রা। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নির্মাণ সামগ্রীর মূল্য হ্রাস পাবে, যা অবকাঠামোগত উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণে পদ্মা সেতুর পরিপূরক হবে পদ্মা-মেঘনা সেতু। দেশের ৩২টি জেলার মধ্যে গড়ে উঠবে সড়ক ও রেল যোগাযোগের অবিচ্ছিন্ন নেটওয়ার্ক। রাষ্ট্রের যোগাযোগ অবকাঠামোপূর্ণতাপাবে। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যে আকাশ-পাতাল অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন বৈষম্য, তা হ্রাস পেয়ে দেশ এগিয়ে যাবে সুষম উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে।
এমএ শাহেনশাহ : সাবেক পরিচালক, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আই.ই.আর), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং মহাসচিব, বাংলাদেশ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন ফোরাম।

২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯।