আর্থিক ও সামাজিক চাপে জীবনব্যবস্থা
ইলশেপাড় রিপোর্ট
সারা দেশের মতো চাঁদপুরেও করোনা ভাইরাসের প্রভাবে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যহত হয়ে পড়ছে। একদিকে করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধি তাদের তাড়া করছে, আরেকদিকে তাড়া করছে দারিদ্র্যতা। এমন জীবন যুদ্ধে ব্যাপক অসহায়ত্বের মধ্যে আছে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষজন। তারাই এখন সবচেয়ে বড়ো সামাজিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। সার্বিক এ দুর্যোগ কবে কাটবে তা এখনো অনিশ্চিত সবার কাছে। ঠিক তেমনি মধ্যবিত্ত শ্রেণির লোকজনের নিয়মিত ঘরে খাবারের যোগানও অনিশ্চয়তায় পড়ছে এই পরিস্থিতিতে।
মধ্যবিত্তরা ঠিক এ মুহূর্তে চক্ষুলজ্জায় কারো কাছে সহযোগিতা চাইতেও পারছেন না, আবার বলতেও পারছে না কিভাবে জীবনযাপন করবেন। সেই সাথে শহরে বসবাস করা অনেকেই রয়েছেন বাড়ি ভাড়া পরিশোধের চাপে। সাথে সন্তানদের পড়াশোনার চিন্তার সাথে নিয়মিত পরিবারের খাবারের যোগান ঠিক রাখতেই এখন তাদের রাতের ঘুম হারাম হচ্ছে। এ অবস্থায় জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে নাকানিচুবানি খেতে হচ্ছে চাঁদপুরের মধ্যবিত্তদের। এতসব দুশ্চিন্তার মধ্যেও মধ্যবিত্তদের শেষ সঞ্চয়টুকু যেমন ফুরিয়ে যাচ্ছে, তেমনি অনেকে আবার কর্মহীন হয়ে পড়ছেন।
দুশ্চিন্তার মধ্যবিত্তদের সাথে রয়েছে, সাধারণ খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষও। সমাজে সাধারণ মানুষের আর্থিক সঙ্কট বেড়ে যাওয়ায় নিয়মিত নিত্ত্যনৈমিত্তিক কাজগুলো বন্ধ রয়েছে। যার কারণে দিনমজুররাও আছেন অনেকটাই বিপাকে। বর্তমানে সরকারি সাহায্যসহ বিত্তশালীদের সহায়তা বন্ধ থাকায় দারিদ্র পরিবারগুলোও তাদের বেঁচে থাকার শেষ স্বপ্নটুকু হারাতে বসেছে। যেমনটি মতলব দক্ষিণ উপজেলার পত্রিকা বিলিকারক রফিকের হয়েছে।
পত্রিকা বিক্রি করে কোনমতে সংসার চালাতেন রফিক। তার দু’মেয়েকে মোটামুটি লেখাপড়া করিয়ে বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। ছোট মেয়ে বর্তমানে অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। বড় মেয়েটিকে বিয়ের পর থেকে যৌতুকের যন্ত্রণায় রয়েছে রফিক। তার একমাত্র উপার্জনের পথ ছিলো পত্রিকা বিক্রি করা। করোনাভাইরাসের কারণে পত্রিকা সরবরাহ বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়ে রফিক। চলতি মাসে মতলব দক্ষিণে পত্রিকা সরবরাহ শুরু হলেও বেচা-বিক্রি তেমন একটা নেই। সংসার চালাতে সে উপায়ন্ত না পেয়ে এখন রিক্সা চালাচ্ছে। তবে রাস্তায় তেমন যাত্রীও নেই।
এদিকে চাঁদপুরের এক প্রাইভেট স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষক বলেন, প্রতি মাসেই নির্ধারিত মুদির দোকান থেকে তিনি বাকিতে বাজার করতেন। নিয়মিত মাসের টাকা পরের মাসে বেতন তুলে দিতেন দোকানিকে। প্রতিষ্ঠানটি প্রাইভেট হওয়ায় বেতন হয় শিক্ষার্থীদের বেতনের ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু বর্তমানে প্রতিষ্ঠান বন্ধ, তাই বেতনও পাচ্ছেন না ঐ শিক্ষকসহ অন্য কর্মচারীরাও। ফলে বাকির দোকানিকেও কিছু বলছে পারছে না। চলার জন্য আত্মীয়-স্বজনের কাছে ধার নিয়ে কিছু টাকা দোকানিকে দিলেও এখন নগদ টাকায় কিনতে হচ্ছে বাজার-সদাই। বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনদের কাছে ধার-দেনা থাকায়, তারাও এখন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
