করোনা সংক্রমণ বাড়ছে, মৃত্যু ১শ’ ছাড়িয়েছে
ইলশেপাড় রিপোর্ট
চাঁদপুরে করোনা সংক্রমণ লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েই চলছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি বলে মনে করছেন সর্বসাধারণ। এদিকে এ পর্যন্ত চাঁদপুরে শতাধিক ব্যক্তির মৃত্যুর রেকর্ড করা হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে গতকাল পর্যন্ত ৩ হাজার ৫শ’ ৬১জন। অপরদিকে সারা দেশে ৬ লাখ ৮৪ হাজার ৭শ’ ৫৬ জন। আর গত একদিনে সারাদেশে আক্রান্ত হয়েছে ৫ হাজার ৮শ’ ১৯ জন।
এদিকে চাঁদপুরে করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধির কারণ হিসেবে জানা গেছে, এ জেলার উপর দিয়ে নৌপথে ঢাকা-মুন্সীগঞ্জ ছাড়াও নারায়ণগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও ফরিদপুরের যাত্রীদের যাতায়াত অব্যাহত থাকা। এছাড়া পার্শ¦বর্তী কুমিল্লা জেলার সাথে যোগাযোগ অব্যাহত থাকায় রোগীর সংক্রমণ বেড়েই চলছে। পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলের লোকজন চাঁদপুর রুটেই তাদের যোগাযোগ চলমান রাখায় পরিস্থিতি ক্রমশই অবনতি হচ্ছে। এজন্য এখনি কঠোর লকডাউনের দেয়া জরুরি হয়ে পড়ছে।
করোনা সংক্রমণ রোধে দ্বিতীয় পর্যায়ে গতকাল পর্যন্ত দ্বিতীয় ডোজের টিকা গ্রহণ করেছেন ৪ হাজার ৭শ’ ৮৭ জন। এ পর্যন্ত করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ টিকা গ্রহণের জন্য রেজিস্ট্রেশন করেছেন ৭৪ হাজার ২শ’ ৪৯ জন। ইতোপূর্বে প্রথম ডোজ টিকা গ্রহণ করেছেন ৫৮ হাজার ৪শ’ ৭ জন। আর দ্বিতীয় ডোজ হিসেবে ৩৯ হাজার টিকা চাঁদপুর সিভিল সার্জন কার্যালয়ে সংরক্ষিত আছে।
এদিকে সরকারের এক সপ্তাহের লকডাউন শেষে আরো দুই দিন নিষেধাজ্ঞাসহ ১১ দফা নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সরকার চলমান নিষেধাজ্ঞা ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়িয়েছে। গতকাল রোববার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। পাশাপাশি আগামি ১৪ এপ্রিল থেকে ‘সর্বাত্মক লকডাউনে’ এক সপ্তাহের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করতে পারে সরকার। এ বিষয়ে প্রস্তুতি নিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
রোববার (১১ এপ্রিল) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রথমে সাধারণ ছুটির ঘোষণা থাকবে। যা প্রথম পর্যায়ে এক সপ্তাহের জন্য। পরিস্থিতি বিবেচনায় পরে এটি আরও এক সপ্তাহ বাড়ানোরও চিন্তা-ভাবনা আছে সরকারের। আর সাধারণ ছুটির মধ্যে গণপরিবহন বন্ধ রাখাসহ অন্যান্য কী কী বিধি-নিষেধ থাকবে, তা নিয়ে এখন কাজ চলছে। পরিপত্রে এসব বিষয় স্পষ্ট করা হবে।
চাঁদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. শাখাওয়াত উল্লাহ গণমাধ্যমকে জানান, চাঁদপুর জেলায় করোনায় আক্রান্ত ৩ হাজার ৫শ’ ৬১ জনের মধ্যে উপজেলাভিত্তিক চাঁদপুর সদরে ১ হাজার ৬শ’ ৩৯ জন, ফরিদগঞ্জে ৩শ’ ৭৬ জন, মতলব দক্ষিণে ৩শ’ ৪৫ জন, হাজীগঞ্জে ৩শ’ ২৬ জন, শাহরাস্তিতে ৩শ’ ১ জন, মতলব উত্তরে ২শ’ ৫৫জন, হাইমচরে ১শ’ ৯৫ জন ও কচুয়া উপজেলায় ১শ’ ২৪ জন। চাঁদপুরে দুইদিনে ৬২ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে।
এদিকে সারাদেশে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় ৫ এপ্রিল থেকে এক সপ্তাহের জন্য বিধিনিষেধ আরোপকৃত সরকারের নির্দেশনা আরো দুই দিন বৃদ্ধির পাশাপাশি আরো ১১ দফার নির্দেশনা দিয়ে এক প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। প্রজ্ঞাপনে ১১টি নির্দেশনাগুলো হলো:
