ইল্শেপাড় রিপোর্ট
চাঁদপুরে ধর্ষণসহ একাধিক মামলার আসামির বিরুদ্ধে হঠাৎ কোটিপতি বনে যাওয়া ও বিলাসবহুল জীবন-যাপনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। শুধু তাই নয় প্রশাসনের নাকের ডগায় প্রতিনিয়ত চলাফেরা করলেও আসছে না সে আইনের আওতায়। ফলে সাধারণ মানুষ বলছে, কে এই রনি? কি তার খুঁটির জোর? কাদের আশ্রয়ে সে এমন অপকর্ম করেও বীরদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছে? একটি ইউনিয়ন পরিষদের সামান্য মেম্বার হয়ে তার বিলাসী চলাফেরা ভাবিয়ে তুলেছে বিভিন্ন মহলকে। ফলে শিক্ষামন্ত্রীসহ সরকারের ইমেজকে করছে সে প্রশ্নবিদ্ধ।
এমন অভিযোগ উঠছে চাঁদপুর সদর উপজেলার রাজরাজেশ্বর ইউনিয়ন পরিষদের ৩নং ওয়ার্ডের সদস্য পারভেজ গাজী রনির বিরুদ্ধে। ইতোমধ্যে সে ব্যক্তিগতভাবে মেঘনা নদীতে স্প্রিডবোট ব্যবহার করে অঘোষিত নৌ-সম্রাট বনে গেছেন। যার কারণে দেশের জাতীয় সম্পদ ইলিশ রক্ষার সরকারি সব ধরনের উদ্যোগই ভেস্তে যাওয়ার পথে বসেছে। এমনকি প্রশাসনসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীও তার কাছে অনেকটাই নাজেহাল হতে হচ্ছে হরহামেশাই।
সামান্য একজন ইউপি সদস্যের খুঁটির জোর দেখে খোদ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীও অনেকটা বিব্রত। এমন পরিস্থিতিতে নানা বিতর্ক উঠা রনির খুঁটির জোর যেমন এক রহস্যময় হয়ে উঠছে প্রশাসনের কাছে, তেমনি সরকারের মা ইলিশ রক্ষা কার্যক্রম এখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পরছে সর্বমহলে।
এদিকে সরকার গত ১৪ অক্টোবর থেকে ‘মা-ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান-২০২০’ শুরু করে। যা আগামিকাল ৪ নভেম্বর শেষ হবে। মা ইলিশ রক্ষায় সরকার নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও নদীতে জেলেদের ইলিশ শিকার বন্ধ করতে পারছে না। ইতোমধ্যে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী জেলেদের নিয়ন্ত্রণ করতে নানা অভিযান পরিচালনা করলেও সংঘবদ্ধ জেলেদের আক্রমনের শিকার হতে হচ্ছে তাদের। জেলেদের এমন আক্রমনের পেছনে কি শক্তি কাজ করে তা নিয়েই বিব্রত প্রশাসন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ২৫ অক্টোবর রাজরাজেশ্বরে ছিরারচর ও শিলায়েরচর এলাকায় পারভেজ গাজী রনির অনুগত জেলেরা সংঘবদ্ধ হয়ে নৌ-পুলিশের উপর হামলা চালায়। এতে করে ১৩ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য গুরুতর আহত হয়। ঐ ঘটনায় ইতোমধ্যেই পারভেজ গাজী রনিকে হুকুমের আসামি করে মামলা দায়ের (নং-৪৮) করা হয়েছে।
তবে স্থানীয় জেলেরা বলছে, নৌ-সম্রাট রনির ছত্রছায়াই তারা প্রতিনিয়ত ইলিশ শিকারের জন্য নদীতে নামছেন। কারণ হিসেবে জেলেরা দাবি করছে, সরকার দলীয় সমর্থক হওয়ায় রনির হাত এখন রক্ষুশী মেঘনার চেয়েও বড়। উত্তাল মেঘনা মানুষের ঘর-বাড়ি কেড়ে নেয় প্রাকৃতিক নিয়মেই। কিন্তু ইলিশ শিকারের মতো নদীশাসনের দায়িত্ব কেবল ক্ষমতাসীন নেতা পারভেজ গাজী রনির’ই রয়েছে বলে অভিযোগ জেলেদের।
