চাঁদপুরে করোনা সংক্রমণ রোধে প্রশাসনের তৎপরতা অব্যাহত

কাল থেকে এক সপ্তাহের লকডাউনে সারাদেশ

ইলশেপাড় রিপোর্ট
বৈশ্বিক মহামারী করোনার বিস্তার ঠেকাতে সরকার সোমবার (৫ এপ্রিল) থেকে আগামি এক সপ্তাহের জন্য সারাদেশে লকডাউন ঘোষণা করেছে। লকডাউন ঘোষণার আগে সরকার জরুরি সেবা প্রতিষ্ঠান ছাড়া সব অফিস ও কারখানা অর্ধেক জনবল দ্বারা পরিচালনা, উপাসনালয়ে স্বাস্থ্যবিধি মানা, জনসমাগম সীমিত করা, গণপরিবহনে ধারণ ক্ষমতার অর্ধেক যাত্রী পরিবহনসহ ১৮ দফা নির্দেশনা দিয়ে এক প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতেও যখন সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি ঠিক, তখনি আগামি এক সপ্তাহের জন্য লকডাউন ঘোষণা করা হয়।
এদিকে চাঁদপুরেও মহামারী করোনার প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসন তৎপরতা অব্যাহত রাখছে। ১৮ দফা বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসন গত বৃহস্পতিবার দুপুরে জুম অ্যাপের মাধ্যমে এক ভার্চুয়াল সভা অয়োজন করে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির সাথে। সভায় জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিশ এবং সিভিল সার্জন ডা. মো. সাখাওয়াত উল্লাহ চাঁদপুরের করোনা পরিস্থিতি তুলে ধরেন। এ সময় চাঁদপুর জেলা ঝুঁকিপূর্ণ ৩১টি জেলার একটি ছিলো।
সভায় শিক্ষামন্ত্রী চাঁদপুরের করোনা পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং সর্বত্র স্বাস্থ্যবিধি মানতে বাধ্য করতে প্রশাসনকে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি হাট-বাজার, হোটেল-রেস্তোরাঁ, যানবাহন, লঞ্চঘাট, বাসস্ট্যান্ডসহ সর্বত্র যেনো স্বাস্থ্যবিধি মানা হয় এ জন্য প্রশাসনের যাতে কঠোর নজরদারি থাকে সে বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী গুরুত্বারোপ করেন।
তারই ধারবাহিকতায় গত শুক্রবার ভ্রাম্যমাণ অভিযানে নামে জেলা প্রশাসন। সরকারের গণবিজ্ঞপ্তি না মানায় শহরের চাইনিজ রেস্টুরেন্ট ‘রসুইঘর’ কে ভ্রাম্যমাণ আদালত ১ লাখ টাকা জরিমানা করে। গত শুক্রবার বিকেলে এ ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. উজ্জ্বল হোসাইন। একই দিন সকালে শহরের পালকি, বিপণীবাগস্থ পার্টি সেন্টার, রেডচিলি চাইনিজ রেস্টুরেন্ট, এরোমা চাইনিজ রেস্টুরেন্ট, হিলশা কিচেন, এলিট চাইনিজসহ কয়েকটি পার্টি সেন্টারে গিয়ে সতর্কতামূলক প্রচারণা করে সতর্ক করে দেয় ভ্রাম্যমাণ আদালত।
পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালত শহরের বিভিন্ন স্থানে স্বাস্থ্যবিধি না মানায় ৯ জনকে ১ হাজার ৯শ’ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেন। সন্ধ্যা ৬টায় বড়স্টেশন মোলহেড এলাকায় দর্শনার্থীদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে এবং লোক সমাগম না করার জন্যে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মঞ্জুর মোর্শেদ সতর্ক করেন এবং আগত দর্শনার্থীদের মোটরসাইকেল জমা রেখে টোকেনের মাধ্যমে অর্থ আদায় করায় মো. রিয়াদ হোসেন নামের একজনকে ৪ হাজার টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়। সেখানে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জনসাধারণকে বিনামূল্যে মাস্কও বিতরণ করা হয়। গতকাল শনিবারও জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা শহরের বিভিন্ন স্থানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন।
অপরদিকে প্রতিদিনই সারা দেশে করোনা রোগী বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার প্রভাবেই সরকার লাকডাউনের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়। করোনা সংক্রমনের প্রকোপ গত একমাস আগেও এতটা ভয়াবহ ছিলো না। হঠাৎ করে মার্চ মাস থেকেই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে করোনা সংক্রমন। যদিও সরকার গত ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ৪০ উর্ধ্ব নাগরিকদের করোনা ভ্যাকসিনের আওতায় আনার জন্য অনলাইন রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম শুরু করেন। সে আলোকে চাঁদপুরে গত ৭ ফেব্রুয়ারি হতে ৩ এপ্রিল পর্যন্ত টিকা জন্য রেজিস্ট্রেশন করে ৭৩ হাজার ৩শ’ ২০ জন এবং টিকা গ্রহণ করেছে ৫৭ হাজার ১৯ জন, বলে সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে লকডাউনের ঘোষণা শুনে সর্বসাধারণের মাঝে নানা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। খেটেখাওয়া দিনমজুর কিংবা সাধারণ শ্রমিকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সাথে মধ্যবিত্ত থেকে নিম্ন মধ্যবিত্তরা তাদের নিজদের হতাশার কথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুলে ধরছেন। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা অনেকটাই আতঙ্কে পরছে পরিবার-পরিজন নিয়ে। এজন্য তারা প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, লকডাউনে যেন পুরোপুরি যেন তাদের রুটি-রুজির পথ বন্ধ করে না দেয়া হয়। লকডাউন কার্যকরের আগেই চাঁদপুর শহরসহ আশপাশের বিভিন্ন হাট-বাজারে নিত্যপণ্য কেনার জন্য সর্বসাধারণের উপচেপড়া ভিড়ও লক্ষ্য করা গেছে।
