আজ খুলছে দোকানপাট-শপিংমল, ২৯ এপ্রিল নৌ-পরিবহন
ইলশেপাড় রিপোর্ট
চাঁদপুরে কঠোর লকডাউনের কার্যক্রম এখন আর চোখে পড়ছে না। লকডাউনের দ্বিতীয় দিন থেকে প্রশাসনের তৎপরতা আর নজরদারী প্রতিদিনই কমতে থাকে। এতে করে জেলা শহরের সর্বত্রই মানুষের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। যার কারণে সংক্রমণের আশঙ্কা অব্যাহত থাকছে সমগ্র জেলাজুড়েই।
চলমান কঠোর লকডাউনে খেটে-খাওয়া সাধারণ মানুষের ভোগান্তি অব্যাহত রয়েছে। যদিও গত সোমবার থেকে জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিশ চাঁদপুরে কর্মহীন হয়ে পড়া হতদরিদ্র মানুষের মাঝে ‘প্রধানমন্ত্রীর উপহার’ সরকারি ত্রাণ হিসেবে জনপ্রতি ৫ কেজি করে চাল বিতরণ করেছেন। যা ছিলো চাহিদার বিপরীতে অপ্রতুল।
এদিকে সারা দেশে শনিবার (২৪ এপ্রিল) করোনায় ৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৯ শ’ ৫২ জন। নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে ২ হাজার ৬শ’ ২৯ জনের। মোটি আক্রান্তের সংখ্যা ৭ লাখ ৪২ হাজার ৪শ’ জন। আর চাঁদপুরে গত শুক্রবার পর্যন্ত ৪ হাজার ২৬ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। আর এ জেলায় করোনায় গত শুক্রবার পর্যন্ত মারা গেছেন ১শ’ ১৩ জন।
চলমান কঠোর লকডাউনের মধ্যেই মানুষের জীবন-জীবিকার কথা বিবেচনা করে আজ থেকে দোকানপাট-শপিংমল খোলার অনুমতি দিয়েছে সরকার। যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত খোলা রাখা যাবে দোকানপাট ও শপিংমল। গত শুক্রবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত জারি করা হয়েছে। এতে করে চাঁদপুরের ব্যবসায়ীদের মাঝে স্বস্তি ফিরে আসে।
অপরদিকে নৌ মালিক সমিতি জানিয়েছে, চলমান লকডাউনের (বিধিনিষেধ) মেয়াদ শেষে স্বাস্থ্যবিধি মেনে আগামি ২৯ এপ্রিল থেকে লঞ্চ চালাতে চান মালিকরা। তারাও সরকারের কাছে তাদের দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় বিআইডব্লি¬উটিএ।
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে কঠোর লকডাউন শেষ হচ্ছে আগামি ২৮ এপ্রিল মধ্যরাতে। তবে মালিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আজ থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দোকান ও শপিংমল খোলা রাখার অনুমতি দিয়েছে সরকার। ২৯ এপ্রিল থেকে বাস চালানোর দাবি জানিয়েছে মালিকরা।
গত শুক্রবার জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন জানিয়েছেন, আগামি ২৯ এপ্রিল থেকে বিধিনিষেধ শিথিল হচ্ছে। লকডাউনের মেয়াদ আর বাড়ছে না। তবে স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে কঠোর হবে সরকার।
এদিকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ের পরিস্থিতি খারাপের দিকেই যাচ্ছে। সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় গত ২৯ মার্চ বেশ কিছু বিধি-নিষেধসহ ১৮ দফা নির্দেশনা জারি করেছে সরকার। এর মধ্যে ঘরের বাইরে গেলে মাস্কের ব্যবহার অন্যতম। কিন্তু সংক্রমণ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে থাকলেও জনগণের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে উদাসীনতায় আছে।
এছাড়া জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দাবি করছেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণ বৃদ্ধিতে দায়ী মূলত স্পাইক প্রোটিন। যা চীনের উহান শহর থেকে এ জীবাণুটির উৎপত্তি হয়েছিল। সেটির জেনেটিক ভ্যারিয়েন্ট ছিল ডি৬১৪জি। পরে মিউটেশনের ফলে একটা স্পাইক প্রোটিন বেড়ে গিয়ে নতুন ভ্যারিয়েন্ট হলো ৫০১ওয়াই.ভি১ বা ভিওসি ২০২০/০১ বা ইউকে ভ্যারিয়েন্ট (বি.১.১.৭ লিংকেজ)। যখন এটির রিসেপ্টর বাইন্ডিং ডোমেইন এন৫০১ওয়াই-এর সঙ্গে মিউটেটেড হয়, তখন এটি হয়ে যায় বি.১.