দৈনিক ইল্শেপাড়ে অপকর্মের সংবাদ প্রকাশের পর
স্টাফ রিপোর্টার
স্বাধীনতার ঘোষক দাবি করে আদালতে রিট দায়ের করা হাজীগঞ্জের চাঁন মিয়া অবশেষে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই বাছাই তালিকা থেকে বাদ
পড়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাজীগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটির একজন সদস্য বলেন, চাঁন মিয়ার উত্থাপিত কাগজপত্র এবং তার বক্তব্যে যথেষ্ট অসঙ্গতি থাকায় তাকে হাজীগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়।
এ খবর শুনে চাঁন মিয়া ক্ষিপ্ত হয়ে হাজীগঞ্জ উপজেলার রাজারগাও বাজারে যাচাই কমিটির সদস্যদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করায় গত ১২ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় জনতা তাকে গণধোলাই দেয়া। পরে সে ক্ষমাপ্রার্থী হলে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। বিভিন্ন সময়ে আলোচিত-সমালোচিত এই ব্যাক্তি মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে বাদ পড়ায় রাজারগাও ইউনিয়নের জনগণ উল্লাস প্রকাশ করে। জনগণের উল্লাস কারণ হচ্ছে কথিত এ মুক্তিযোদ্ধা অকারণেই মানুষদের হয়রানি করে টাকা আদায় করতে কথায় কথায় মামলা দিয়ে থাকেন। হাজীগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে চাঁন মিয়াকে বাদ দেয়ায় তার দৌরাত্ম্য কমবে বলে মনে করেন রাজারগাঁও ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্ত জনগণ।
সরেজমিনে জানা যায়, চাঁন মিয়া বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে কোর্ট পাওয়ার নিয়ে প্রায় অর্ধ শতাধিক মামলা পরিচালনা করে আসছে। এ বিষয়ে ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২০ তারিখে ‘স্বাধীনতার ঘোষক দাবী করা চাঁন মিয়া শতাধিক পরিবারকে মামলা দিয়ে হয়রানির অভিযোগ’ শিরোনামে স্থানীয় দৈনিক ইল্শেপাড়সহ কয়েকটি পত্রিকায় তার অপকর্ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। তার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশিত হলে মুক্তিযোদ্ধা সার্জেন্ট আবু তাহেরসহ এলাকার কিছু গণ্যমান্য ব্যক্তি সম্পর্কে তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি হতে অশালীন মন্তব্য প্রকাশ করে। এর প্রতিবাদে গত বছর ২৯ সেপ্টেম্বর মুক্তিযোদ্ধা সার্জেন্ট আবু তাহের তার বিরুদ্ধে হাজীগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়রি করেন।
মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে কথিত এ স্বাধীনতার ঘোষক মুক্তিযুদ্ধের সময়ে চাঁদপুর ষোলঘরস্থ টেকনিক্যাল হাই স্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত ছিল। বার বছর বয়সী একজন ছাত্র যখন নিজেকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে দাবি করে হাইকোর্টে রিট দায়ের করলে দেশব্যাপী জনমনে একটাই প্রশ্ন জাগে যে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়া একজন ছাত্রের স্বধীনতার ঘোষণা দেয়া, তা কিভাবে সম্ভব?
এছাড়া জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা এ দাবিকে অস্বীকার করে নিজেকে স্বাধীনতার ঘোষক দাবি করেন হাজীগঞ্জের এ চাঁন মিয়া। কেবল দাবি করেই তিনি ক্ষান্ত হননি; রীতিমত হাইকোর্টে রীট আবেদন করেছেন!
জানা যায়, চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ উপজেলার রাজারগাঁও গ্রামের মৃত ছিদ্দিক বেপারির ছেলে চাঁনমিয়া স¦াধীনতার দীর্ঘ সময় পর হঠাৎ নিজেকে স্বাধীনতার ঘোষক দাবি করে ২০১০ সালের ২৩ এপ্রিল হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট সেকশনে একটি রিট দায়ের করেন। বিষয়টি নিয়ে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকাসহ কয়েকটি জাতীয় পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হলে তাকে নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠে। তাই তিনি রিট আবেনটি শুনানি না করে নিজেকে প্রশাসনের কাছ থেকে আড়াল করতে ঢাকা ছাড়েন এবং নিজ গ্রাম রাজারগাঁওয়ে অবস্থান করেন।
আলোচিত এ আবেদনের বিষয়ে চান মিয়ার আইনজীবী আবু বকর সিদ্দিক জানান, ১৯৯৬ সালে মুদ্রিত স্কুলের সমাজবিজ্ঞান বইতে উল্লেখ করা হয়েছে, শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে শেখ মুজিব যে পত্রে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন সেটি ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ সকাল ৭টায় মগবাজার ওয়ারলেস স্টেশন থেকে চাঁদপুরের ষোলঘর বেতার স্টেশনে পৌঁছায়। সকাল ৮টায় এ মেসেজ চাঁন মিয়ার হাতে যায়। তিনি তখন স্কুল ছাত্র। মেসেজ হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি এলাকার মানুষকে বক্তব্যের আকারে এটা জানান। বিভিন্ন সভাও করেন তিনি। আবেদনে আরো বলা হয়, চাঁন মিয়া নিজেকে স্বাধীনতার ঘোষক দাবি করে ২০০০ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দফতরে ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। কিন্তু সরকার তার আবেদনে সাড়া দেয়নি। ২০০১ সালে তার স্বাধীনতা ঘোষণার এ বিষয়টি এলাকার ও জাতীয় বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে আছে ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক সোনালী বার্তা। প্রতি বছর চাঁদপুরের মুক্তিযুদ্ধ মেলায় তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার স্বাধীনতা ঘোষণার বিষয়টি নিশ্চিত করে বক্তব্য দিয়ে আসছিল। (সূত্র : যায়যায়দিন) খবরটি পড়ার পর যেকোন পাঠকের মনেই প্রশ্ন আসতে পারে, আসলে কোন দাবিটি সত্যি? শেখ মুজিব- ১. জহুর আহমেদ চৌধুরীর নিকট ইপিআর ম্যাসেজটি পাঠিয়েছিলেন? ২. আব্দুল হান্নানের ইপিআর ম্যাসেজটি পাঠিয়েছিলেন? ৩. চাঁদপুরের চাঁন মিয়া ইপিআর ম্যাসেজটি প্রচার করেছিলেন? ৪. শেখ মুজিব আদৌ কোন ম্যাসেস চাঁন মিয়াকে দিয়েছেন কি? অবশ্য (হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত বাঙলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র গ্রন্থ থেকে অসঙ্গতির কারণে চাঁন মিয়ার এই ঘোষণাটি বাদ দেয়া হয়েছে)। সর্বশেষ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ সালে হাজীগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটি কর্তৃক চাঁন মিয়া মুক্তিযোদ্ধা তালিকা থেকেও বাদ পড়লো।
২৩ মার্চ, ২০২১।