অনেকটা হতাশা নিয়ে এক এনজিও কর্মী জানান, ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাচ্ছে কিছুই জানি না। স্বপ্ন ছিল একটি সুন্দর আগামি দিনের। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজ করোনা নামের এক প্রাণঘাতী ভাইরাস ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে হয়তো খাবার জন্যই মরতে হবে। এ পরিস্থিতির শিকার বিভিন্ন পেশাজীবীর অনেক মানুষের।
তবে ইতোপূর্বে যত সমস্যার মধ্যেই থাকুন না কেন, ‘কেমন আছেন’ প্রশ্ন করলে মধ্যবিত্তের প্রিয় উত্তর ‘ভালো আছি’। এই করোনাকালেও সবাই মুখে হাসি টেনে রাখলেও সবচেয়ে বিপজ্জনক সময় পার করছে কেবল মধ্যবিত্ত শ্রেণিই। তাদের চাকরি কিংবা ব্যবসাসহ অনান্য কর্ম কি থাকবে না বন্ধ হবে এই অনিশ্চয়তার মধ্যে পুরো জীবনটাই যেন আতঙ্কের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে মধ্যবিত্তরা।
তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই অবস্থা চললে আগামি কয়েক মাসের মধেই অনেক মধ্যবিত্ত যোগ হবে নিম্নবিত্তের তালিকায়। এই পরিস্থিতিতে শহরে বসবাসকারী অনেকেই ফিরে যাবে গ্রমে। তবে সংকটকালে তেমন নিম্নবিত্তের সমস্যা হয় না। তারা যে কোনো কাজে নিজেকে নিয়োজিত করতে পারে। আবার উচ্চবিত্তরা তাদের সম্পদের কারণে যে কোনো পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে। কেবল যত সমস্যা মধ্যবিত্তের। কারণ তাদের নেমে যেতে হয় নিম্ন-মধ্যবিত্ত পর্যায় হয়ে নিম্নবিত্তের পর্যায়ে। ফলে সামাজিক ও আর্থিক চাপে ভেঙে পড়ে তাদের জীবনব্যবস্থা।
বর্তমানে করোনাভাইরাস সারা পৃথিবীকেই আমূল পাল্টে দিয়েছে। সেই সাথে আমাদের স্বাস্থ্যখাতের দুর্বলতাও স্পষ্ট করে দিয়েছে। সাধারণ মানুষও বুঝেছে, যদি একবার তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে, তাহলে তাদের অনেক কিছুই করতে হবে। করোনা পরবর্তী অর্থনীতি কেমন হবে, কীভাবে এই আর্থিক মহাপ্রলয় ঠেকানো যাবে- তা নিয়ে প্রতিটি দেশের সরকার পলিসি তৈরি করছে। সাধারণ মানুষকে সাহায্য করে কীভাবে সঙ্কট থেকে বের হয়ে আসা যায়, সেটাই এখন সব সরকারের প্রধান উদ্দেশ্য।
এদিকে দেশের দারিদ্র্যের হারের পরিসংখ্যান বলছে, জুন ২০১৯ সালের হিসেবে মতে দেশের দারিদ্র্য হার সাড়ে ২০ শতাংশে নেমে এসেছে। গত ২০১৮ সালের জুন মাস শেষে এই হার ছিল ২১ দশমিক ৮ শতাংশ। গত জুন শেষে অতি দারিদ্র্যের হার নেমেছে সাড়ে ১০ শতাংশে। এক বছর আগে এর হার ছিল ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। বর্তমান এই সঙ্কটে যদি নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষেরা আর্থিক সহায়তা না পান বা এই অবস্থা লম্বা সময় ধরে দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে দেশের এই শ্রেণিটি আবার হতদরিদ্রের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতে পারে বলে অভিমত অর্থনীতিবিদদের।
২৬ জুলাই, ২০২০।
