চাঁদপুরে কয়েক কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি বেহাত হওয়ার পথে

জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা

এস এম সোহেল
দায়িত্বশীল ব্যক্তির দায়িত্বহীনতায় বা রহস্যময় ভূমিকার কারণে চাঁদপুর সদর উপজেলার আশকাটি ইউনিয়নে ২.১৯ একর ভিপি সম্পত্তি বেহাত হওয়ার পথে। আর শতাধিক পরিবারের বসতবাড়ি হারাতে পারে এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, সদর উপজেলার আশিকাটি ইউনিয়নের ৩৫নং আশিকাটি মৌজার অন্তর্গত সিএস ২৯২, এসএ ২৪৬নং খতিয়ান, দাগ নং-৭০৭, ৭০৮, ৭১৫, ৭০৯, ৭১২, ৭১৩, ৭৫১, ৭৫২, ৭৫৩ মোট ২.১৯ একর ভূমি সরকারি ভিপি সম্পত্তি হওয়ায় সরকারের লিজের শর্ত অনুযায়ী লিজ নিয়ে দীর্ঘ ৬০ বছর যাবত বসতবাড়ি ও কৃষি চাষ করে বসবাস করে আসছেন শতাধিক পরিবার। এসব লিজ গ্রহীতারা প্রতি বছর সরকারকে রাজস্ব পরিশোধ করে তাদের লিজ নবায়ন করে আসছেন।
এদিকে বর্তমান সরকার অর্পিত আইন পাস করায় সরকারের এ সম্পত্তিগুলো ‘ক’ তফসিলে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর পরই তৎকালীন জেলা প্রশাসক এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে যেনো সরকারের সম্পত্তি বেহাত না হয়। এজন্য জেলা ও দায়রা জজ আদালতে সরকারের নিয়োগকৃত জিপিকে সরকারি সম্পত্তিগুলোর কাগজ-পত্র বুঝিয়ে দেন। শুধু তাই নয়, ভূমিদস্যুদের দ্বারা যেনো সম্পত্তি বেহাত না হয় সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান, কিন্তু কে শুনে কার কথা?
এদিকে আশিকাটি ইউনিয়নের উল্লেখিত সম্পত্তিতে পূর্ব থেকেই স্থানীয় একটি ভূমিদস্যু গ্রুপের নজর ছিলো। ফলে স্বাধীনতার পর থেকেই এই তারা ছিলেন মরিয়া। এমনকি সম্পত্তি দখলের জন্য হেমেন্দ্র নাথ কর নামে এক ব্যক্তি ১৯৭৩ সালে কুমিল্লা সাবজজ আদালতে সরকারকে বিবাদী করে মামলা করেন। যার নং-১১৯/৭৩। ১৯৭৫ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের ১০, ১১ ও ১৩ তারিখে দোতরফা শুনানি শেষে ঐ মামলা আদালত সরকারের পক্ষে রায় বা ডিক্রি দেন এবং মামলার বাদীর কাছ থেকে নগদ ১২০১ টাকা জরিমানা আদায়ের নির্দেশ দেন। মামলায় পরাজিত হয়ে বাদী হেমেন্দ্র নাথ কর রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আর কোনো আপিল না করায় আদালতের রায় বহাল থাকে। কিন্তু হেমেন্দ্র নাথ কর সম্পত্তি থেকে চোখ ফিরিয়ে নেননি। তিনি ১৯৭৫ সালের রায় গোপন করে চাঁদপুর সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে দেওয়ানী স্বত্ব মোকদ্দমা দায়ের করেন। যার নং-১০৭/৯৬। ফলে আগের রায় আদালতে সরকারের পক্ষের নিযুক্ত কৌশলী উপস্থাপন করায় দোতরফা শুনানি শেষে মামলাটি খারিজ হয়ে যায়।
তারপরও হেমেন্দ্র নাথ কর থেমে থাকেনি। পুনরায় ২০০৮ সালে বাদী হয়ে চাঁদপুর সিনিয়র জজ আদালতে সরকারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। যার নং-২০/২০০৮। এটিতেও আদালত সরকারের পক্ষে ডিক্রি বা রায় দেয়।
পর-পর তিনটি মামলায় হেরে গিয়ে একই ব্যক্তি আবারো জেলা ও দায়রা জজ আদালতে অর্পিত ট্রাইব্যুনালে বাদী হয়ে ৬টি মামলা করেন। যার নং-১৩/২০১২, ১৪/২০১২, ১৫/২০১২, ১৬/২০১২ ও ১৩৯/২০১২। আর মামলা গুলো পরিচালনার জন্য আম মোক্তারনামা দেন তার ছেলে রামুকরকে।
অর্পিত ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা মামলাগুলোর মধ্যে ১২/২০১২ইং মামলাটির শুনানির জন্য ২০১৩ সালের ১২ মে দিন ধার্য করে আদালত। ঐ দিন সরকারের নিযুক্ত কৌশলী বা জিপির রহস্যজনক ভূমিকার কারণে আদালত ১২/২০১২ নং মামলাটির রায় সরকারের বিপক্ষে যায়।
রায়ের খবর শুনে তৎকালীন জেলা প্রশাসক ও চাঁদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেলা ও দায়রা জজ আদালতে সরকারী কৌশলী জিপি অ্যাড. রুহুল আমিনকে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার জন্য নোটিশ দেন। কিন্তু ঐ সময়ের কিছুদিন আগে সরকার কর্তৃক বিশেষ আপীল ট্রাইব্যুনাল আদালত বাতিল করায় আপিল করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে জেলা প্রশাসকের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ও পরামর্শ নিয়ে ঐ সম্পত্তির লিজ গ্রহীতা শতাধিক পরিবার নিরুপায় হয়ে আইনজীবী নিয়োগ করে হাইকোর্টে রায়ের বিরুদ্ধে রীট করলে হাইকোর্ট জেলা ও দায়রা জজ আদালতের রায়টি দেড় বছরের জন্য স্থগিত করে। যার নং-১০০৭৩/১৩।
কিন্তু হেমেন্দ্র নাথ করের পরিবারের সদস্য রামুকররা সরকারের সম্পত্তি দখল করতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। ফলে সরকারকে রাজস্ব দিয়ে দীর্ঘ ৬০ বছর ধরে বসবাসকারী শতাধিক পরিবার আতংকের মধ্য দিয়ে দিন যাপন করছেন।
অপরদিকে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির রহস্যময়ের কারণে প্রতি বছর বছর রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হবে সরকার এবং বেহাত হবে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

২০ জুন, ২০২১।