এস এম সোহেল
অত্যন্ত জাকজমকভাবে পালিত হলো মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা অর্জনে নেতৃত্ব দানকারী দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগ ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করে। শুক্রবার (২৩ জুন) সাড়ে ৭টায় চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্যদিয়ে কর্মসূচির সূচনা করেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নাছির উদ্দিন আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু নঈম পাটওয়ারী দুলাল। এরপর সকাল ৮টায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে মাল্যদান করা হয়।
বিকেল ৩টায় চাঁদপুর হাসান আলী হাইস্কুল মাঠে জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলেন, পায়ড়া অবমুক্ত ও বেলুন উত্তোলন করা হয়। পরে বিশাল জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। জনসভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নাছির উদ্দিন আহমেদ।
তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ে সংগ্রাম শুরু করে আওয়ামী লীগ। ৭৪ বছর পরেও বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের গণমানুষের শান্তি-সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের জন্মই হয়েছে এদেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। এদেশের সব আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ এদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বকারী দল। বাংলাদেশ আজ ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ। পদ্মা সেতু হয়েছে নিজস্ব অর্থায়নে। এটি আমাদের গর্বের। সব দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ভুলে সবাইকে আওয়ামী লীগের ছায়াতলে আসতে হবে। মনে রাখবেন জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাদের নেত্রীর বাইরে আমাদের কোন নেতা নেই। সামনে জাতীয় নির্বাচন, এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি যদি কোন নাশকতা করার চেষ্টা করে তাহলে আমরা তার সময়োচিত জবাব দিব।
তিনি আরো বলেন, এখনো স্বাধীনতা বিরোধী জামায়াত-শিবির রাজাকার ও তাদের সহযোগীরা নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। তাদের সব ধরনের ষড়যন্ত্র আমাদের প্রতিহত করতে হবে। কারণ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু’র স্বপ্ন ছিল একটি সুখী ও সমৃদ্ধশালী দেশ গড়া। তার সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করছেন এবং দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে উন্নত দেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ শুধু এ দেশের প্রাচীন ও সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক সংগঠনই নয়, বাংলাদেশের রাজনীতির মূলধারাও। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ইতিহাস একসূত্রে গাঁথা। ১৯৪৮ সালে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সূচিত ভাষা আন্দোলন ১৯৫২ সালে গণজাগরণে পরিণত হয়। অব্যাহত রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার তরুণ সংগ্রামী নেতা শেখ মুজিবুর রহমান সেই সময়ে কারান্তরালে থেকেও ভাষা আন্দোলনে প্রেরণাদাতার গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেন।
প্রধান বক্তার বক্তব্যে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ আবু নঈম পাটওয়ারী দুলাল বলেন, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের কেউ কোন ক্ষতি করতে পারেনি। আওয়ামী লীগ দুই প্রকারের। কেউ আছেন জাতির পিতার আদর্শ বাস্তবায়নে, আবার কেউ আছে নিজেদের স্বার্থ হাসিলে। এই নীতি পরিহার করতে হবে। মনে রাখবেন আওয়ামী লীগের একটি নীতি ও আদর্শ রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিকরা এক ও ঐক্যবদ্ধ। আমরা শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়বো। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিকদের ঐক্যের বিকল্প নেই।
তিনি আরো বলেন, আজ থেকে আমি লীগ করবো না আওয়ামী লীগ করবো- এটাই হোক আমাদের শপথ। তার কথার সাথে সাথে উপস্থিত নেতা-কর্মীরা হাত তুলে একততা পোষণ করে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দিয়ে পুরো হাসান আলী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠটি মুখরিত করে তোলেন।
চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. জহিরুল ইসলামের পরিচালনায় বক্তব্য রাখেন জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ইঞ্জি. আব্দুর রব ভূঁইয়া, মুক্তিযোদ্ধা আবুল খায়ের পাটওয়ারী, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আহসান উল্যাহ আখন্দ, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. শাহীর হোসেন পাটওয়ারী, সদস্য মুক্তিযোদ্ধা মো. মুনির আহমেদ, শাহরাস্তি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. কামরুজ্জামান মিন্টু, হাজীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গাজী মাইনুদ্দিন, জেলা মৎস্যজীবী লীগের সভাপতি আব্দুর মালেক দেওয়ান, জেলা শ্রমিক লীগের সভাপতি মো. মাহবুবুর রহমান, জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক আলহাজ মিজানুর রহমান ভূঁইয়া কালু, যুগ্ম-আহ্বায়ক সালাহউদ্দিন মোহাম্মদ বাবর প্রমুখ।
