রোগী সনাক্ত ও প্রতিকারের দুর্বলতায়

ইল্শেপাড় রিপোর্ট
চাঁদপুরে ক্রমেই করোনা আতংক বাড়ছে। গত ৪/৫ দিন চাঁদপুর শহরের রাস্তা-ঘাট ও হাট-বাজারগুলোতে মানুষের আনাগোনা কমলেও গতকাল রোববার আবার তা’ বেড়ে যায়। তবে করোনা আতংক না কমে বরং বেড়েছে। অজানা রোগের অজানা আশঙ্কায় ভীত-সন্ত্রস্ত চলাফেরা ছিলো তাদের। কিন্তু এ ধরনের চলাফেরা করোনা সংক্রমন বা ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে অভিজ্ঞরা জানিয়েছেন। আশার কথা, গত দু’দিন সারা দেশের কোথাও কোন করোনা আক্রান্ত রোগী পাওয়া যায়নি। সে খবর টেলিভিশনে দেখে হয়তো মানুষজন উৎসাহিত হয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে।
এদিকে জেলা প্রশাসনসহ সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যরা বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করে জনসাধারণকে বাসায় অবস্থানের অনুরোধ করছেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা, ফাঁক পেলেই রাস্তায় নেমে যায় মানুষ।
এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বিভিন্নজন চলতি সপ্তাহে বাংলাদেশে করোনা সংক্রমনের আশংকার সতর্কতা ছড়িয়ে দেয়ায় মানুষের মধ্যে ভীতি বাড়ছে। তবে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আলহাজ ওচমান গনি পাটওয়ারীর পক্ষে গতকাল রোববারও শহরজুড়ে করোনা সতর্কতায় লোকজনকে বাসায় অবস্থানের জন্য মাইকিং করেন।
এদিকে চাঁদপুর ২৫০ শয্যার সরকারি জেনারেল হাসপাতালে গত ২৭ মার্চ করানো ভাইরাসের আইসোলেশন ওয়ার্ডে সুমন (১৬) নামের এক কিশোর ভর্তি হয়। অসুস্থ সুমন মানিকগঞ্জের দক্ষিণ চাহির এলাকার আবুল কাশেমের ছেলে। পেশায় সে একজন হকার। এমন খবর চাউর হলে জেলার সর্বত্র জনমনে অনিশ্চিত এক আতংক ঘিরে ধরে। গণমাধ্যমকর্মী ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সবাই জানতে চায় সুমনের সর্বশেষ অবস্থা কি? তবে আশার কথা গতকাল রোববার ঢাকা থেকে রোগতত্ত, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) জানিয়েছে তার করোনা নেগেটিভ। অর্থাৎ সে করোনা রোগী নয়।
তবে অসুস্থ সুমনকে হাসপাতালে ভর্তি করে এক প্রকার বিড়ম্বনায় পড়ে কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালে ভর্তিকালীন সময়ে সুমন ব্যপক জ্বর, সর্দি, কাশি এবং শ্বাসকষ্টজনিত রোগে ভুগছিলেন। সংশ্লিষ্টরা তাকে প্রাথমিকভবে করোনা সন্দহে আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি দেয়। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হাবিব উল করিম তাৎক্ষণিক সহকারী পরিচালক ডা. একেএম মাহবুবুর রহমান এবং আরএমও ডা. সুজাউদৌল্লাহ রুবেলকে দিয়ে টিম গঠন করেন।
তারা রোগতত্ত, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এ যোগাযোগ করলে ঐ দিন বিকেলের মধ্যেই অসুস্থ সুমনের নমুনা সংগ্রহ করে আইইডিসিআর টেকনোলজিস্টরা। আইসোলেশন ওয়ার্ডে সুমনের দেখাশুনার দায়িত্বে দু’জন নার্স ও ডা. আসিবুল আহসান চৌধুরী রয়েছেন।