৩৫১ লিংকেজ বা সাউথ আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্ট। যার সংক্রমণ করার ক্ষমতা বেড়ে যায় কয়েকগুণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২০ সালের ৮ মার্চ এটিকে মহামারি হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকা বিভিন্ন দেশে আটকে থাকা আমাদের দেশের মানুষদের ফিরিয়ে আনে সরকার। যদিও সরকার তাদের আইসোলেশনে বা কোয়ারেন্টাইনে থাকার অনুরোধ করলেও, সে অনুরোধ কেউই পালন করেনি। ফলে তারা বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ ও উপস্থিত হওয়ায় সংক্রমিত করে সারা দেশে।
বর্তমানে চাঁদপুর উচ্চ সংক্রমণের জেলা। এতে চাঁদপুর সদর জেনারেল হাসাপাতালে অক্সিজেনের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়েছে। যার কারণে চাঁদপুরে বসানো হচ্ছে ৫১ লাখ ৬০ হাজার মিলিলিটারের লিকুইড অক্সিজেন প্ল্যান্ট। এ প্ল্যান্টটি বসানোর কাজে অর্থায়ন করছে ইউনাইটেড ন্যাশন ইন্টারন্যাশনাল চিলড্রেন্স ইমার্জেন্সি ফান্ড (ইউনিসেফ), যা বাস্তবায়ন করছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লিকুইড অক্সিজেন প্ল্যান্টটিতে ৬ হাজার লিটারের ধারণ ক্ষমতা। এটি যখন অক্সিজেনে রূপান্তর হবে তখন ৫১ লাখ ৬০ হাজার মিলিলিটারে রূপান্তরিত হবে।
এদিকে রাজধানীসহ সারা দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মুমূর্ষু অবস্থায় রয়েছেন হাজার-হাজার মানুষ। তাদের দরকার নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) বেড। কিন্তু সরকারি বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে সব আইসিইউ বেডই রোগীতে পরিপূর্ণ। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, এক বেডের রোগী মারা গেলেই তবেই আরেকজন আইসিইউতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল। এখানে করোনা রোগীর শয্যা রয়েছে ২শ’ ৫০টি। হাসপাতালটিতে ভর্তি আছে ৩শ’ ৪৮ জন রোগী। হাসপাতালটিতে আইসিইউ একটিও বেড ফাঁকা নেই একটিও। প্রতিদিনই রোগীর চাপ বাড়ছে, সাথে বাড়ছে আইসিইউ’র চাহিদাও। এ হাসপাতালে আইসিইউ বেড আছে মাত্র ১০টি।
অপরদিকে করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসায় সোমবার থেকে রোগী ভর্তি শুরু করে ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতাল। এ হাসপাতালে আইসিইউ ও সাধারণ শয্যা পাওয়ার আশায় অন্যান্য হাসপাতাল থেকে রোগী এসে ভিড় করছে। এ অবস্থায় হাসপাতালটির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার নাসির উদ্দিন অন্যান্য হাসপাতাল থেকে রোগীদের না আসার অনুরোধ জানিয়েছেন।
তিনি গত মঙ্গলবার দুপুরে হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানান তিনি। নাসির উদ্দিন বলেন, যে যেই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আছেন, তিনি সেখানেই চিকিৎসা নিন। তারা যেন এ হাসপাতালে না আসেন। এলে নতুন যারা আক্রান্ত হচ্ছেন তাদের সংকট দেখা দেবে।
এদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন সংবাদ সংস্থা বাসসকে জানান, বাংলাদেশের স্থানীয় ফার্মাসিউটিক্যালগুলোর সহযোগিতায় করোনা (কোভিড-১৯) টিকা উৎপাদনের প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়া। দেশটি তাদের তৈরি ‘স্পুটনিক’ টিকা বাংলাদেশে উৎপাদন করতে চাচ্ছে।
তিনি জানান, প্রস্তাবনুযায়ী রাশিয়া প্রযুক্তিগত সহায়তা দেবে আর বাংলাদেশি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো ‘স্পুটনিক’ টিকা উৎপাদন করবে। যা বিশ্বব্যাপী বিপুল চাহিদার প্রেক্ষিতে বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে টিকা রফতানি করার মতো পর্যাপ্ত উৎপাদন সক্ষমতা না থাকায় মস্কো বাংলাদেশে টিকা উৎপাদনের প্রস্তাব দিয়েছে।
২৫ এপ্রিল, ২০২১।
