এস. এম. চিশতী
‘ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর’ আজ বাংলাদেশ ছাড়িয়ে বিশ^বাজারে একটি প্রসিদ্ধ জেলা হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে। এ অঞ্চলের মানুষ গর্ব করে বলতে পারেন, ইলিশের বাড়ি চাঁদপুরে আমার জন্ম। এই ঐতিহ্য এবং গৌরবের মাঝে নদী ভাঙন, নদীর গতিপথ পরিবর্তন, অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য এবং আর্সেনিক দূষণ ইত্যাদি কারণে গর্বিত চাঁদপুর জেলায় দিনদিন নিরাপদ পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করছে বলে মনে করেন- এই অঞ্চলের সচেতন মহল।
চাঁদপুর জেলার সবক’টি স্বাস্থ্য ক্লিনিক থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, এ জেলার জনগণের মধ্যে প্রধানত পানিবাহিত যেসব রোগ সবচেয়ে বেশি তা হচ্ছে, সর্দি-জ্বর, ডায়রিয়া, আমাশয়, হুপিং কাশি, ম্যালেরিয়া, নিউমোনিয়া ও পেপটিক আলসার। নাম প্রকাশ না করা শর্তে ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ক্লিনিকের এক কর্মকর্তা বলেন, শুধু নিরাপদ খাবার পানির তীব্র সংকটের কারণেই এ জেলায় প্রতি বছর অনেক মানুষ ডায়রিয়ায় ভোগে।
তিনি আরো বলেন, আমার দেখা এক ভয়ংকর স্মৃতি থেকে বলছি, ২০০৪ সালে ফরিদগঞ্জ উপজেলার সুবিদপুর ইউনিয়নের বাঁশারা, সোনাচৌ ও তেলিসাইর গ্রামে পানিবাহিত রোগ ডায়রিয়া এক ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিলো। সে সময়ে ঐ এলাকার গ্রামবাসীরা আতংকিত হয়ে সতর্ক সংকেত হিসাবে বাড়ি-বাড়ি লাল কাপড় উড়িয়ে দিয়ে একে অপরকে সাবধান করেছিলো। মতলব কলেরা হাসপাতালে চিকিৎসার বাইরেও ঐসব এলাকার লোকজন বাড়িতে হুজুর ডেকে এনে ঝাঁড়-ফুঁক এবং মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করে ভুক্তভোগীরা মুক্তির পথ খুঁজছিলো।
চাঁদপুর সদর হাসপাতালের এক কর্মকর্তা বলেন, এ জেলায় অবশ্যই নিরাপদ পানির তীব্রসংকট রয়েছে। নিরাপদ পানির জন্য জেলার মোট জনসংখ্যার ৮৭% কল অথবা নলকূপের পানি ব্যবহার করে থাকে, আর বাকি ১৩% মানুষ বিভিন্ন উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করে চাহিদা পূরণ করছে। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য এ জেলার ৫২% নলকূপেই আর্সেনিকের দূষণ পরীক্ষা করা হয়নি এবং মোট জনসংখ্যার ৭৭% মানুষ আর্সেনিক ভয়াবহতার কথা শুনেছেন, তবে এ বিষয়ে উদাসীন।
এমনিতেই নিম্নাঞ্চলের কারণে এই জেলার পরিবেশ অনেকটা আদ্র মনে হয়। তার সাথে প্রতিনিয়ত যুক্ত হচ্ছে মানুষের অজ্ঞতা এবং অসচেতনতা আর সে কারণে, জেলার সবকয়টি উপজেলায় একই চিত্র দেখা যায়। সাধাারণ মানুষ সচেতন নয়, যার ফলে তারা যেখানে-সেখানে বর্জ্য ফেলছেন, এতে করে পরিবেশ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকি দিনদিন বেড়ে চলছে।
একদিকে জনবহুল এলাকা ও রাস্তার পাশে থাকা এসব বর্জ্য থেকে সৃষ্ট দুর্গন্ধ এবং দূষিত হাওয়া যেমন পথচারীসহ শহরে অবস্থানকারী মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে, অপরদিকে বিভিন্ন শিল্প কল-কারখানার বর্জ্য পদার্থ, কৃষি জমিতে অনিয়ন্ত্রিত সার ও কীটনাশকের ব্যবহার জেলার সামগ্রিক পরিবেশ দূষণে প্রভাব ফেলছে। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে এ জেলায় নদী ভাঙন, নদীর গতিপথ পরিবর্তন, আর্সেনিক দূষণ এবং শহর রক্ষাবাঁধ ইত্যাদি কারণে জেলার নিরাপদ পানির সংকট দিনদিন তীব্র থেকে তীব্রতর আকার ধারণ করছে।
এমনিতেই ঘনবসতি জেলা হিসাবে ইতোমধ্যে এ জেলা পরিচিতি লাভ করছে। এ জেলায় ২৭ লাখের বেশি মানুষ বসবাস করছে। যার মধ্যে ১৩.৩০ লাখ পুরুষ এবং ১৩.৭০ লাখ নারী রয়েছে। মোট জনসংখ্যার ৮৬% মানুষ গ্রামে বসবাস করে, আর প্রতি বর্গ কিলোমিটার জায়গায় ১,৪১৫ জন মানুষ অবস্থান করছে বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
সরেজমিনে, আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র মতলব আইসিডিডিআরবি’র (কলেরা হাসপাতাল) এক কর্মকর্তা বলেন, একমাত্র নিরাপদ পানির তীব্র সংকটের ফলেই এ জেলায় পানিবাহিত রোগ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গত ১১ মাসে প্রায় ২৭ হাজার ডায়রিয়া রোগী ভর্তি হয়ে এখান থেকে চিকিৎসা সেবা নিয়েছে। এখোনো প্রতিদিনই ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা সেবা নিচ্ছে। এক কথায় বলা যায় নিরাপদ পানির অভাবে ১২ মাসেই ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগী কম-বেশি ভর্তি হয়ে থাকে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০ জন ডায়রিয়া আক্রান্তরোগী এ হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নিয়ে থাকে।
তিনি আরো বলেন, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণে ডায়রিয়া রোগের সৃষ্টি হয়ে থাকে। এর মধ্যে প্রধান কারণ নিরাপদ পানির অভাব অর্থাৎ দূষিত পানির কারণেই ডায়রিয়াসহ নানা পানিবাহিত রোগে অধিকাংশ মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে।
এছাড়া হাসপাতাল সূত্রে আরও জানা যায়, ১৫০ জন রোগীকে চিকিৎসা সেবা প্রদানের ধারণক্ষমতা থাকলেও মাঝে মাঝে হাসপাতালে আসা রোগীদের প্রচণ্ড চাপে চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত ৫ জন ডাক্তার ৬ জন নার্স ও ১৮ জন এটেনডেন্স্ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়।
প্রচলিত একটি প্রবাদ বাক্য আছে ‘পানির অপর নাম জীবন’। তাই মানুষের জীবন বাঁচাতে এবং ব্র্যান্ডিং জেলা চাঁদপুরের ঐতিহ্য রক্ষায় সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষ এ জেলার সবক’টি উপজেলায় পানির দূষণ কমিয়ে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করতে উদ্যোগ গ্রহণ করবেন- এমনটাই প্রত্যাশা করেন সচেতেন মহল।
২৯ ডিসেম্বর, ২০২০।