এদিকে সুমনের করোনা সনাক্তের বিষয়টি নিশ্চিত না হলে, পুরো চাঁদপুর শহরে আস্তে আস্তে আতংক বাড়তে থাকে। হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভর্তিকৃত রোগী ও স্বজনদের মাঝে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আর ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। বিপরীত দিকে হাসপাতালের ডাক্তারদের পিপিই (ঢ়বৎংড়হধষ ঢ়ৎড়ঃবপঃরড়হ বয়ঁরঢ়সবহঃ), পুরো শরীর আবৃত করার ড্রেস, সার্জিক্যাল মাস্ক, চোখের আইশিল্ড ও হ্যান্ড গ্লাভস না থাকায় ডাক্তার ও নার্সদের নিরাপত্তাও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে বলে জানা গেছে।
অপরদিকে সারাদেশে কমবেশি প্রতিদিনই কমবেশি করোনা রোগী সনাক্ত হচ্ছে বলে জানাচ্ছে আইইডিসিআর। আশার কথা গত দু’দিন সারা দেশের কোথাও কোন করোনা আক্রান্ত রোগী পাওয়া যায়নি। ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় অর্ধশত রোগী সনাক্ত ও ৫ ব্যক্তির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে দেশবাসীকে। তবে এই আইইডিসিআর-এর ভূমিকা নিয়ে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভিযোগ তুলছেন।
কেউ কেউ বলছেন, করোনা বিষয়ক সরকারের মুখপাত্র আইইডিসিআর’র ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা প্রতিদিন নতুন নতুন তথ্য ও হরেক রকমের পরামর্শ দেন। কিন্তু যারা মারা যান তাদের সম্পর্কে তিনি আপত্তিকর ও অসম্মানজনক শব্দ ব্যবহার করার অভিযোগ তুলছেন অনেকেই।
তিনি মৃত ব্যক্তিদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, ‘যিনি মারা গেছেন তিনি বয়স্ক। ৬০ এর উপর বয়স।’ তার এমন উক্তি নিয়েই মূলত নানা প্রশ্ন। কেউ কেউ বলতে চাচ্ছেন, ডা. মীরজাদী’র এমন কথার অর্থ ৬০ এর উপরে মারা গেলে অসুবিধা নেই? এমনকি বিনা চিকিৎসায় মারা গেলেও আপত্তি করার কিছু নেই?
এজন্য ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা’র কাছে অনেকেই জানতে চান, দেশে ৬০ এর উপরে মানুষের সংখ্যা কত? বর্তমানে যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন তাদের সবার বয়স ৬০ এর উর্ধ্বে না নিচে? এজন্য বর্তমানে দেশে প্রকৃত করোনা পরিস্থিতি কি তা নিয়ে সবাই উদ্বেগে আছে।
কেউ কেই বলছেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে অনেকেই করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা যাচ্ছেন। আইইডিসিআর’র স্বীকৃতি ছাড়াই। করোনার উপসর্গের স্বজনদের অনেকের অভিযোগ হটলাইনে যোগাযোগ করলে ভুল তথ্যও দেয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি কোন পরীক্ষা ছাড়াই বলেদেন, যা শুনলাম তাতে মনে হয়, আপনার করোনা হয়নি। প্রতিদিন এ ধরনের অসংখ্য অভিযোগ উঠছে।
