চাঁদপুরে ব্যাংক গ্রাহকরা আতংকে!

আর্থিক সংকট ও সামাজিক যোগাযোগ সাইটের তথ্য বিভ্রাটে

ইলশেপাড় রিপোর্ট
দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে এখন নিত্যপণ্যসহ প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী। এমন পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমের খবরে আসছে দেশের অন্তত ২০টি ব্যাংকের কাছে ঋণপত্র (এলসি) দায় মেটানোর মতো কোনো ডলার নেই। আমদানি দায় পরিশোধ করতে গিয়েই ঘাটতিতে পড়েছে এসব ব্যাংকগুলো। এ কারণে আমদানির নতুন এলসি খোলা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে ব্যাংকগুলো।
এতে করে সামনের দিনগুলোতে দ্রব্যমূল্যই বৃদ্ধি পাবে না সাথে সঙ্কট প্রকট হয়ে উঠবে- এমন ধারণা করছেন অনেকেই। সাথে সব ধরনের আমদানি কমে আসলে দেশের উৎপাদনমুখী সব সেক্টরেই নৈরাজ্য দেখা দিতে পারে। এর সাথে যোগ হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর এক বক্তব্য উঠে এসেছে, নতুন বছরে দুর্ভিক্ষ দেখা দেওয়ার আশঙ্কা। যা সাধারণ মানুষের মাঝে হতাশা বিরাজ করছে ব্যাপকভাবে।
এমন পরিস্থিতিতে গত সপ্তাহে বাংলাদেশ ব্যাংক সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রিয় ব্যাংকের এক লটে ২৫ হাজার ৩১২ গ্রাম (২৫.৩১ কেজি) বা ২ হাজার ১৭০ ভরি সোনা বিক্রি করবে। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক মতিঝিল কার্যালয়ের এক নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করছে।
এরপর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে পক্ষে-বিপক্ষে নানা তথ্য ছড়িয়ে পড়ছে। যেকোন সময়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ব্যাংকগুলো দেউলিয়া হয়ে পড়বে। ফলে গ্রাহকরা তাদের আমানত হারাবে। ব্যাংক দেউলিয়া হলে গ্রাহকমাত্র বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে মাত্র এক লাখ টাকা ফেরত পাবে। এমন তথ্যের কারণে যাদের এক লাখের বেশি টাকা ব্যাংকে আছে তারা স্থানীয় ব্যাংকগুলো তাদের জমাকৃত টাকা তুলবেন বলে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন- এমন খবর জানা গেছে।
এতে করে চাঁদপুরের নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর মাঝে দেখা দিয়েছে অস্থিরতা। আবার প্রবাসীরা তাদের জমাকৃত টাকা নিয়ে পড়ছে বিপাকে। টাকার জন্য একমাত্র নিরাপদ স্থান হচ্ছে ব্যাংক। এখন সেখানে টাকা থাকলে তা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। সাথে মোটা অঙ্কের টাকা নিজ ঘরে রাখাও নিরাপদ নয়। সব মিলিয়ে অধিকাংশ পরিবারগুলোতে এখন তাদের নিরাপত্তা নিয়েই উদ্বেগ লক্ষ্য করা গেছে।
এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সবার মাঝে এক ধরনের হতাশা আর অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে বলে সচেতন মহল মনে করছে। তারা দাবি করছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ন্ত্রিত না হওয়ায় যে যেমন মন্তব্য কিংবা কমেন্ট ছড়িয়ে দিতে পারছে। পাশাপাশি গণমাধ্যমও তাদের সংবাদ প্রকাশে আগের মতো দায়িত্বশীল হচ্ছে না। যার কারণে উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে- কোন ব্যাংক বন্ধ হবে না, আমানত নিয়ে আতঙ্কের কিছু নেই। ‘স্বাধীনতার পর থেকে দেশের কোনো ব্যাংক বন্ধ হয়ে যায়নি। আগামিতেও কোনো ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাবে না। এক্ষেত্রে ব্যাংকের আমানতের টাকা নিয়ে গ্রাহকদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।’ গতকাল রোববার (১৩ নভেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র জিএম আবুল কালাম আজাদ এ কথা বলেন।
এদিন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট মার্টিন রাইজারের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠক শেষে আবুল কালাম আজাদ এসব কথা বলেন।
তিনি গ্রাহকের উদ্দেশে বলেন, কোনো ব্যাংক আমানতের টাকা দিতে ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। গ্রাহকদের যেকোনো অভিযোগ ‘১৬২৩৬’ নম্বরে কল করে জানালেই হবে। অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা তদন্ত করবো।
তিনি বলেন, দেশে বিশ্বব্যাংকের চলমান যেসব প্রকল্প রয়েছে সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এ ব্যাপারে বিশ্বব্যাংক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। এছাড়া নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগের বিষয়ে বিশ্বব্যাংক আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
