সাধারণ ভোটারদের মধ্যে নেই উত্তাপ ও উত্তেজনা
মোহাম্মদ হাবীব উল্যাহ্
৬ষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপে আজ মঙ্গলবার (২১ মে) হাজীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এদিন ইভিএম’র মাধ্যমে সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত একটানা ভোটগ্রহণ করা হবে। অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে নিñিদ্র নিরাপত্তার ব্যবস্থাসহ সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। গতকাল সোমবার কেন্দ্রে সব সরঞ্জামও পৌঁছে গেছে।
এদিকে নির্বাচনে চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে একাধিক প্রার্থী রয়েছেন। তারপরও ভোট নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে উত্তাপ ও উত্তেজনা দেখা যাচ্ছেনা। অর্থ্যাৎ নিরুত্তাপ এই ভোটে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী ছাড়া কারও তেমন কোন আগ্রহ নেই। এর মধ্যে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও ভোট বর্জনের আহ্বান জানিয়েছে প্রচার-প্রচারণা করেছে বিএনপি।
যার ফলে নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করতে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রতীক, কাউকে মনোনয়ন ও সমর্থনও দেয়নি। এতে নিজ দলের প্রার্থীদের মধ্যেই লড়াই হতে যাচ্ছে। যদিও বিএনপির দুই নেতা নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। এ কারণে দল থেকে তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে। আজকের নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের ২ জন ও বিএনপির ১ জনসহ মোট ৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছেন।
এর মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা হলেন- আনারস প্রতীকের প্রার্থী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ হেলাল উদ্দিন মিয়াজি ও দোয়াত-কলম প্রতীকের প্রার্থী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হাজী জসিম উদ্দিন। অপর প্রার্থী বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা ঘোড়া প্রতীকের প্রার্থী আবু সুফিয়ান মজুমদার রানা। অপরদিকে ভাইস চেয়ারম্যান পদে কামরুজ্জামান সুমন বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।
নির্বাচনে মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে ২ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে পৌর মহিলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রুবি আক্তার ফুটবল প্রতীক এবং বিএনপির বহিস্কৃত নেত্রী রাবেয়া আক্তার প্রজাপতি প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর আগেও বিএনপির এই নেত্রী ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন।
নির্বাচন নিয়ে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিবার উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান পদে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়। ভোটের আগে সাধারণ ভোটার ও নেতা-কর্মীদের মধ্যে দেখা দেয় ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। গভীর রাত পর্যন্ত চা-দোকানগুলোতে মানুষের আলাপ আলোচনায় মুখরিত। কিন্তু এবার বিএনপিসহ অন্যান্য দলের প্রার্থী না থাকায় ভোটারদের নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ কম।
তবে আওয়ামী লীগের যে দুইজন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। তারা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ব্যাপক গণসংযোগ করেছেন। সমান তালে মাইকেও চলেছে প্রচারণা এবং পাড়া-মহল্লায় শোভা পাচ্ছে ব্যানার ও পোস্টার। করেছেন লিফলেট বিতরণ। হয়েছে মিছিল, পথসভা ও উঠান বৈঠক। তবে এসব তৎপরতাও ভোটারদের মধ্যে তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি বলে মনে করছেন নির্বাচন পর্যবেক্ষকেরা।
এদিকে নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হলেও হাজী জসিম উদ্দিনের জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ। তারা বলেন, সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগসহ অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা ছিলেন দুই ভাগে বিভক্ত। দলের এক অংশ ছিলেন সাংসদ মেজর অব. রফিকুল ইসলাম বীরউত্তমের নৌকা প্রতীকের পক্ষে এবং অপর অংশ ছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গাজী মাঈনুদ্দিনের ঈগল প্রতীকের পক্ষে।
