প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, শীর্ষ আমলা থেকেও দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা

ইল্শেপাড় রিপোর্ট
স্বাধীনতার প্রায় অর্ধ শতাব্দীর পড়ও একটি সমৃদ্ধ জেলা হিসেবে গড়ে উঠেনি চাঁদপুর। গত ৫ দশকে চাঁদপুরে প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারের প্রভাবশালী বেশ কয়েকজন মন্ত্রীও ছিলো এ জেলার। ধারাবাহিকভাবে এখনো মন্ত্রীর সাথে একদল দক্ষ আমলাও আছেন। আগের মতো বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী ছাড়া রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সবই আছে, কিন্তু নেই সদিচ্ছার। যার কারণে গত ৫ দশকেও এ জেলায় একটি মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারেননি এসব নেতৃবৃন্দ।
বর্তমান পরিস্থিতিতে করোনাভাইরাস সারা বিশ্বের সাথে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে যখন মানবিক দুর্যোগ আর হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে, ঠিক তখনি প্রশ্ন উঠেছে এ জেলার স্বাস্থ্য সেবার মান নিয়ে। জেলার প্রায় ২৬ লাখ মানুষের স্বাস্থ্য সেবা দেয়ার মত কি মানসম্মত কোন হাসপাতাল আছে? থাকলেও তার সক্ষমতাই বা কতটুকু? আর যদি সক্ষমতা না থাকে তাহলে কী হবে? এমন হাজারো প্রশ্ন জেলাবাসীর মনে।
বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় এমন করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়তে হলে প্রথমেই প্রয়োজন মানসম্মত হাসপাতাল ও দক্ষ চিকিৎসকের দল। সাথে থাকতে হবে আইসিইউ, সিসিইউ ও পর্যাপ্ত অক্সিজেন সিলিন্ডারের ব্যবস্থাও। বর্তমানে যার কোনটিই নেই, চাঁদপুরের একমাত্র ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতালটির।
কেন নেই? এমন প্রশ্নের উত্তরও জানা নেই হাসপাতালসহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ কিংবা সর্বসাধারণের কাছে। এমন পরিস্থিতিতে করোনাভাইরাসের প্রভাবে আতংকগ্রস্ত জেলাবাসীর কাছে প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে, দেশে এতো উন্নয়ন আর উন্নয়নের শ্লোগানের জয়-জয়কার, তারপরও কেন দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা? তাহলে কবে হবে জেলাবাসীর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন?
চাঁদপুর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সদর হাসপাতালে আইসিইউ, সিসিইউ ও পর্যাপ্ত অক্সিজেন সিলিন্ডরের ব্যবস্থা আছে কি-না জানতে খোঁজ নিলে দেখা যায়, হাতেগোনা কয়েকটি অক্সিজেন সিলিন্ডরের ব্যবস্থা আছে বর্তমানে। আবার অক্সিজেনের সরবরাহ থাকে না অনেক সময়ই। তবে হাসপাতালের একটি সূত্র জানায়, সরকার ২০১৬ সালে আইসিইউ, সিসিইউ ও স্থায়ীভাবে অক্সিজেন উৎপাদনের জন্য একটি প্রকল্প বরাদ্দ দেয়। যার পরিমাণ প্রায় ১৬ কোটি টাকা ছিলো।
প্রকল্পটির অর্থ বরাদ্দের খবরে চাঁদপুরবাসী তাদের স্বাস্থ্যসেবার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের একধাপ অগ্রগতি হয়েছে বলে আশার আলো দেখে। কিন্তু বাঁধ সাধে ঐ সময়ের সামগ্রিক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিস্থিতি। অভিযোগ ছিলো সরকার মহল বিরোধীমত দমনে বেশি ব্যস্ত থাকায়, ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতালের পরিচালনা পর্ষদ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য তাদের নিয়মিত সভার আয়োজনে ব্যর্থ হয়। এছাড়া ছিলো ভূমির স্বল্পতা। যা শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তি ছাড়া সমাধানের কোন পথ ছিলো না। এতে আমলাতান্ত্রিক নানা জটিলতার সৃষ্টি হতে পারতো। তাতেই চাঁদপুরবাসীর স্বাস্থ্য নিয়ে উচ্চ আয়োজনও ভেস্তে যায়।
সূত্রটি আরো অভিযোগ করে, রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণেই সংশ্লিষ্টরা কেবল সভা করতেই ব্যর্থ হয়নি, তারা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতেও ব্যর্থ হয়। ফলে ঐ সময়ের হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. প্রদীপ কুমার হাসপাতালের পর্যাপ্ত জায়গা নেই মর্মে প্রকল্পের বরাদ্দকৃত ১৬ কোটি টাকা ফেরৎ দিয়ে দেন। তারপরই জেলাবাসীর উন্নত স্বাস্থ্য সেবার উন্নয়নের স্বপ্নের অপমৃত্যু হয়।
প্রকল্পটির টাকা ফেরত যাওয়ার পর এটি কি রাজনৈতিক ব্যর্থতা না আমলাতান্ত্রিক ব্যর্থতা তা নিয়ে সর্বমহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। কেউ-কেউ অভিযোগ করেন তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক ডা. প্রদীপ কুমার ও জেলা প্রশাসক আবদুস সবুর মন্ডল ভিন্ন জেলার বাসিন্দা হওয়ায় তারা এমনটি করেছেন, হয়তো ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায়। কিন্তু ঐ সময়ের প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দর ব্যর্থতার বিষয়টিও আলোচিত ছিলো জেলাবাসীর কাছে।
