বঞ্চিত চরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা
শাহ আলম খান
চাঁদপুর জেলার মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের উচ্চ বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, স্কুল এন্ড কলেজ ও ডিগ্রি পর্যায়ের কলেজেসহ ৫শ’ ২৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করোনা পরিস্থিতিতে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের উপর নির্ভর করে চলছে। আর এই পাঠদানে যুক্ত হচ্ছে হাজার-হাজার শিক্ষার্থী। তবে তথ্য প্রযুক্তি সুবিধার অভাবে প্রত্যন্ত অঞ্চল বিশেষ করে চরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা অনলাইন ক্লাশে অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
তবে অনেক শিক্ষাবিদ বলছেন, হঠাৎ করে অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চলায় শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো তা’ জানতে না পারায় তা’ কোন কাজে আসছে না। অন্তঃত শতকরা ৫০ ভাগ এখনো জানেই না যে তাদের পাঠদান অনলাইনে চলছে। সম্প্রতি দু’একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানান দিচ্ছেন যে, তারা অনলাইনে পাঠদান করাচ্ছেন। কিন্তু ব্যাপক প্রচারের জন্য কোন মাধ্যমেই তারা বিজ্ঞাপন বা সরকারি তথ্য অধিদপ্তরের কোন ব্যবস্থা ব্যবহার করছেন না। ফলে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছে।
চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে বন্ধ রয়েছে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার আলোকে অধিকাংশ উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ কর্তৃপক্ষ অনলাইনে অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ফেসবুক পেজে পাঠদান শুরু করেছেন। আবার কোন কোন বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তথ্য প্রযুক্তিতে এক্সপার্ট না হওয়ার কারণে একেবারেই বন্ধ রয়েছে পাঠদান কার্যক্রম।
চাঁদপুর জেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ২৭১টি উচ্চ বিদ্যালয়, ১৯৭টি দাখিল, আলিম, ফাযিল ও কামিল মাদ্রাসা, স্কুল এণ্ড কলেজ ১৮টি এবং সরকারি ও বেসরকারি উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়ের কলেজ রয়েছে ৪১টি।
করোনা পরিস্থিতির কারণে প্রথমদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকার পর অবস্থা স্বাভাবিক হবে- এমন চিন্তায় ছিলেন তারা। পরবর্তীতে দেশে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় চিন্তার পরিবর্তন আনেন। স্কুল, মাদ্রাসা ও কলেজগুলোর মধ্যে অনেকেই অনলাইনে নিজ-নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নিয়মিত শিক্ষার আওতায় আনার জন্য অলনাইনে পাঠদান শুরু করেন।
এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চাঁদপুর সরকারি কলেজ, চাঁদপুর সরকারি মহিলা কলেজ, পুরাণবাজার ডিগ্রি কলেজ, শহরের হাসান আলী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, মাতৃপীঠ সরকারি বালিকা বিদ্যালয়, লেডি প্রতিমা বালিকা বিদ্যালয়, আল-আমিন একাডেমি স্কুল এণ্ড কলেজ, গণি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়সহ জেলা সদর ও উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শিক্ষকদের মাধ্যমে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেছেন। যা এখন পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে।
করোনা পরিস্থিতিতে হঠাৎ করে এমন পদ্ধতিতে পাঠগ্রহণ শিক্ষার্থীরা ভালোভাবে অংশ নিতে না পারলেও ধীরে ধীরে আগ্রহ বাড়ছে। তবে অমনযোগী শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিপাকে পড়তে হয়েছে অভিভাবকদের। তাদের নিয়মিত পড়াতে বসানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
শহর ও গ্রামের বেশ কয়েকজন অভিভাবকের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, শিক্ষার্থীরা অধিকাংশ সময় কাটায় মোবাইল গেম্স, টেলিভিশন দেখে ও খেলাধুলা করে। শহরের চার দেয়ালে বন্দি সন্তানদের নিয়ে মহাবিপাকে অভিভাবকরা। খুবই কঠিন মুহূর্ত কাটছে তাদের। অবসর থেকে শিক্ষার্থীরা অনেকটা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকের কোন কথা শুনতেই রাজি না। বিশেষ করে যেসব শিক্ষার্থী দশম শ্রেণি, অষ্টম শ্রেণি ও পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে তাদের নিয়ে বেকায়দায় অভিভাবক। এমন পরিস্থিতিতে গৃহশিক্ষক দিয়ে পড়ায় বসানোও অসম্ভব।
