এস এম সোহেল
মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ ও ডিজিটাল প্রযুক্তির সার্বজনীন ব্যবহার এবং মুক্তিযুদ্ধ শীর্ষক’ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত শুক্রবার রাতে চাঁদপুর মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলার বঙ্গবন্ধু মঞ্চে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালী যুক্ত হয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এমপি।
তিনি তার বক্তব্যে বলেন, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। যখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ এগিয়ে যাচ্ছিলো তখনই একাত্তরের ঘাতক দালালেরা জাতির পিতাকে নির্মমভাবে হত্যা করে দেশকে পিছনে ফেলে দিয়েছিলো। দীর্ঘ অনেক বছর পর জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা এদেশের হাল ধরেছেন।
তিনি আরো বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার গত ১৪ বছর দেশ পরিচালনার দায়িত্বে থেকে এদেশের সর্বক্ষেত্রে উন্নয়ন করেছে। মাটি ও মানুষকে সম্বল করে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরিত করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দুর্বার গতিতে দেশ এগিয়ে চলছে।
তিনি আরো বলেন, যখনই দেশ উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় এগিয়ে যায় তখন বিএনপি জামাত মাথা নাড়াচাড়া দিয়ে উঠে দেশকে অস্থিতিশীল পরিবেশের সৃষ্টি করে। প্রধানমন্ত্রীর প্রজ্ঞা, দুরদর্শিতা ও জনগণের আস্থার কারণে বিএনপি-জামায়াত তাদের নীলনকশা বাস্তবায়ন করতে পারেনি।
শিক্ষামন্ত্রী আরো বলেন, আমরা যারা স্বাধীনতাকে বিশ্বাস করি, তাদের সবসময় সজাগ ও সচেতন থাকতে হবে। কারণ এ ঘাতক দালাল যখনই সুযোগ পেয়েছে তখনই ছোবল মেরেছে। এদেরকে ঠেকাতে হবে, নির্মূল করতে হবে। অপশক্তিকে নির্মূল করতে দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে চলতে হবে।
জেলা প্রশাসক কামরুল হাসানের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন পুলিশ সুপার মো. মিলন মাহমুদ, সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাহাদাৎ হোসেন, চাঁদপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অসিত বরণ দাশ, এনএসআই’র উপ-পরিচালক শাহ মো. আরমান আহমেদ, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা ইয়াকুব আলী মাস্টার, পুরানবাজার ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ রতন কুমার মজুমদার ও প্রেসক্লাবের সভাপতি গিয়াস উদ্দিন মিলন।
স্বাগত বক্তব্য রাখেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ইমতিয়াজ হোসেন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন দৈনিক সুদীপ্ত চাঁদপুরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক এমআর ইসলাম বাবু।
আলোচনা সভা শেষে বিজয় দিবস উপলক্ষে শিশু একাডেমির আয়োজনে আয়োজিত বিভিন্ন প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। পরে জেলা বিভিন্ন শিল্পীদের পরিবেশনায় মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়।
মহান বিজয় দিবসে চাঁদপুরে বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে ছিলো- সূর্যোদয়ের সাথে সাথে মুক্তিযোদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য অঙ্গীকার পাদদেশে ৩১ বার তোপধ্বনির মধ্য দিয়ে মহান বিজয় দিবসের কর্মসূচি শুরু। তোপধ্বনি শেষে অঙ্গীকার বেদীতে শহীদদের প্রতি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করেন জেলা প্রশাসক কামরুল হাসান, পুলিশ সুপার মো. মিলন মাহমুদ, শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এমপির পক্ষে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নাছির উদ্দিন আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক আবু নঈম পাটওয়ারী দুলাল, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, জেলা পরিষদের, চাঁদপুর পৌরসভা, চাঁদপুর জেলা বিএনপি, চাঁদপুর প্রেসক্লাব, নৌ-পুলিশ, সিভিল সার্জন, জেলা আনসার ও ভিডিপি, চাঁদপুর সদর উপজেলা পরিষদ, চাঁদপুর মৎস্য অধিদপ্তর, চাঁদপুর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, বিএমএ চাঁদপুর, চাঁদপুর রোটারী ক্লাব, চাঁদপুর জেলা জাকের পার্টি, চাঁদপুর জেলা শিক্ষা অফিস, জেলা যুবলীগ, জেলা ছাত্রলীগ, জেলা মহিলা আওয়ামী লীগ, জেলা যুব মহিলা লীগ, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পেশাজীবীসহ সর্বস্তরের জনসাধারণ।