তবে কেউ কেউ বলছেন, ঐ সময়ের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ অবকাঠামো নির্মাণে ভূমি জটিলতার বিষয়টিকে তাদের রাজনৈতিক দূরদর্শিতার মাধ্যমে সমাধান করতে পারেনি। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিজ উদ্যেগে দাবিকৃত চাঁদপুর জেলা প্রশাসকের বাসভবনের পেছনের ৯১নং মিউনিসিপ্যালিটি মৌজার ১নং খতিয়ানভূক্ত ৫৬১১ ও ৫৬১৯ দাগের .০৩৯৩৬ একর ভূমি সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে চিঠি চালাচালি করে।
প্রকল্পটি ফেরত যাওয়ার প্রায় ৬ মাস পর তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মো. নাছিম চাঁদপুর সরকারি ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতাল পরিদর্শনে এলে পুনরায় হাসপাতালের নতুন ভবন নির্মাণ, ঐ ভবনে সিসিইউ ওয়ার্ড স্থাপনের দাবি উঠে। তখন স্বাস্থ্যমন্ত্রী বিষয়টি সমাধান করবেন বলে গণমাধ্যমসহ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে আশ্বস্ত করেছিলেন। কিন্তু তা আর আলোর মুখ দেখিনি।
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ৫ দশকে চাঁদপুরের শীর্ষ পর্যারে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ যারা সরকারের মন্ত্রী পরিষদে ছিলেন তারা হলেন- সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুম মিজানুর রহমান চৌধুরী, সাবেক ধর্মমন্ত্রী মরহুম মাও. এম এ মান্নান, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী মেজর জেনারেল শামসুল হক, সাবেক সংস্থাপন প্রতিমন্ত্রী মরহুম নুরুল হুদা, সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম, সাবেক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি এবং বতর্মান সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এমপি।
এছাড়া প্রশাসনের শীর্ষ আমলা (সচিব) হিসেবে আছেন বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহম্মেদ, বাংলাদশ পুলিশের মহাপরিদর্শক ড. জাবেদ পাটওয়ারী, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ, জাতীয় অধ্যাপক ও শিক্ষাবিদ ড. রফিকুল ইসলাম, পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অবসরপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ডা. কাজী মোস্তফা সারোয়ার, পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মাসুদ রেজওয়ান পিএসসি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ সচিব মো. শাহ্ কামাল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমির হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নুরুল আমিন প্রমুখ।
অনান্য শীর্ষ পর্যায়ে যারা আছেন- মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার লে. কর্নেল (অব) আবু ওসমান চৌধুরী ও মেজর (অব) রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম এমপি, জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি সাংবাদিক সাইফুল আলম, সাবেক সভাপতি সাংবাদিক শফিকুর রহমান এমপি, দৈনিক ইনকিলাব সম্পাদক এম এম বাহাউদ্দিন, বাংলাদেশ ফেডারেশন সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি রুহুল আমিন গাজী, জাতীয় রাজস্ব বিভাগ (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন, আন্তর্জাতিক চিত্রশিল্পী ও একুশে পদকপ্রাপ্ত মনিরুল ইসলাম, দেশসেরা চিত্রশিল্পী ও একুশে পদকপ্রাপ্ত হাশেম খান, একুশে পদকপ্রাপ্ত গণমাধ্যমকর্মী শাইখ সিরাজ, স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত ডা. সৈয়দা বদরুন্নাহার চৌধুরী প্রমুখ।
উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি ছাড়াও দেশের সরকারি-বেসরকারি উদ্যেক্তা হিসেবে আরো অনেকেই সাফল্যের স্বাক্ষর রাখছেন নিজ নিজ ক্ষেত্রে। তবে দায়বদ্ধতা হিসেবে নিজ জেলার জন্য কি কোন অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছেন তারা- এমন প্রশ্নের উত্তর নেই জেলার অনেকের কাছেই।
বর্তমান করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিতে জেলার শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজ, সরকারের মন্ত্রী, এমপি, জনপ্রতিনিধিসহ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যক্তিবর্গ নিজ নিজ ক্ষেত্রে কে কি ভূমিকা রাখছেন বা রাখবেন তাই দেখতে চায় জেলার সিকি কোটি মানুষ। সাথে একটি সক্ষমতা সমৃদ্ধ জেলাবাসীর স্বাস্থ্য সেবার পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল।
উল্লেখ্য, বর্তমান সরকারের গত ১৫ বছরে চাঁদপুরে হাজার-হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড হলেও নেতৃবৃন্দ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের অমনযোগিতা ও গাফলতির কারণে স্বাস্থ্যসেবার এ অবস্থা বলে মনে করেন স্থানীয় সর্বোচ্চ সুশীল সমাজ।