এজন্য দেশবাশী অভিযোগ করছেন, দুনিয়ার শক্তিমান প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রীরা প্রায় প্রতিদিনই তাদের জাতিকে করোনার খবরা-খবর জানাচ্ছেন এবং সাহস দিচ্ছেন। আর আমাদের সরকার একজন যুগ্ম-সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা’র ওপর এই দায়িত্ব প্রদান করায় করোনা প্রকৃত চিত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
এজন্য করোনা ভাইরাসের হাত থেকে রক্ষা ও পরিস্থিতি উন্নয়নে সরকারের দায়িত্বশীল মহলের তদারকি বেশি প্রয়োজন বলে নাগরিক সমাজ থেকে দাবি উঠছে। অন্যথায় ইরান, ইতালি কিংবা স্পেনের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে, তা যে মানবিক বিপর্যয় হিসেবে দেখা দিবে এতে কোন সন্দেহ নেই- বলে দাবি নাগরিক সমাজের।
তবে গত বছর থেকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া এই করোনা ভাইরাসের কারণে পুরো বিশ্বে যে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে, তা নিয়ে সামগ্রিক শিক্ষণীয় বিষয় আছে বলে অভিমত দিয়েছেন গবেষক ও চিন্তাবিদরা। তারা বলছেন, এই মাহাবিশ্ব তো ক্ষুদ্র মানুষের কল্পনার বাইরে। আমরা যে পৃথিবীটায় বাস করি তার অনেক কিছুই কতো বিশাল, বিপুল। পাহাড়, পর্বত কতো উচ্চতা ধরে! সাগর, মহাসাগরের কী ব্যপ্তি! সাগরে ওঠে উত্তাল তরঙ্গ, স্থলভাগে আসে প্রমত্তা ঝঞ্ঝা, অগ্নিগিরি করে লাভা উদগীরণ, ভূমিকম্প লন্ডভন্ড করে দেয় জনপদ। মাঝে মাঝে কী ভয়ঙ্কর আতঙ্ক ও বিপদই না ডেকে আনে এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও দুর্বিপাক। মানুষের জন্য বিধ্বংসী এই তান্ডবগুলো ভয়াল ও বিপুল হয়েই আসে।
আবার ঠিক এর উল্টো পিঠে ইতিহাস জানান দেয়, স্রষ্টাদ্রোহী নমরুদ নামের পরাক্রান্ত ও চরম উদ্ধত এক নৃপতির নাসারন্ধ্রে অতি ক্ষুদ্র এক মশক ঢুকে তার ভবলীলা সাঙ্গ করে দেয়। ঈশ্বরের ক্ষমতার দাবিদার মিসরের ফারাওদের রাজ্যপাট ও ক্ষমতা ছত্রখান হয়ে যায় চোখে দেখা যায় না এমন ক্ষুদ্র জীবাণুবাহিত প্লেগ মহামারীতে।
বিশালদেহী হস্তির বহর নিয়ে কাবা ঘর ধ্বংস করতে আসা আব্রাহা বাহিনীকে চর্বিত তৃণের মতন ধূলিস্যাৎ করে দেয় অতিক্ষুদ্র আবাবিল পাখির ঝাঁক অৎস্র কংকর নিক্ষেপে। আর আজ জগতের ক্ষমতাশালী আধুনিক রাষ্ট্রীয় সাম্রাজ্যগুলো অণুবীক্ষণযন্ত্রে দেখতে হয় এমন ক্ষুদ্র করোনা ভাইরাস। তার সংক্রমনের ভয়ে তটস্থ সবাই। সারা দুনিয়াজুড়ে প্রায় সবকিছুই উলোটপালোট হয়ে যাচ্ছে, সব অঙ্গনেই তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে।
কখনো বিশাল ও ভয়ঙ্করের প্রলয় এনে এবং আবার কখনো অতি ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ কিছু দিয়ে বলদর্পী মানুষের ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে প্রকৃতি কিংবা প্রকৃতির স্রষ্টা ও নিয়ন্তা। বিশ্বাসী ও আস্তিক মানুষেরা দাবি করেন, এটা প্রকৃতির স্রষ্টার এ এক নিদারুণ রসিকতা কিংবা পরীক্ষা। তিনি হাতে-কলমে মানুষকে দেখিয়ে দেন বিশাল ও ভয়ঙ্করের কাছে তো বটেই, অতি ক্ষুদ্র ও তুচ্ছের কাছে মানুষ কতোটা অসহায় হতে পারে?