এ বিষয়ে জেলার শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ চাঁদপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর অসিত বরণ দাশ বলেন, করোনা পরিস্থিতির কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আমরা এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে অনলাইনে ক্লাশ শুরু করি। প্রথমে উচ্চ মাধ্যমিক, এরপর অনার্স এবং মাস্টার্স ক্লাশ নিয়মিত কলেজের স্টুডিও থেকে শুরু হয়। গত এক সপ্তাহ চালু করা হয়েছে ডিগ্রি পর্যায়ের ক্লাশ। প্রত্যেকটি বিষয়ের ক্লাশ প্রচার করা হচ্ছে। কলেজের ১৮টি স্টুডিও থেকে সরাসরি ক্লাশ নিচ্ছেন শিক্ষকরা। করোনা পরিস্থিতি যতদিন থাকবে ততদিন অনলাইন ক্লাশ অব্যাহত থাকবে।
তিনি আরো বলেন, ইতোমধ্যে আমরা ক্লাশের পাশাপাশি পরীক্ষা নেয়া শুরু করেছি। এছাড়া উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির প্রথম বর্ষের অধিকাংশ পরীক্ষা করোনা পরিস্থিতির আগে সম্পন্ন হয়েছে। তাদের আগের পরীক্ষার ফলাফল এবং যেসব বিষয়ে পরীক্ষা হয়েছে এসব ফলাফলের উপর ভিত্তি করে তাদের দ্বিতীয় বর্ষে উত্তীর্ণ করা হয়েছে। এখন শুধুমাত্র অফিসিয়াল ঘোষণা বাকি রয়েছে। ইতোমধ্যে তাদের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। জেলার অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের উত্তীর্ণের ব্যাপারে বোর্ডের নির্দেশনা অনুসরণ করবে।
চাঁদপুর সদর উপজেলার ফরক্কাবাদ ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ ড. মোহাম্মদ হাসান খান এ বিষয়ে বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে কলেজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে কলেজের অনলাইন ক্লাশ শুরু হয়। যা বর্তমানে অব্যাহত রয়েছে। শুধুমাত্র অনলাইনে নিয়মিত ক্লাশই নয়, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি, অনার্স, স্নাতক শ্রেণির নিয়মিত ক্লাশ এবং শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে।
বর্তমানে কলেজের ৫০ জনেরও বেশি শিক্ষক অনলাইন ক্লাশ নিচ্ছেন। অনলাইনের প্রতিটি ক্লাশ তিনি নিজেই তদারকি করছেন। কোন বিষয়ে শিক্ষার্থীরা বুঝতে না পারলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের মাধ্যমে তার সমাধানও করা হচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল হওয়ার কারণে ম্যাসেঞ্জার, গ্রুপ ও ইমোর মাধ্যমে বিভিন্ন নোট ও শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। যাতে করে কলেজের শিক্ষার মান ঠিক থাকে।
হাজীগঞ্জ সাদ্রা হামিদিয়া ফাযিল ডিগ্রি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মো. আবু বকর জানান, গ্রামাঞ্চলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হওয়ার কারণে করোনা পরিস্থিতিতে অনলাইনে ক্লাশ নেয়া সম্ভব হয়নি। তবে স্বাস্থ্য বিধি মেনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে দাখিল পরীক্ষার্থীদের বাসায় পাঠদানের নির্দেশনা অর্থাৎ সব বিষয়ে নোট দেয়া হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ওই নির্দেশনার উপর ভিত্তি করে পরীক্ষা নেয়া হবে।
চাঁদপুর জেলা শিক্ষা অফিসার মো. গিয়াসউদ্দিন পাটওয়ারী বলেন, করোনা পরিস্থিতির শুরু থেকেই সরকারি নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়নের জন্য সব প্রতিষ্ঠানকে আমরা চিঠি দিয়েছি। যার ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজ উদ্যেগেই অনলাইনে ক্লাশ শুরু করে। আমরা উচ্চ বিদ্যালয়সহ উচ্চ মাধ্যমিক প্রতিষ্ঠানগুলো তদারকি করে আসছি। জেলা শিক্ষা অফিস থেকে একটি চিঠি দিয়েছে যাতে করে এই অনলাইন ক্লাশে সব শিক্ষার্থীরা যুক্ত হয়।
তারপরও প্রত্যন্ত অঞ্চল এবং চরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা এই সুবিধার আওতায় আসতে পারেনি। এছাড়া করোনাকালীন সময়ে আমাদের শিক্ষকরা জেলা থেকে গঠিত করোনা প্রতিরোধ কার্যক্রম কমিটিতে যুক্ত হয়ে সামাজিক কাজ করেছেন। এরপরও যদি কোন প্রতিষ্ঠান ঠিকমত দায়িত্ব পালন না করে, গণমাধ্যম থেকে জানলে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগ্রহণ করবো।
১৩ জুলাই, ২০২০।
