চাঁদপুরে লকডাউন শিথিলের আগেই সর্বমহলে স্বস্তি

ইলশেপাড় রিপোর্ট
বিধিনিষেধের কঠোর লকডাউন শিথিলের ঘোষণায় চাঁদপুরের সর্বমহলে স্বস্তি ছড়িয়ে পড়ছে। গত পরশু ১৩ জুলাই সরকারিভাবে আগাম জানানো হয় ঈদ উৎসব, ব্যবসায়ীসহ সর্বসাধারণের জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে ২২ জুলাই পর্যন্ত বিধিনিষেধের লকডাউন স্থগিত থাকবে। এমন আগাম খবরে বুধবার (১৪ জুলাই) চাঁদপুরে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ ঘর থেকে বের হয়ে আসে। চিরচেনা রুপে ফিরে যায় শহর ও সড়কগুলো। যদিও দূরপাল্লার কোন যানবাহন গতকাল চাঁদপুর ছেড়ে যায়নি। তবে প্রশাসন ছিল তৎপর। গতকালও চাঁদপুর শহরের বিভিন্ন স্থানে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা দিনভর বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে জরিমানা আদায়সহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে জনসাধারণকে অনুরোধ জানান।
টানা ১৪ দিনের কঠোর এই সর্বাত্মক লকডাউনে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষসহ ব্যবসায়ীরা পড়েন চরম বিপাকে। লকডাউন বাস্তবায়নে সেনাবাহিনীসহ সব আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে রাস্তায় নামিয়ে আনে সরকার। এতে করে স্বাভাবিক জনজীবন থমকে দাড়ায়। প্রতিদিনই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী চাঁদপুরসহ সারা দেশে আটক, জরিমানা ও মামলা করে রেকর্ড পরিমাণ। এতে করে আসন্ন ঈদের আগেই এ কঠোর লকডাউনে সাধারণ মানুষজন অনেকটাই বিপাকে পরে যায়।
বিপরীতে দেশে এখনো করোনার প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বরং প্রতিদিনই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে করোনা রোগী। সাথে যোগ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিলের সংখ্যা। গতকাল ২শ’ ১০ জনের মত্যু ও নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে ১২ হাজার ৩শ’ ৮৩ জন। এ নিয়ে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৭ হাজার ৫২ জন। আর মোট শনাক্তের সংখ্যা দাঁড়াল ১০ লাখ ৫৯ হাজার ৫শ’ ৩৮ জনে। গতকাল বুধবার (১৪ জুলাই) স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে পাঠানো করোনাবিষয়ক নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
এদিকে চলমান বিধিনিষেধ শিথিলের ঘোষণার পর স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্তকতামূলক আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর বলছে, এই শিথিলের ঘোষণায় দেশে সংক্রমণ আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। গতকাল বুধবার বুলেটিনে অধিদফতরের মুখপাত্র ও লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন এই আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ঈদ পরবর্তী সময়ে সংক্রমণ ও মৃত্যু বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অধিদফতরের মুখপাত্র বলেন, ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে ১৫ থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত ৮ দিন বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়েছে। কিন্তু আমরা যারা স্বাস্থ্য অধিদফতর এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আছি, বিধিনিষেধ শিথিল হলে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করি। কিন্তু সরকার যে নির্দেশনাই দেয়, আমাদের সেটা মানতে হবে। এজন্য ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধির প্রতিই আপাতত নজর দিচ্ছি।
এদিকে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির আগেই যেন আগের চাঁদপুরের পরিস্থিতিতে ফিরে গেছে পুরনো রূপে। ছোট পরিবহনগুলো সড়কে নেমে আসতে শুরু করে। দীর্ঘদিন কোনো পরিবহন পেয়ে লোকজন হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন তাতে।
চাঁদপুরের বড়স্টেশন এলাকার ইজিবাইক চালক রহিম বলেন, এতোদিন রাস্তায় নামতে পারিনি। পরিবার নিয়ে খুব সংকটে রয়েছি। লকডাউনে গাড়ি চালাতে না পারায় অনেকদিন ঠিকমত খেতেও পারিনি। তাই বাধ্য হয়ে রস্তায় নেমে পড়েছি। শহরের প্রতিটি পয়েন্টেই আগের মতোই অনেক দোকান-পাটও খুলতে দেখা গেছে।
অপরদিকে ১৪ দিনের কঠোর বিধিনিষেধের শেষে আজ হতে সড়কে যানবাহনের চাপ ও মানুষের ভিড় বেশি আগের মতোই দেখা যাবে। পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে চলমান বিধিনিষেধ ১৪ জুলাই মধ্যরাত থেকে ২৩ জুলাই সকাল ৬টা পর্যন্ত শিথিল করেছে সরকার। এ সময় মাস্ক পরিধানসহ সব স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। ঈদের পর ২৩ জুলাই সকাল ছয়টা থেকে আগামি ৫ আগস্ট রাত ১২টা পর্যন্ত আবার কঠোর বিধিনিষেধ থাকবে। এ বিষয়ে গতকাল মঙ্গলবার আদেশ জারি করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপন, জনসাধারণের যাতায়াত, ঈদের আগে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা, দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইতোমধ্যে বাস, ট্রেন ও নৌযানসহ গণপরিবহন চলার ঘোষণা দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে ধারণক্ষমতার অর্ধেক যাত্রী (যত আসন, তার অর্ধেক) নিয়ে চলবে এসব গণপরিবহন।
তবে ঈদ উদ্যাপনে শর্তসাপেক্ষে গণপরিবহনসহ সব যানবাহন চলাচলের বিষয়ে নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। একই সঙ্গে ঈদের পর টানা ১৪ দিন গণপরিবহনসহ সব ধরনের যানবাহন বন্ধেরও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বুধবার বিআরটিএ’র পক্ষ হতে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে ২৩ জুলাই ভোর ৬টা পর্যন্ত পাঁচটি শর্তে সব ধরনের যানবাহন চলতে পারবে।
শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে:
১. বাস/ মিনিবাসে অর্ধেক আসন ফাঁকা রেখে চলতে হবে। পাশাপাশি আসনে বসা যাবে না। গণপরিবহনে আসন বিন্যাস করতে হবে আড়াআড়িভাবে। অর্থাৎ, কোনো আসনে জানালার পাশে যাত্রী বসলে পেছনের আসনের যাত্রীকে করিডরের পাশের আসনে বসতে হবে।
২. অর্ধেক আসন ফাঁকা রেখে চলার কারণে যে আর্থিক ক্ষতি হবে, তা পুষিয়ে নিতে বিদ্যমান ভাড়ার অতিরিক্ত ৬০ শতাংশ বাড়তি ভাড়া দিতে হবে যাত্রীদের।
৩. গণপরিবহনের যাত্রী, চালক, সুপারভাইজার/ কন্ডাক্টর, চালকের সহকারী ও টিকিট বিক্রির দায়িত্বে নিয়োজিতদের মাস্ক পরিধান বাধ্যতামূলক। তাঁদের জন্য হ্যান্ড স্যানিটাইজারের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
৪. যাত্রার শুরু ও শেষে বাস-মিনিবাস পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে হবে। জীবাণুনাশক ছিটিয়ে এসব যান জীবাণুমুক্ত করতে হবে। এছাড়া যাত্রীদের হাতব্যাগ ও মালপত্র জীবাণুনাশক ছিটিয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হবে।
৫. গণপরিবহনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা করতে হবে। শারীরিক ও সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
১৫ জুলাই, ২০২১।