কিন্তু উপজেলা নির্বাচনকে ঘিরে দলের মধ্যে কোন বিভক্তি ছিলো না। উপজেলা ও পৌর আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ সহযোগী সংগঠনের শীর্ষস্থানীয়সহ প্রায় সব নেতাকর্মী এবং উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির নেতৃবৃন্দ এক ও অভিন্ন হয়ে দোয়াত-কলম প্রতীকের প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন এবং সবাই হাজী জসিমের নির্বাচন করছেন।
অপরদিকে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ হেলাল উদ্দিন মিয়াজীর প্রচার-প্রচারণায় দুই/চারজন নেতাকর্মী ছাড়া দলীয় কাউকে দেখা যায়নি। যার ফলে হাজী জসিমের জয়ের পাল্লাই ভারী এবং তিনিই হচ্ছেন, আগামির উপজেলা চেয়ারম্যান। এমনটিই দাবি করেন নেতৃবৃন্দ। যেহেতু সাধারণ মানুষের ভোটে আগ্রহ কম, সেহেতু দলীয় নেতাকর্মীরা ভোট দিলেই হাজী জসিম উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবেন।
এদিকে আনারস প্রতীকের প্রার্থী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ হেলাল উদ্দিন মিয়াজী তিনিও জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। তাঁর সাথে থাকা নেতৃবৃন্দ মনে করেন, দলীয় নেতাকর্মীসহ সাধারণ জনগণ আনারস প্রতীকে ভোট দিবে। কারণ হিসেবে তারা বলেন, আলহাজ হেলাল উদ্দিন মিয়াজী একজন সৎ লোক। আর মানুষ সৎ লোককে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করার অপেক্ষায় আছেন এবং তাকেই ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবেন।
এছাড়া রয়েছেন বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা ঘোড়া প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী আবু সুফিয়ান মজুমদার রানা। তিনিও জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। তিনি মনে করেন, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ হলে জনগণ কেন্দ্রে যাবে। আর জনগণ ভোট দিতে পারলেই তিনিই নির্বাচিত হবেন।
মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেছে। তবে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী ফুটবল প্রতীকের প্রার্থী রুবি আক্তার। তিনি চেয়ারম্যান প্রার্থী হাজী জসিম উদ্দিনের সাথে থেকে তরি পার হতে চান। কারণ, তিনি পৌর মহিলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করছেন।
তাঁর সাথে যিনি প্রতিদ্বিন্দ্বতা করছেন তিনি বিএনপির বহিষ্কৃত নেত্রী প্রজাপতি প্রতীকের প্রার্থী রাবেয়া আক্তার। যেহেতু বিএনপি নির্বাচনে আসছেনা, সেহেতু তার (রুবি আক্তার) জয়ের পাল্লা ভারী বলে দাবি করেন তিনি। তবে রাবেয়া আক্তার আগেও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। নির্বাচনে তাঁর বেশ অভিজ্ঞতা রয়েছে। রাজনীতিতেও তিনি সিনিয়র। জেলা বিএনপির সভাপতি ও উপজেলা বিএনপির মহিলা বিষয়ক সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাই, এ পদে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এবারের নির্বাচনে উপজেলায় ভোটার হলেন ২ লাখ ৮৬ হাজার ৪৮৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৪৮ হাজার ৮৪১ জন ও নারী ভোটার ১ লাখ ৩৭ হাজার ৬৪৬ জন। নির্বাচনে ১টি পৌরসভা ও ১২টি ইউনিয়নে মোট ৮৮টি কেন্দ্রে ৭২০টি বুথে ভোটগ্রহণ করা হবে। নির্বাচনে ৮৮ জন প্রিজাইডিং অফিসার ও ৭০২ জন সহকারী প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করবেন।
নির্বাচনের আগে ও পরে মোট ৫দিন পর্যন্ত আচরণ বিধি প্রতিপালন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও প্রতিরোধে উপজেলায় একজন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও ১২ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, ২ প্লাটুন বিজিবি, র্যাব ও পুলিশের স্ট্রাইকিং ফোর্স, পুলিশের ১৫টি মোবাইল টিম, ব্যাটালিয়ন আনসারের ১টি ও অঙ্গীভূত আনসারের ১টি টিম এবং প্রতিটি কেন্দ্রে পুলিশ ও আনসারসহ পর্যাপ্ত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবেন।
২১ মে, ২০২৪।
