দুর্যোগ থেকে মুক্তি পেতে মধ্যরাতে

মো. আবরার হোসাইন
গত শুক্রবার রাত ১০টার পর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত চাঁদপুরের মসজিদে-মসজিদে আজান দেয়া হয়। মহামারী করোনা থেকে মুক্তিলাভের জন্য এই ওয়াক্তবিহীন আজান দেয়া হয় বলে অনেক আলেম জানিয়েছেন। মসজিদের মুয়াজ্জিনরা মহামারী করোনা ভাইরাস থেকে মুক্তিলাভের জন্য মহান আল্লাহর স্মরণে মধ্যরাতে আজান দেন। রাতের মধ্যভাগে হঠাৎ আকাশে-বাতাসে আজানের প্রতিধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে।
কিন্তু কোন ঘোষণা ছাড়া হঠাৎ করে মসজিদ থেকে আজান দেয়ায় আশপাশের সাধারণ মানুষের মধ্যে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। কেউ-কেউ রাতের বেলা অজানা দুর্যোগের আশংকাও করেন। ফরিদগঞ্জ উপজেলার গল্লাক বাজারের কাছে নারিকেল তলা এলাকা থেকে এ প্রতিনিধির কাছে ফোন আসে। তারা জানান, করোনা ছাড়াও ভূমিকম্প থেকে রক্ষা পেতে মসজিদে-মসজিদে আজান হচ্ছে। ঐ অঞ্চল থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে রায়পুর ও রামগঞ্জ উপজেলার মসজিদগুলোতেও ১০টার পর থেকে ১২টা পর্যন্ত আজান হয়েছে।
বিশ্বের ১৯৮টি দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে করোনা ভাইরাস। প্রাণঘাতী এ রোগে ইতোমধ্যে বাংলাদেশের ৫জন মারা গেছেন। কিন্তু কতজন আক্রান্ত হয়েছেন- তা এখনো নিশ্চিত নন কেউই। এ দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ধর্মানুরাগী মুসলিম। এমন ক্রান্তিকালে ইসলামের নির্দেশনানুযায়ী ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে দেশের প্রায় সব মসজিদে। এ আজান কোনো রাষ্ট্রীয় কোনো সিদ্ধান্ত ছিলো না। তবে মহামারীর সময় আজান দেয়া একটি মুস্তাহাব বিষয়।
ধর্মীয় আলেম-ওলামাদের এখতিয়ারে মহামারী থেকে মুক্ত হতে আজানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ধর্মীয় আলেমগণ বলেন যখন মানবজাতির উপর কোনো বিপদাপদ ও মহামারি আসে তখন আজান দিয়ে মহামারি ও রোগবালাই থেকে পরিত্রাণের মুস্তাহাব পদ্ধতি হচ্ছে আজান দেয়া। আজান এক ইসলামের এক মৌলিক ইবাদত নামাজের দিকে আহ্বানের মাধ্যম। আজানের মাধ্যমে আল্লাহর রহমত অবতীর্ণ হয়, বিপদ ও আযাব দূরীভূত হয়।
হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে হুজুর (ﷺ) এরশাদ করেন, اِذَا اُذِّنَ فِیْ قَرِیَةٍ اٰمَنَھَا اللہُ مِنْ عَذَابِهٖ فِیْ ذٰلِكَ الْیَوْمِ যখন কোন গ্রামে আজান দেয়া হয়, তখন মহান আল্লাহ (ﷻ) সেদিন ওই গ্রামকে তার আজাব থেকে নিরাপদে রাখেন।
তবে তাঁরা বলেন, এই আজানে ‘হাইয়্যা আলাস সালাহ্, হাইয়্যা আলাল ফালাহ্’ ছাড়া বাকি সব শব্দ উচ্চারিত হবে। ওলামায়ে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা’য়াতের আলেমরা বলেন, গত ২৬ মার্চ দিবাগত রাত যেহেতু শুক্রবারের এবং আরবি সাবান মাসের ১ম রজনী ছিলো, তাই এটি একটি ফজিলতপূর্ণ রাত। তাই ঐদিন রাত ১০টার পর থেকে একযোগে সব মসজিদে আজান দিয়ে মহান আল্লাহ’র রহমত কামনা করা হবে। তবে এই আজানের জন্য কোনো নির্ধারিত সময় নেই যে কোনো সময়ই এই আজান দেয়া যাবে। এটি শরীয়ত সমর্থিত মুস্তাহাব আমল।
নামাজের সময় ছাড়া এভাবে আজান দেয়ার বিধান সম্পর্কে ইসলাম কি বলে, এ বিষয়ে চাঁদপুর সরকারি কলেজ ইসলামি শিক্ষা বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহযোগী অধ্যাপক হাফেজ মাও. মোহাম্মদ রুহুল আমিন জানান, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে আজান দেয়ার বিধান রয়েছে। যেমন বাচ্চা জন্মগ্রহণ করলে। তাছাড়া মহামারি, কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ঝড় তুফান ইত্যাদিতে আজান দেয়ার বিধান আছে। এছাড়া নদী ভাঙ্গন রোধ, বৃষ্টির জন্যে নামাজ, খতমে শেফা অনুষ্ঠানে আমরা সাধারণত আগে ঘোষণা দিয়ে থাকি। ঠিক তেমনিভাবে আজকের রাতের আযানের ক্ষেত্রে আগে ঘোষণা দিলে জনমনে আতংক ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতো না। যেহেতু এগুলো সমন্বিত ইবাদত সেহেতু জনসাধারণকে না জানিয়ে কোনো ইবাদত ঘোষণা দেয়া উচিত নয়।
