ফরক্কাবাদ কলেজের প্রতিষ্ঠাতা পদ নিয়ে জালিয়াতি, দীর্ঘদিনের জটিলতা

স্টাফ রিপোর্টার
চাঁদপুর সদর উপজেলার বালিয়া ইউনিয়নে অবস্থিত ফরক্কাবাদ ডিগ্রি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক, আলোচনা ও সমালোচনা চলে আসছে। কলেজের সভাপতি একের পর এক আসবে, এটি নিয়ম নীতি হলেও প্রতিষ্ঠার বেশ কয়েকবছর পরে একজন এসে প্রতিষ্ঠাতা দাবি করায় বিপত্তি ঘটে। কলেজ প্রতিষ্ঠা ও উদ্বোধন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা দেশের সূর্য সন্তানদের নাম ফলকও ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে যেসব ব্যক্তিদের সমন্বয়ে কলেজটি এগিয়ে এসেছে, তাদের কোনভাবেই মূল্যায়ন করা হয় না বর্তমানে। গুরুত্বপূর্ণ অনেক অনুষ্ঠানেও দাওয়াত দেয়া হয় না অনেক ব্যক্তিকে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও কলেজটি প্রতিষ্ঠার জন্য শুরু থেকেই কাজ করেছেন সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। বিশেষ করে শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ এগিয়ে এসে কেউ টাকা, কেউ শ্রম ও বুদ্ধি পরামর্শ দিয়ে কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে জড়িত ব্যক্তি ও বর্তমানে কলেজ কমিটির সদস্য ও স্থানীয় নির্ভরযোগ্যদের সাথে আলাপ করে এসব তথ্য জানা গেছে।
বর্তমানে এ কলেজের শিক্ষার্থী সংখ্যা দেড় হাজারেরও বেশি। উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক (পাস) ও স্নাতক (সম্মান) শ্রেণির বিভিন্ন বিষয়ে পড়ার সুযোগ হয়েছে স্থানীয় ছাত্র-ছাত্রীদের। কিন্তু কলেজের মধ্যে বর্তমান যে অবস্থা বিরাজ করছে তাতে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অনেকটা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে। এর কারণ হচ্ছে কলেজকে ভালোবেসে কাজ করার লোকের সংকট দেখা দিয়েছে।
এ কলেজের প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে অন্যতম একজন মরহুম রাজ্জাকুল হায়দার খান শিমু (সাবেক চেয়ারম্যান)। তাঁর পরিবারের লোকদের শিক্ষার অবদান ওই অঞ্চলের লোকজন কখনোই ভুলবে না। কলেজটি ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠার পরে সভাপতি হিসেবে তিনিই দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠাতা কে? এ নিয়ে ওই সময়কার পরিচালনা পর্ষদ লোভ করেননি। তারা কিভাবে কলেজটি প্রতিষ্ঠা হবে, এগিয়ে যাবে তা নিয়ে ছিলেন ব্যস্ত। কিন্তু দীর্ঘ বছর পরে কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি দাবি করেন স্থানীয় বাসিন্দা, ফরক্কাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র কুমুরুয়া গ্রামের বাসিন্দা সুজিত রায় নন্দী।
তিনি কলেজের মূল ফটকে প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সুজিত রায় নন্দী লিখে রেখেছেন। তবে কলেজ কমিটির কেউ কেউ এ প্রতিবেদককে বক্তব্যে বলেছেন, সুজিত রায় নন্দীরও খুবই ইচ্ছে ছিলো প্রতিষ্ঠাতা হওয়ার এবং তৎকালীন সময়ের কমিটির লোকদের সম্মতিতে তিনি প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হয়ে যান। তবে আপত্তি হচ্ছে প্রতিষ্ঠাতা শব্দ। এই শব্দের অবসান হলে কোন বিতর্ক থাকবে না বলে কেউ কেউ মতামত দিয়েছেন।
কলেজের প্রতিষ্ঠাকালীন সাংগঠনিক কমিটির সভাপতি মরহুম রাজ্জাকুল হায়দার খান শিমু’র একমাত্র সন্তান আলী হায়দার খান বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষ ও আমার বাবা এই অঞ্চলের শিক্ষার জন্য কিভাবে কাজ করেছেন তা সবারই জানা। আমরা মুখে বলে বিশ^াসী না। আমাদের সব কাজের ডকুমেন্ট আছে। পদের প্রতি আমাদের পরিবারের কারো লোভ নেই। আমরা চাই প্রকৃত ইতিহাসটা যেন মুছে না যায়। ফরক্কাবাদ ডিগ্রি কলেজ, উচ্চ বিদ্যালয়, মাদ্রাসাসহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সুন্দরভাবে পরিচালনা হলে আমাদের সবার জন্য মঙ্গল। এসব প্রতিষ্ঠান দুর্বৃত্তদের হাতে পড়ে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হোক- তা আমাদের পরিবার কখনো চাইবে না।
তিনি আরো বলেন, ২৩ মে, ১৯৯৮ইং তারিখে কলেজ প্রতিষ্ঠা ও উদ্বোধনী নাম ফলকটিও কলেজে এখন নেই। ওই ফলকে উদ্বোধক ছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম। উপস্থিত ছিলেন পানিসম্পদ মন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক এবং স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীর বিক্রম। সেই ফলকটি ভেঙে ফেলা হয়েছে।