এদিকে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সবার দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন বলে মনে করেন সচেতনমহল। তবে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি যে কিছুটা সঙ্কটে তা অনেকটা দ্রব্যমূল্যের বাজারে গেলে আঁচ করা যাচ্ছে বলে সব মহলেই দাবি করছেন। বিশেষ করে ২০টি ব্যাংকের ডলার সঙ্কটের সংবাদ কিংবা তাদের আর্থিক অক্ষমতার বিষয়টি ভাবিয়ে তুলছে সবাইকে কম-বেশি।
এছাড়া জাতীয় সঞ্চয় খাতে মানুষের সঞ্চয়ের প্রবণতা কমে আসচ্ছে। যার নেতিবাচক প্রভাবও পড়েছে সঞ্চয়ের প্রবৃদ্ধিতে। সঞ্চয় কমার কারণে ব্যাংক, নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখন তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। সরকার সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করতে নীতিমালা কঠোর করায় ও মানুষের সক্ষমতার অভাবে তার বিক্রি অর্ধেকে নেমে গেছে। পণ্য ও সেবার মূল্যে লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি ও মানুষের আয় কমায় সঞ্চয় করার প্রবণতা কমে গেছে বলে অর্থনীতিবিদরা দাবি করছেন।
তাদের দাবি, চড়া মূল্যস্ফীতির কারণে ব্যাংকে টাকা রাখলে তা বাড়ার চেয়ে বরং বর্তমানে কমে যাচ্ছে। যার কারণে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, অব্যাহতভাবে সঞ্চয় কমে যাওয়ার প্রবণতা ভালো লক্ষণ নয়। সঞ্চয় না বাড়লে ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ঋণের জোগান দেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এতে বাধাগ্রস্ত হবে অর্থনীতির বিকাশ। যা দেশের মানুষের আয় কমিয়ে দেবে। নতুন কর্মসংস্থান বাড়ার গতি থমকে যাবে। চাকরিচ্যুতির সংখ্যা বেড়ে যাবে। এসব বিবেচনায় নিয়ে সরকারকে এখনই সতর্ক হতে হবে।
এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে অনেক ব্যাংক খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের এলসি খোলাও বন্ধ রেখেছে। যে কয়েকটি ব্যাংকের কাছে এখনো ডলার আছে, সেগুলোও কমে আসছে। আর এই সংকটের কারণে প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে আন্ত ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজার।
অগ্রণী ব্যাংকের অনুমোদিত ডলার সংরক্ষণের ক্ষমতা পাঁচ কোটি ২০ লাখ ডলার। আমদানি দায় পরিশোধের পরও এ পরিমাণ ডলার নিজেদের হিসাবে সংরক্ষণ করতে পারে ব্যাংকটি। যদিও কেন্দ্রিয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকটির কাছে বর্তমানে দায় মেটানোর মতো কোনো ডলারই নেই। উল্টো বর্তমানে ২৫৬ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে ঘাটতি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ডলার ঘাটতিতে রয়েছে অগ্রণী ব্যাংক। রাষ্ট্রায়ত্ত এ ব্যাংকের ঘাটতির পরিমাণ ২৫৬ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এছাড়া এক্সিম ব্যাংক ৮৮ মিলিয়ন, ঢাকা ব্যাংক ৬৮, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক ৬৪, ইউসিবিএল ৪৯, দ্য সিটি ব্যাংক ৪৭, পূবালী ব্যাংক ৪৫, প্রাইম ব্যাংক ৪২ ও সাউথইস্ট ব্যাংক ৪১ মিলিয়ন ডলার ঘাটতিতে রয়েছে। ইস্টার্ন ব্যাংকের ঘাটতির পরিমাণ ৩৫ মিলিয়ন ডলার। মার্কেন্টাইল ব্যাংক ৩৪, ওয়ান ব্যাংক ৩২, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ২৭, ন্যাশনাল ব্যাংক ২৪, ব্যাংক এশিয়া ১৪ ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ১১ মিলিয়ন ডলার ঘাটতিতে রয়েছে। আট মিলিয়ন ডলার করে ঘাটতিতে রয়েছে ট্রাস্ট, ব্র্যাক ও এনসিসি ব্যাংক। বিদেশি খাতের কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলনেও চার মিলিয়ন ডলার ঘাটতি রয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এমন তথ্যকে কেন্দ্র করেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব কিংবা তথ্য বিভ্রাট দেখা দিয়েছে মনে করেন স্থানীয়রা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে স্থানীয় ব্যাংকগুলো গ্রাহকের অর্থ ফেরত দিতে সঙ্কটে পড়বে। গ্রাহকরা সংক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নাও হতে পারে বলে অনেকেই মনে করছেন।
এজন্য সংশ্লিষ্টদের পরিস্থিতি মনিটরিং করে ব্যাংক গ্রাহকদের আশ্বস্ত করার কাজটি দ্রুত করার তাগিদ দিয়েছেন সচেতন মহল।

১৪ নভেম্বর, ২০২২।