এ বিষয়ে চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদের পেশ ইমাম ও খতিব মুফতি আবদুর রউফ জানান, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় ছাড়াও সন্তান জন্মগ্রহণ করলে আজান দেয়ার বিধান ইসলামে রয়েছে। তবে অন্যান্য সময় আজান দেয়া ইসলামে সহি হাদীস অনুযায়ী বর্ণিত নেই।
এই আলেম জানান, জনমনে আতঙ্ক, ভয় সৃষ্টি করে কোন কাজ করা ইসলামে নিষিদ্ধ রয়েছে। রাতে অনেকেই আমাকে ফোন করে জানিয়েছেন যে, হাটাজারি হুজুর, জৈ¦নপুরী পীর সাহেব এমনকি কেউ কেউ আমার কথাও বলেছেন, যে স্বপ্নে দেখা গেছে আজান দিতে বলা হয়েছে এতে বৈশি^ক মহামারি দূর হবে।
চাঁদপুর বাগাদী দরবারের পীরাজাদা ও বাগাদী আহমদীয়া ফাজিল মাদরাসার আরবী প্রভাষক মাও. মাহফুজ উল্যাহ খান জানান, রদ্দুল মুখতার ফতোয়ায়ে শামী জা আল হক শরহে আবু দাউদ শরীফের সূত্রে কিছু স্থানে আজান দেয়া সুন্নাত। সেগুলো হলো সন্তান জন্ম নিলে, কোন মহামারী দেখা দিলে, আগুন লাগলে, জ্বিন দূরীভূত করা, মানসিক রোগী, কেউ রাস্তা হারিয়ে ফেললে, কোন হিংস্র জানোয়ার এর আক্রমণ রোধ করার জন্য, কেউ অতিরিক্ত রাগান্বিত হলে, কোন এলাকায় মহা দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে। তবে এসব স্থানে আজানের ক্ষেত্রে ‘হাইয়্যা আলাস সালাহ্’ ও ‘হাইয়্যা আলাল ফালাহ্’ ব্যাতিত বাকি শব্দগুলো উচ্চারিত হবে।
তবে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে এমন কাজ করা ঠিক নয়। পূর্ব ঘোষণা ছাড়া আজান দিলে মানুষের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টি হবে। তবে হঠাৎ এ আজানে মানুষজন আতংকিত হয়ে গেছে, এটি আগে জানানো হয়নি কেনো?- এমন প্রশ্নে মাও. মাহফুজ উল্যাহ বলেন, ‘এ ব্যাপারে অভিজ্ঞ আলেমদের মত হচ্ছে যে, মহামারী থেকে বাঁচতে সম্মিলিতভাবে আজান দেয়ার একটি ঘোষণা বাস্তবায়ন করা সম্ভব তবে তা ব্যাপকভাবে জানান দিয়ে দিলে উত্তম হতো এবং কোন গ্রহণযোগ্য আলেম অথবা শীর্ষস্থানীয় শরীয়াহ বোর্ড থেকে বিষয়টি প্রচারিত হলে ফিতনার আশঙ্কা ছিল না। বিষয়টি পূর্ব থেকে ব্যাপক প্রচারিত না হওয়ায় জনমনে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েেেছ। আর এ সংক্রান্ত হাদিসটি ব্যাপক প্রচারিত না হওযায় জনমনে ফেতনার আশঙ্কা রয়েছে। এই মুহূর্তে সবাইকে ধৈর্যধারণ করার জন্য এবং ভালোটাকে মেনে নেয়ার জন্য তিনি অনুরোধ জানান।
আলেমরা এই আজানের প্রমাণস্বরূপ হিসেবে বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থের নাম উল্লেখ করে বলেন, ফিকহে হানাফীর প্রসিদ্ধ কিতাব রদ্দুল মুখতার বা ফতোয়ায়ে শামী, জায়াল হক, শরহে আবু দাউদ শরীফে উল্লেখ আছে- নামাজের ওয়াক্ত ছাড়া ১০ জায়গায় আজান দেয়া সুন্নাত। যথা- ১. কোনো এলাকায় মহা দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে, ২. কোনো মহামারি দেখা দিলে, ৩. আগুন লাগলে, ৪. জি¦ন দূরীভূত করার জন্যে, ৫. মানসিক রোগীদের সুস্থতা দানের জন্যে, ৬. কেউ রাস্তা হারিয়ে ফেললে, ৭. কোনো হিংস্র জানোয়ারের আক্রমণ রোধ করার জন্যে, ৮. কেউ অতিরিক্ত রাগান্বিত হলে, ৯. সন্তান জন্ম নিলে ও ১০. ইন্তেকালের পর কবরের পাশে।