কলেজের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আছেন আমিনুল হক বিএসসি। তিনি বলেন, ১৯৭২ সালে মিজানুর রহমান চৌধুরী যখন তথ্য ও বেতারমন্ত্রী তখন ফরক্কাবাদ কলেজ প্রতিষ্ঠা করার জন্য ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এরপর এটি আর এগোয়নি। পরে ১৯৯৮ সালে আমরা কলেজ করার জন্য ঢাকায় সৈয়দ আহম্মেদ পাটওয়ারীর অফিসে বসে আমি, হাফিজুর রহমান ঢালী, রুহুল আমিন হাওলাদার, রহুল আমিন মিয়াজী, হারুনুর রশিদ তালুকদার, শিক্ষক বিজয় চন্দ্র দেসহ আমরা কলেজে প্রতিষ্ঠার জন্য প্রস্তাব দেই। তখন থেকে কলেজ প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু হয়।
কলেজের বর্তমান পরিচালনা কমিটির সদস্য জাহাঙ্গীর মিজি বলেন, আমি এই কলেজের কমিটির নির্বাচিত সদস্য। সুজিত রায় নন্দী কলেজের কাজে সম্পৃক্ত হলেও বিএনপি ক্ষমতায় আসলে তাকে কলেজ থেকে বের করে দেয়া হয়। দীর্ঘদিন সে কলেজে আসেনি। আমি নিজে কলেজ কমিটিতে থাকাকালীন সময়ে কলেজে জামায়াত-শিবিরের অধ্যক্ষ নিয়োগ দেয়া হবে জেনে মামলা করি তৎকালীন সভাপতি ও এমপি এসএ সুলতান টিটুর বিরুদ্ধে। এরপর ওই অধ্যক্ষ নিয়োগ হয়নি। কলেজ উন্নয়ন করার জন্য সুজিত রায় নন্দীকে আবারও কলেজে আসার সুযোগ করে দেই। কিন্তু আমরা এখন কমিটিতে থাকলেও সভাপতির কাছে সেভাবে মূল্যায়িত হচ্ছি না। খুবই দুঃখ লাগে। তবে এই কলেজের উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য আমি যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে প্রস্তুত।
প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ের তথ্য অনেক বড়। কিন্তু মূল কথা হচ্ছে কলেজটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গায়। এসব সম্পত্তি এখনো কলেজের নামে আছে কিনা তা সন্দেহ আছে। প্রতিষ্ঠাকালীন আমি নিজে, মন্টু চৌধুরী, রাজ্জাকুল হায়দার খান শিমু, হাফিজুর রহমান ঢালী, আমিনুল হক বিএসসি, শিক্ষক বিজয় চন্দ্র দে, সৈয়দ আহম্মেদ পাটওয়ারী, সিরাজুল ইসলাম তালুকদার, শাহাদাত হোসেনসহ অনেক শিক্ষিত লোকজন অর্থ, শ্রম ও মেধা দিয়ে কলেজ প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। একক কেউ প্রতিষ্ঠাতা নয়। তবে প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন রাজ্জাকুল হায়দার খান শিমু। প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ ছিলেন মন্টু চৌধুরী। সুজিত রায় নন্দী অনেক পরে এসেছেন। তিনি আমাদের ছাত্র। রাজনৈতিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য, কলেজের উন্নয়নের স্বার্থে আমরা তাকে প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে সম্মতি দিয়েছি। এর মানে এই নয়, তিনিই এই কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেছেন। একক প্রতিষ্ঠাতা কেউ নেই। সবার সমন্বয়ে এই কলেজটি প্রতিষ্ঠা হয়েছে।
সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও কলেজ প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম মুক্তিযোদ্ধা হাফিজুর রহমান ঢালী বলেন, কলেজের প্রতিষ্ঠাতা কেউ একা নয়। আমি, আমিনুল হক বিএসসি, রুহুল আমিন হাওলাদার, বিজয় চন্দ্র দেসহ ঢাকায় সৈয়দ আহম্মেদ পাটওয়ারী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কজেল প্রতিষ্ঠার কথা উত্থাপন করি এবং সবাই সম্মতি দেন। পরবর্তীতে একটি সাধারণ মিটিং করা হয়। তখন শিমু খান চেয়ারম্যান। সাধারণ মিটিংয়ের পর দীঘির উত্তর পাশে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরিত্যক্ত জায়গা ব্যবহার শুরু করে এবং শিমু খান তৎকালীন পানিসম্পদ মন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক সাহেবকে দিয়ে সম্পত্তি ব্যবহারের জন্য ব্যবস্থা করা হয়। কলেজ উন্নয়নের জন্য প্রথমে অনেকেই এগিয়ে আসলেও পরে সরে দাঁড়ায়। বাড়ি-বাড়ি গিয়ে গাছ কেটে এনে ফার্নিচার তৈরী করা হয়। লম্বা ইতিহাস।
তিনি আরো বলেন, প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে আমি নিজে অনেক ভূমিকা পালন করি এবং সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন রাজ্জাকুল হায়দার খান শিমু। সুজিত রায় নন্দী আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরে এসে সভাপতি হয়েছেন। সুজিত হলেন আত্মস্বীকৃত সভাপতি। প্রতিষ্ঠাতা নিয়ে আমাদের কারোই লোভ-লালসা ছিলো না। আমরা বাড়ি-বাড়ি হেঁটে ১৭৩ জন শিক্ষার্থী প্রথম ভর্তি করাই। কলেজের স্বীকৃতি আনার জন্য কাজ করি। কেউ যদি নিজেকে প্রতিষ্ঠাতা দাবি করে ইতিহাস সাক্ষ্য দিবে।
৪ নভেম্বর, ২০২০।