তবে করোনা সংক্রমণ রোধে আগামিকাল সোমবার থেকে ৭ দিনের দেশজুড়ে লকডাউনের ঘোষণা থাকলেও এ সময় জরুরি প্রয়োজনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান খোলা রাখার কথা জানিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন। তিনি গত শনিবার দুপুরে গণমাধ্যমকে বলেন, জরুরি সেবার প্রতিষ্ঠান, কাঁচাবাজার, ওষুধ ও খাবারের দোকানের পাশাপাশি পোশাক এবং অন্যান্য শিল্পকারখানা লকডাউনের আওতামুক্ত থাকবে।
তিনি আরও বলেন, আমরা চাচ্ছি লকডাউনে মানুষের চলাচল যতটা সম্ভব বন্ধ করার। কারণ, যেভাবে করোনা ছড়াচ্ছে তাতে মানুষের ঘরে থাকা জরুরি। তবে জরুরি সেবার প্রতিষ্ঠান, কাঁচাবাজার, খাবার ও ওষুধের দোকান লকডাউনের আওতামুক্ত থাকবে। এছাড়া পোশাক ও শিল্প কারখানাগুলো খোলা থাকবে। কারণ, কারখানা বন্ধ হলে শ্রমিকদের বাড়ি ফেরার তাড়া থাকে। এতে করোনার ঝুঁকি আরও বাড়ে। কারখানায় শ্রমিকদের একাধিক সিফটে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কাজ করতে বলা হবে।
যদিও ১৮ দফা নির্দেশনা দিয়ে প্রজ্ঞাপনে সরকার ১. সব ধরনের সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়সহ যেকোনো উপলক্ষে জনসমাগম সীমিত করার কথা বলা হয়েছে। প্রয়োজনে উচ্চ সংক্রমণ এলাকায় জনসমাগম নিষিদ্ধ থাকবে। ২. মসজিদসহ সব ধর্মীয় উপাসনালয়ে স্বাস্থ্যবিধি পালন নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে। ৩. পর্যটন, বিনোদন কেন্দ্র, সিনেমা হল, থিয়েটার হলে জনসমাগম সীমিত করতে হবে এবং সব ধরনের মেলা আয়োজন নিরুৎসাহিত করা হবে। ৪. গণপরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে এবং ধারণক্ষমতার অর্ধেকের বেশি যাত্রী পরিবহন করা যাবে না। ৫. সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আন্তঃজেলা যান চলাচল সীমিত করতে হবে, প্রয়োজনে বন্ধ করতে হবে। ৬. বিদেশফেরত যাত্রীদের ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করতে হবে। ৭. নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী খোলা ও উন্মুক্ত স্থানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বেচাকেনা করতে হবে। ৮. স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোয় মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা নিশ্চিত করতে হবে। ৯. শপিং মলে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েরই যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা বাধ্যতামূলক। ১০. দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কোচিং সেন্টার বন্ধ থাকবে। ১১. অপ্রয়োজনে রাত ১০টার পর ঘর থেকে বের হওয়া নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ১২. প্রয়োজনে বাইরে গেলে স্বাস্থ্যবিধি পুরোপুরি মানতে হবে। এ ক্ষেত্রে মাস্ক না পরলে বা স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চললে আইন অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ১৩. করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বা করোনার লক্ষণ রয়েছে এমন ব্যক্তির আইসোলেশন নিশ্চিত করতে হবে এবং আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা অন্যদের কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করতে হবে। ১৪. জরুরী সেবায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান ছাড়া সব সরকারি-বেসরকারি অফিস, প্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা ৫০ শতাংশ লোকবল দিয়ে পরিচালনা করতে হবে। অন্তঃস্বত্বা বা, অসুস্থ, ৫৫ বছরের অধিক বয়সী ব্যক্তিদের বাসায় থেকে কাজের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ১৫. সভা, সেমিনার, প্রশিক্ষণ, কর্মশালা যথাসম্ভব অনলাইনে আয়োজন করতে হবে। ১৬. সশরীরে উপস্থিত হতে হয় বা এমন যেকোনো ধরনের গণপরীক্ষার ক্ষেত্রে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা নিশ্চিত করতে হবে। ১৭. হোটেল, রেস্তোরাঁয় ধারণ ক্ষমতার অর্ধেক মানুষ প্রবেশ করতে পারবে। ১৮. কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ ও অবস্থানের পুরোটা সময়ই বাধ্যতামূলকভাবে মাস্ক পরাসহ সব স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।
এদিকে গত বছরের মার্চ মাস থেকে ৩ এপ্রিল পর্যন্ত চাঁদপুর করোনায় আক্রান্ত হয়েছে মোট ৩ হাজার ২শ’ ২৯ জন। আর মৃত্যু হয়েছে ৯৩ জন। সুস্থ হয়েছেন ২ হাজার ৮শ’ ৩১ জন। বাকিরা চিকিৎসাধীন বলে সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে।
অপরদিকে শনিবার পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদফতরের পাঠানো করোনা বিষয়ক নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, এখন পর্যন্ত সারা দেশে মোট সুস্থ হয়েছেন ৫ লাখ ৪৯ হাজার ৭৭৫ জন। আক্রান্ত হয়েছে মোট ৬ লাখ ৩০ হাজার ২শ’ ৭৭ জন। মৃত্যু হয়েছে ৯ হাজার ২শ’ ১৩ জনের।
০৪ এপ্রিল, ২০২১।