হাজীগঞ্জে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনক

২ মাসে ২০ শিশুসহ ২১ জনের মৃত্যু

পারিবারিক সচেতনতা জরুরি : স্বাস্থ্য কর্মকর্তা

মোহাম্মদ হাবীব উল্যাহ্
হাজীগঞ্জে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। গত দুই মাসে ১৯ শিশুসহ মোট ২১ জনের পানিতে ডুবে মারা গেছে। এর মধ্যে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে ১৭ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। বিশেষ করে উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে এবং যারা মৃত্যুর বিষয়টি স্থানীয়ভাবে নিশ্চিত হয়ে থাকেন, তারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসেন না। সে হিসেবে এই শিশু মৃত্যুর হার আরো বেশি হতে পারে বলে মনে করেন সচেতনমহল।
দেশে শিশু মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে পানিতে ডুবে মারা যাওয়া। অর্থাৎ অন্য যেকোনো কারণে মৃত্যুর চেয়ে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। এক গবেষণা সূত্রে জানা গেছে, দেশে প্রতিদিন ৪০ শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। সারা বছর পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটলেও সাধারণত বর্ষা মৌসুমে বেশি দুর্ঘটনা হয়ে থাকে। সাধারণত যেসব শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়, তাদের বয়স ১ থেকে ৫/৭ বছরের মধ্যে।
চাঁদপুরের মধ্যে হাজীগঞ্জ উপজেলায় পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর হার বেশি। গত দুই মাসে পানিতে ডুবে মৃত্যুর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সংবাদ নজরে আসে। নভেম্বর মাসে ৯ শিশু এবং অক্টোবর মাসে একজন বৃদ্ধা নারীসহ ১২ শিশু পানিতে ডুবে মারা গেছে। বিশেষ করে গত মাসে বালতির পানিতে ডুবে ১৫ মাসের এক শিশু এবং দুই দিনে চার শিশুর মারা যাওয়ার বিষয়টি সবার নজরে আসে।
গত ২৭ নভেম্বর পুকুরের পানিতে ডুবে বাকিলা ইউনিয়নের খলাপাড়ায় ফয়সাল হোসেন (৪) ও একই দিনে সদর ইউনিয়নে সুবিদপুর গ্রামে শাখাওয়াত হোসেন (২), ১৯ নভেম্বর হাজীগঞ্জ পৌরসভাধীন রান্ধুনীমড়ুা গ্রামে মারওয়া আক্তার জারা (৩), ১৬ নভেম্বর বদরপুর গ্রামে ইনতিয়া ইসলাম ইভা (৫), ৮ নভেম্বর হাটিলা পূর্ব ইউনিয়নে বলিয়া গ্রামে ফারজানা (২) মারা যায়।
একই মাসের ৬ নভেম্বর পুকুরের পানিতে ডুবে পৌরসভাধীন কংগাইশ গ্রামে আব্দুল্লাহ (২) ও একই দিনে সদর ইউনিয়নের বাড্ডা গ্রামে সায়মা আক্তার (২), ৪ নভেম্বর কালচোঁ দক্ষিণ ইউনিয়নের রামপুর-নওহাটা গ্রামে সাকিবুল হাসান (৭) এবং ২ নভেম্বর বড়কুল পূর্ব ইউনিয়নে বড়কুল গ্রামে কুলসুমা আক্তার (২) মারা যায়।
এছাড়া গত ২ অক্টোবর পুকুরের পানিতে ডুবে দ্বাদশগ্রাম ইউনিয়নের মালাপাড়া গ্রামে আনোয়ার হোসেন (২), ৪ অক্টোবর পৌরসভাধীন মকিমাবাদ গ্রামে সায়মুন হোসেন (৪), ৬ অক্টোবর পনিশাইর গ্রামে রাহুল (৮) ও একই দিনে বড়কুল পশ্চিম ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর গ্রামে আব্দুর রহমান (২) ও ১০ অক্টোবর রাজারগাঁও গ্রামে আশরাফি (৬) মারা যায়।
একই মাসের ১৪ অক্টোবর পুকুরের পানিতে ডুবে কালচোঁ দক্ষিণ ইউনিয়নের নওহাটা গ্রামে ইভা আক্তার (৩) ও একই দিন রামপুর গ্রামে আব্দুল্লাহ্ আল মাহি (৪), ২০ অক্টোবর রাজারগাঁও ইউনিয়নে পশ্চিম রাজারগাঁও গ্রামে একই বাড়ির ও একই সময়ে ফাহিম (১১) ও নাজমুল হাসান (৯), ২১ অক্টোবর গন্ধর্ব্যপুর উত্তর ইউনিয়নের পালিশারা গ্রামে আমেনা বেগম (৯০), ২৬ অক্টোবর পনিশাইর গ্রামের আয়ান (৩) ও ২৭ অক্টোবর বড়কুল পূর্ব ইউনিয়নের ফারিহা সুলাতানা (১৫ মাস) মারা যায়।
উপজেলায় আশংকাজনক হারে শিশু মৃত্যু বৃদ্ধির কারণ হিসেবে সচেতনমহল মনে করেন, চারদিকে বিভিন্ন ধরনের জলাশয় (পুকুর, নদী, ডোবা, খাল, বিল) এবং বসতঘরের ২০ মিটারের মধ্যে পুকুর বা জলাশয় থাকা, বড় বাচ্চাদের ক্ষেত্রে সাঁতার না জানা, তাৎক্ষণিক প্রাথমিক চিকিৎসা জ্ঞান না থাকা। ফলে পানি থেকে উঠানোর পর কী করা, তা না জানা।
এছাড়া অভিভাবকদের সন্তানদের প্রতি ঠিকমতো নজর না রাখা। বাবারা কাজে ঘরের বাইরে থাকার কারণে সাধারণত মায়েরাই মূলতঃ সন্তান দেখাশোনার কাজটি করেন। কিন্তু পারিবারিক ও সাংসারিক কাজে তাদের ব্যস্ত থাকতে হয় বলে সন্তানকে সব সময় চোখে চোখে রাখা মায়েদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। যার ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিশুরা পানিতে ডুবে মারা যায়।
পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু প্রতিরোধে বর্ষার সময়কে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। বাবা ও মায়ের পাশাপাশি পরিবারের অন্য সদস্যদেরও শিশুদের প্রতি মনোযোগ বাড়াতে হবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সন্তানকে সাঁতার শেখাতে হবে। কমিউনিটি বা সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের থেকে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সাঁতার শেখানোর তাগিদ দেয়া। তারপরও দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যায়। এজন্য বাবা ও মায়ের বাড়তি সতর্কতা থাকা দরকার বলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা মনে করেন।
হাজীগঞ্জে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর হার আশংকাজনক উল্লেখ করে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এসএম সোয়েব আহমেদ চিশতী জানান, পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু প্রতিরোধে ৫ বছরের বেশি বয়সী শিশুদের সাঁতার শেখানো এবং ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের চোখে চোখে রাখতে হবে। বাবা-মাকে আরো বেশি সচেতন ও সতর্ক হতে হবে। এক্ষেত্রে পারিবারিকভাবে সচেতনতা জরুরি।
০৩ ডিসেম্বর, ২০২০।