সূর্যোদয়ের সাথে-সাথে সব সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহে জাতীয় পতাকা যথাযথ মর্যাদায় উত্তোলিত হয়। সকাল সাড়ে ৮টায় চাঁদপুর স্টেডিয়ামে জেলা প্রশাসক কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। জাতীয় পতাকা উত্তোলন শেষে শান্তির প্রতীক পায়রা অবমুক্ত ও বেলুন উড়িয়ে দিনব্যাপি কর্মসূচির সূচনা করেন করেন জেলা প্রশাসক কামরুল হাসান ও পুলিশ সুপার মো. মিলন মাহমুদ। পরে পুলিশ, আনসার ও ভিডিপি, বিএনসিসি, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, কারারক্ষী বাহিনী, রোভার স্কাউট, গার্লস্ গাইড, কাব গাইডসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিশু-কিশোর সংগঠনের কুচকাওয়াজ পরিদর্শন শেষে সালাম গ্রহণ করেন জেলা প্রশাসক কামরুল হাসান ও পুলিশ সুপার মো. মিলন মাহমুদ। কুচকাওয়াজ শেষে জেলা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের মনোমুগ্ধকর শরীরচর্চা ও ডিসপ্লে প্রদর্শিত হয়। কুচকাওয়াচ, ডিসপ্লে, বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করেন অতিথিরা। মহান বিজয় দিবসের দিন সাড়ে ১১টায় চাঁদপুর স্টেডিয়াম মাঠে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। চাঁদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা শাহনাজ ও সাংবাদিক এমআর ইসলাম বাবুর যৌথ পরিচালনায় সকালে স্টেডিয়াম মাঠে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ইমতিয়াজ হোসেন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোছাম্মৎ রাশেদ আক্তার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) সুদীপ্ত রায়, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এএসএম মোসা, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নাছির উদ্দিন আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ আবু নঈম পাটওয়ারী দুলাল, এনএসআই এর উপ-পরিচালক শাহ মো. আরমান আহমেদ, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদেও কমান্ডার এম এ ওয়াদুদ, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা মহসীন পাঠান, মুক্তিযোদ্ধা ইয়াকুব আলী মাস্টার, পুরান বাজার ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ রতন কুমার মজুমদার, প্রেসক্লাবের সভাপতি গিয়াস উদ্দিন মিলন, জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা বাবুসহ মুক্তিযোদ্ধা, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গ।
দুপুর ২টা পর্যন্ত জেলার সিনেমা হলে ছাত্র-ছাত্রী ও শিশু-কিশোরদের বিনামূল্যে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হয়েছে। দুপুর হাসপাতাল, জেলখানা, এতিমখানা, সরকারি শিশু সদন এবং মূখ ও বধির স্কুলে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হয়েছে। সুবিধাজনক সময়ে জাতির শান্তি, অগ্রগতি ও শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে মসজিদে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। এছাড়া জাতির শান্তি, অগ্রগতি ও শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে মন্দির এবং গীর্জায় বিশেষ প্রার্থনা করা হয়েছে।
বিকেল ৩টায় চাঁদপুর মহিলা কলেজে জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থার আয়োজনে নারীদের আলোচনা সভা, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিকেল সাড়ে ৩টায় চাঁদপুর স্টেডিয়ামে জেলা প্রশাসক একাদশ বনাম পৌরসভা একাদশের মাঝে প্রীতি-ফুটবল ম্যাচ ও রশি টানাটানি খেলা অনুষ্ঠিত হয়। জেলা প্রশাসন ও পৌরসভার মধ্যে প্রীতি ফুটবল প্রতিযোগিতা শেষে অংশগ্রহণকারী ও আগত অতিথির মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।
এছাড়া বিজয় দিবস উপলক্ষে কর্মসূচির মধ্যে আরো ছিল ১ ডিসেম্বর থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত চাঁদপুর সরকারি কলেজ মাঠ, পুরাণবাজার মধুসুদন উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ ও মোলহেডে এবং সব উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ স্থানে জেলা তথ্য অফিসের উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র ও চলচ্চিত্র প্রদর্শন। চাঁদপুর পৌরসভা, গণপূর্ত বিভাগের উদ্যোগে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক ও সড়ক দ্বীপ, শপথ চত্বর, ইলিশ চত্বর এলাকা জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং বর্ণিল পতাকা দ্বারা সজ্জিতকরণ ও আলোকসজ্জা। শিশু একাডেমির আয়োজনে শিশুদের চিত্রাংকন, রচনা, আবৃত্তি, দেশাত্মবোধক গান ও লোকসংগীতের প্রতিযোগিতা।
১৮ ডিসেম্বর, ২০২২।