সভার শুরুতে পবিত্র কোরআন থেকে তেলোয়াত করেন জেলা ওলামা লীগ নেতা মোস্তাফিজুর রহমান চিশতী এবং পবিত্র গীতা থেকে পাঠ করেন জেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক অ্যাড. বিণয় ভূষণ মজুমদার।
এসময় আরো উপস্থিত ছিলেন চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আলহাজ আব্দুর রশিদ সর্দার, সন্তোষ দাস, মঞ্জুর আহমেদ মঞ্জু, শ্রম বিষয়ক সম্পাদক নূরুল ইসলাম মিয়াজী, দপ্তর সম্পাদক শাহআলম মিয়া, স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক ডা. হারুনর রশীদ সাগর, শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক বিল্লার হোসেন, সাবেক শ্রম বিয়য়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া, সদস্য অ্যাড. বদিউজ্জামাল কিরণ, আলহাজ বেলায়েত হোসেন গাজী বিল্লার, শরীফ হোসেন পাটওয়ারী, মতলব দক্ষিণ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বিএইচএম কবির আহমেদ, ফরিদগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু সাহেব সরকার, পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান ঢালী, সাবেক আইন বিষয়ক সম্পাদক অ্যাড. দেবাশীষ কর মধু, শ্রম বিষয়ক সম্পাদক মঞ্জুর আলম, কৃষি ও সমবায় বিষয়ক সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়া, সদর উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি মো. নাজমুল পাটওয়ারী, মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী রেনু বেগম, পান্না বেগম, চাঁদপুর সদর উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক মো. সফিক গাজী, সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়ক শেখ শরীফ আহমেদ, পৌর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মো. খোরশেদ হাওলাদার, সাধারণ সম্পাদক রুবেল হাওলাদার ছিডু, সাংগঠনিক সম্পাদক রেহমান বাদল, জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি মো. সুমন মজুমদারসহ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, মহিলা আওয়ামী, স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা-কর্মীরা।
জনসমাবেশ শেষে হাসান আলী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ থেকে বর্ণাঢ্য র্যালি বের হয়। র্যালি শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে গিয়ে শেষ হয়। এরপর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কেক কাটার মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী কর্মসূচি শেষ হয়।
এছাড়া বাদ আছর বিভিন্ন মসজিদে বিশেষ দোয়া, মন্দির ও বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দোয়া ও প্রার্থনা শেষে তাবারক বিতরণ করা হয়।
উল্লেখ্য, মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা অর্জনে নেতৃত্বদানকারী দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ শুক্রবার। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পুরনো ঢাকার ঐতিহ্যবাহী রোজ গার্ডেনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এই রাজনৈতিক দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার সময় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কারাগারে আটক ছিলেন। তাঁকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করা হয়।
অন্যদিকে কেন্দ্রিয়ভাবে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ করা হলেও পরবর্তী সময়ে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক আদর্শের অধিকতর প্রতিফলন ঘটানোর জন্য এর নাম ‘আওয়ামী লীগ’ করা হয়। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বিজয়ের পর ১৯৫৫ সালে অনুষ্ঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিলে দলের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেয়া হয়। আর পূর্ব পাকিস্তান শব্দ দু’টি বাদ পড়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় থেকে। বাংলাদেশে স্বাধীনতা ঘোষণা করার পর থেকে প্রবাসী সরকারের সব কাগজপত্রে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নাম ব্যবহার শুরু হয়। ১৯৭০ সাল থেকে এদলের নির্বাচনী প্রতীক নৌকা। পরবর্তী সময়ে দেশের অন্যতম প্রাচীন এ সংগঠনটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধসহ প্রতিটি গণতান্ত্রিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে এদেশের গণমানুষের সংগঠনে পরিণত হয়।
২৪ জুন, ২০২৩।