এদিকে মেঘনা নদীর নৌ-অভিযানগুলো পর্যবেক্ষণ ও আটক জেলেসহ স্থানীয় মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, রাজরাজেশ্বর ইউনিয়নের সাবেক ইউপি মেম্বার মৃত ইয়াকুব গাজী ও নাছিমা বেগমের ছেলে পারভেজ গাজী রনি। গত ইউপি নির্বাচনে মৃত বাবার ইমেজ ব্যবহার করেই মেম্বার নির্বাচিত হন তিনি। তারপরই বিভিন্ন অপকর্মের সাথে জড়িয়ে পড়েন তিনি। বিশাল মেঘানার নৌপথকে ব্যবহার করে গড়ে তোলেন নৌ-মাদক সিন্ডিকেট, স্প্রিডবোট ও কার্গোর মাধ্যমে প্রমোদ মেলা। ফলে মাত্র সাড়ে ৪ বছরেই হয়ে যান কোটি টাকার মালিক, আর শুরু করেন বিলাসবহুল জীবন-যাপন।
ইউপি সদস্য রনির প্রমোদ মেলায় প্রভাবশালীদের অবাধ অংশগ্রহণ থাকায় সে হয়ে উঠে বেপরোয়া। ফলে সে নৌ-সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মা ইলিশ রক্ষা কার্যক্রমকে বাঁধাগ্রস্ত করার জন্য জেলেদের পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ করছে একটি সংঘবদ্ধ চক্রকে। যারা নদীতে জেলেদের সাথে থেকে প্রশাসনকে নাজেহাল করে থাকে অনায়াশেই। আর রনির প্রভাবের কাছে অনেকটাই অসাহায় হয়ে ‘মা ইলিশ রক্ষার কার্যক্রম’ শেষ করার পথে প্রশাসন।
এদিকে স্থানীয়রা বলছে, ২০১৮ সালে মা ইলিশ রক্ষায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) জাহেদ পারভেজ চৌধুরীর নেতৃত্বে অভিযানে রাজরাজেশ্বরে গরু ঘরের গর্ত থেকে ১শ’ ২৪ মণ ইলিশ উদ্ধারের মামলার এজহারভুক্ত আসামি এই রনি মেম্বার। অথচ এখনো তিনি স্বপদে বসে নদীশাসন করছেন সমানতালে।
স্থানীয়রা আরো বলছেন, চলতি বছরের জুন মাসে রাজরাজেশ্বরে দু’গ্রুপের সংঘর্ষে লোকমান গাজী নামের এক ব্যক্তি নিহত ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। সেই লুটপাট ও খুনের মামলার অন্যতম এজহারভুক্ত আসামিই হচ্ছেন ইউপি মেম্বার রনি। তাছাড়া মাত্র ক’বছর আগে চাঁদপুর শহরের বড়স্টেন এলকার মদীনা বোর্ডিংয়ে ফরিদগঞ্জের এক নারীকে ধর্ষণ করার অভিযোগের ঘটনায় ৩ মাস কারাভোগ করেন রনি।
এছাড়া ইতোমধ্যে ক্ষমতার অপব্যবহার করে রনি মেঘনা নদীতে নিজস্ব স্প্রিডবোটের মাধ্যমে নদীর পাড়ে মা ইলিশ বিক্রির ভিডিও পাওয়া গেছে। তারপরও সে ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে প্রভাবশালীদের আশীর্বাদে। এমন পরিস্থিতিতে ইলিশ রক্ষাসহ স্থানীয় সংসদ সদস্য ও শিক্ষামন্ত্রীর ভাবমূর্তিই এখন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে সর্বমহলে।
এমন অপকর্মের বিষয়ে ইউপি সদস্য পারভেজ গাজী রনির বক্তব্য নেয়ার জন্য তার মুঠোফোনে (০১৮৪২…….১৪) বার-বার যোগাযোগ করেও তার বক্তব্য নেয়া যায়নি।
৪ নভেম্বর, ২০২০।
