ইলিশের বাড়ি নামে পরিচিত হাইমচরে নেই ইলিশ

জেলে পরিবারগুলোতে হতাশা

সাহেদ হোসেন দিপু
মাছের রাজা ইলিশ, আর সেই ইলিশের বাড়ি চাঁদপুরের নামে খ্যাত হলেও সুস্বাদু ইলিশের বাড়ি হাইমচরের নামেই পরিচিত। এখন সেই রুপালি ইলিশ হাইমচরের ঘেনা নদীতে নাই বললেই চলে। জেলেদের জালে ইলিশ ধরা না পড়ায় মাছ শিকার করতে নদীতে যাচ্ছে না জেলেরা। কাক্সিক্ষত মাছ না পাওয়ায় যেমনি জেলে পরিবারগুলোতে হতাশা তেমনি মাছ ব্যবসায়ী, আড়ৎধার থেকে শুরু করে মৎস্যের সাথে সংশ্লিষ্ট সব পরিবারগুলোতেই একপ্রকার হাতাশা নেমে এসেছে। বেশিরভাগ জেলে বিকল্প পেশা বেছে নিলেও অনেক জেলে এখনো মাছের আশায় নদীতে জাল পেলে যাচ্ছেন।
হাইমচর উপজেলার সবচেয়ে বড় মাছের আড়ৎ চরভৈরবী মাছ ঘাটের জেলে আবুল হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ২০১৮ সালেও নদীতে প্রচুর পরিমানে ইলিশ মাছ পাওয়া যেত। নদীতে জাল ফেললেই জাল ভরে মাছ উঠতো। মাছ বিক্রি করে ছেলে সন্তানদের পড়ালেখার খরচ বহন করে দু’ বেলা দু’মুঠো ভাত খেয়ে ভালভাবেই দিন কাটিয়ে কিছু পুঁজি করতে পারতাম। আর এখন নদীতে জাল ফেললে ২টা কিংবা ৪টা ইলিশের পোনা পাই। তা বিক্রি করে তেল খরচই উঠে না। নদীতে মাছ না পড়ায় পেটের দায়ে অন্য পেশার কাজ করা ছাড়া আর কিছু করার নাই।
এ ব্যাপারে জেলে আমির মিজি বলেন, মেঘনায় ভরা মৌসুমে নদীতে ইলিশে ভরপুর থাকার কথা সেখান জালে মাছ পড়ছে না। আমরা ছেলে মেয়ে ও পরিবার নিয়ে কষ্টে আছি। নদীতে মাছ না থাকায় নৌকার ভাগিরা অন্য পেশা খুঁজছেন। যার ফলে নদী মাছ ধরার জন্য লোক পাওয়া যাবে না।
চরভৈরবীর মাছের আড়ৎদার লিটন মোল্লা জানান, এক সময় হাইমচর উপজেলার মেঘনায় ইলিশের ভরপুর ছিল। মাছের আড়ৎ, জেলে পাড়ায়, বাজারে, ইলিশের হাট বসতো মোড়ায়-মোড়ায়। ইলিশের ভরা মৌসুম আসলে জেলে পল্লীতে ইলিশের সুস্বাদু গন্ধে মন ভরে যেতো। ধীরে ধীরে হাইমচরের মেঘনা নদীতে জেলেদের জালে ইলিশ স্বল্প পরিসরে উঠতে থাকে। নদীতে মাছ কমতে কমতে বর্তমানে দেখা মিলছে না রুপালী ইলিশের। মেঘনায় নদীতে মাছ না থাকায় অধিকাংশ জেলেরা বিকল্প পেশার চিন্তা করছে।
তেলির মোড় মাছ ঘাটের আড়ৎদার বাবুল পেদা জানান, মেঘনায় ভরা মৌসুমে জেলেরা মাছ পাচ্ছে না। যার কারণে অনেক নৌকার ভাগিরা কাজ করার জন্য অন্যত্র চলে যাচ্ছে। আমরা আড়ৎদাররা জেলেদের লক্ষ লক্ষ টাকা দাদন দিয়েছি। কিন্তু নদীতে মাছ না থাকায় খুবই কষ্টে চলতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের ভবিষ্যৎ খুবই ভয়াবহতার দিকে ধাবিত হবে।
জেলে প্রতিনিধি মানিক দেওয়ান জানান, বিগত কয়েক বছর ধরে মেঘনায় ইলিশ রক্ষায় যে অভিযানগুলো পরিচালনা করা হয় তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন না করার ফলে আজ আমাদের নদীতে ইলিশ মাছ নাই। মা’ ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের অভিযানে কেউ নিষেধাজ্ঞা মানে না। প্রশাসনও অসাধু জেলেদের মানানোর জন্য কঠোরভাবে পদক্ষেপ নেয় না। জাটকা অভিযানেও একইভাবে চলে জাটকা নিধন। যার ফলে বর্তমানে নদীতে তেমন কোন মাছ নাই। জেলেরা তাদের খরচটুকু উঠাতে পারে না। নদীতে আগেরমত ইলিশ মাছ পেতে হলে ইলিশের বংশ বাড়াতে হবে। তার জন্য প্রয়োজন অভিযান চলাকালীন সময়ে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। নয়তোবা কোন এক সময় ইলিশ মাছের নাম ভুলো যাবে আগামি প্রজন্ম।
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য অফিসার মাহবুবুর রহমান বলেন, মূলত ইলিশ মাছ গভীর জলের কিংবা স্রোতের মাছ। নদী গভীর ও স্রোত থাকলে মাছগুলো মোহনা থেকে উঠে নদীতে আসে। মেঘনা নদীতে বিভিন্ন স্থানের পলিমাটির কারণে চর পড়ে নদী শুকিয়ে গেছে। ডুবোচর পড়ে নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে। যার ফলে সমুদ্র থেকে ইলিশ মাছ আগের মত এখন আর আসে না।

১৬ জানুয়ারি, ২০২৪।