(ক) সকল প্রকার গণপরিবহণ (সড়ক, নৌ, রেল ও অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট) বন্ধ থাকবে। তবে, পণ্য পরিবহণ, উৎপাদন ব্যবস্থা, জরুরি সেবাদানের ক্ষেত্রে এই আদেশ প্রযোজ্য হবে না। এছাড়া বিদেশগামী/বিদেশ প্রত্যাগত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে না।
(খ) আইন-শৃঙ্খলা এবং জরুরি পরিষেবা, যেমন-ত্রাণ বিতরণ, স্বাস্থ্যসেবা, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, জ্বালানি, ফায়ার সার্ভিস, বন্দরসমূহের (স্থলবন্দর, নদীবন্দর ও সমুদ্রবন্দর) কার্যক্রম, টেলিফোন ও ইন্টারনেট, ডাক সেবাসহ অন্যান্য জরুরি ও অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ও সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অফিসসমূহ, তাদের কর্মচারী ও যানবাহন এ নিষেধাজ্ঞার আওতা বহির্ভূত থাকবে।
(গ) সকল সরকারি/আধাসরকারি/স্বায়ত্তশাসিত অফিস ও আদালত এবং বেসরকারি অফিস কেবল জরুরি কাজ সম্পাদনের জন্য সীমিত পরিসরে প্রয়াজনীয় জনবলকে স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পরিবহণ ব্যবস্থাপনায় অফিসে আনা-নেওয়া করতে পারবে। শিল্প-কারখানা ও নির্মাণ কার্যাদি চালু থাকবে। শিল্প-কারখানার শ্রমিকদের স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নিজস্ব পরিবহণ ব্যবস্থাপনায় আনা-নেওয়া করতে হবে। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ কর্তৃক শিল্প-কারখানা এলাকায় নিকটবর্তী সুবিধাজনক স্থানে তাদের শ্রমিকদের জন্য ফিল্ড হাসপাতাল/চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।
(ঘ) সন্ধ্যা ৬টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত অতি জরুরি প্রয়োজন ব্যতীত (ঔষধ ও নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয়, চিকিৎসা সেবা, মৃতদেহ দাফন/সৎকার ইত্যাদি) কোনোভাবেই বড়ির বাইরে বের হওয়া যাবে না।
(ঙ) খাবারের দোকান ও হোটেল-রেস্তোরাঁয় কেবল খাদ্য বিক্রয়/সরবরাহ (টেকঅ্যাওয়ে/অনলাইন) করা যাবে। কোনো অবস্থাতেই হোটেল-রেস্তোরাঁয় বসে খাবার গ্রহণ করা যাবে না;
চ) শপিং মলসহ অন্যান্য দোকানসমূহ বন্ধ থাকবে। তবে দোকানসমূহ পাইকারি ও খুচরা পণ্য অনলাইনের মাধ্যমে ক্রয়-বিক্রয় করতে পারবে। সেক্ষেত্রে অবশ্যই সর্বাবস্থায় কর্মচারীদের মধ্যে আবশ্যিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে এবং কোনো ক্রেতা স্বশরীরে যেতে পারবে না;
(ছ) কাঁচাবাজার এবং নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত উন্মুক্ত স্থানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্রয়-বিক্রয় করা যাবে। বাজার কর্তৃপক্ষ/স্থানীয় প্রশাসন বিষয়টি নিশ্চিত করবে;
(জ) ব্যাংকিং ব্যবস্থা সীমিত পরিসরে চালু রাখার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করবে।
(ঝ) সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ ঢাকায় সুবিধাজনক স্থানে ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগ্রহণ করবে।
(ঞ) সারাদেশে জেলা ও মাঠ প্রশাসন উল্লিখিত নির্দেশনা বাস্তাবায়নের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত টহল জোরদার করবে।
(ট) এই আদেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
প্রজ্ঞাপনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের আওতাধীন নির্দেশনাগুলোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করা হয়। এ প্রজ্ঞাপন জারির পর গণপরিবহন চলাচল ও শপিংমল বন্ধের নির্দেশনা শিথিল করা হয়।
১২ এপ্রিল, ২০২১।
