প্রশাসনিক তদারকি নেই, বাড়ছে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা
ইল্শেপাড় রিপোর্ট
শীতের আগমনের মধ্য দিয়ে দেশে করোনার ২য় ঢেউ শুরু হলেও চাঁদপুরে নেই কোন ধরনের জনসচেতনতা। জেলার সর্বসাধারণ এখন আর মানছে না কোন ধরনের সামাজিক দূরত্বও। হাত ধোয়া বা হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহারও সীমিত হয়ে গেছে।
মাস্কের ব্যবহার বাড়লেও শতভাগ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এতে করে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা। এখনই তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলে করোনা ভয়ঙ্কর রূপ নিলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না বলে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ দাবি করছে।
এদিকে চাঁদপুরে মানুষের চলাচলসহ অন্যান্য কিছুর বর্তমান চিত্র স্বাভাবিক সময়ের মতোই বলে দেখা যাচ্ছে। কারো মধ্যেই নেই স্বাস্থ্য সচেতনতা বা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার প্রবণতা। বিভিন্ন সংগঠন ও সংস্থার বিভিন্ন সভা, সমাবেশ বা অন্যান্য সব কিছুই চলছে স্বাভাবিক নিয়মে। কোন-কোন সংগঠনের ৫/৬ শতাধিক মানুষের অংশগ্রহণে বড় ধরনের সমাবেশেও নেই কোন সতর্কতা। এমনকি এই করোনাকালেও চাঁদপুর স্টেডিয়ামে প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীদের পুনর্মিলনীর মতো বড় ধরনের অনুষ্ঠানও হচ্ছে। ভিন্নভাবে এসব অনুষ্ঠানের অনুমতিও লাভ করা হচ্ছে। আর প্রশাসনও এসব অনুষ্ঠান মনিটরিং করছে না। ফলে সরকারি নির্দেশনা স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘিত হচ্ছে সর্বত্রই।
এছাড়া সরকারের নানা ধরনের অনুষ্ঠানও করা হচ্ছে এই করোনাকালে। স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকলেও প্রতিদিনই নানা কাজে শিক্ষকদের যেতে হচ্ছে স্কুল ও অফিসগুলোতে। শুধুমাত্র জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ছাড়া অন্যত্র যেসব অনুষ্ঠান বা সভা-সমাবেশের আয়োজন করা হয় সেগুলোতে থাকে না কোন স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যবস্থা। এমনকি সেসব অনুষ্ঠানে অনেকের মুখেই থাকে না মাস্ক। তবে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা প্রায়ই শহর এলাকায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে মাস্ক না পড়ায় কিছু জরিমানা আদায় করেন। যদিও তার সংখ্যায় খুব কম।
চলতি বছরের মার্চ মাসের শুরুতেই জেলার সর্বসাধারণের মাঝে করোনা নিয়ে সতর্কতা থাকলেও বর্তমানে তা’ একবারেই নেই বললেই চলে। ঐ সময়ে প্রশাসনিক নজরদারি ও লকডাউন থাকায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষ সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মানার চেষ্টা করেছে কিছুটা হলেও। ফলশ্রুতিতে চাঁদপুরে করোনার প্রকোপ ছিলো নিয়ন্ত্রিত। বর্তমানে সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মানছে না কেউ। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ হবে ভয়াবহ।
ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা করছেন, স্বাস্থ্যবিধি ঠিক রাখতে অন্তঃত সবাই যাতে মাস্ক ব্যবহার করে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর প্রশাসনিকভাবে সরকারি-বেসরকারি ও বেশ কিছু প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান ‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস’ ব্যানার লাগিয়েই শেষ করছে তাদের নিজ-নিজ দায়িত্ব। আবার কিছু সামাজিক সংগঠন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে দেখা গেছে রাস্তায় রাস্তায় মাস্ক বিতরণ করতে। বর্তমানে দ্বিতীয় পর্যায়ের সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার বাড়লেও জেলার কোথাও নেই প্রশাসনিক তদারকি।
এমন পরিস্থিতিতে চাঁদপুরে প্রতিদিনই গড়ে ৫-৬ জন করে আক্রান্ত হচ্ছে করোনায়। এতে করে উদ্বিগ্ন হচ্ছে সাধারণ মানুষ। কিন্তু প্রশাসনিক তদারকি ও দায়িত্ব অবহেলার কারণে কেউ আর মানছে না স্বাস্থ্যবিধি। এমন পরিস্থিতিতে শহরের সবর্ত্রই লক্ষ্য করা গেছে বিপণী বিতান থেকে সভা-সোমিনার, বিয়ে, নাটক-সিনেমা ও খেলাধুলা সব কিছুই হচ্ছে অবাধে।
এসব সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে থাকছে না কোন হাত দোয়ার সাবান কিংবা হ্যান্ড স্যানিটারাইজের ব্যবস্থাও। এমনকি প্রশাসনিক অনুষ্ঠানগুলোতেও লক্ষ্য করা গেছে একই চিত্র। যদিও জেলা প্রশাসনের নিজেদের অভ্যন্তরীণ দু’একটি অনুষ্ঠানে কেবল সামাজিক দূরত্ব মানার চেষ্টা করেই নিজেদের দায়িত্ব শেষ মনে করছে কর্তা ব্যাক্তিরা। এতে করে দায়িত্ব অবহেলার চিত্রই প্রকাশ পায় জনমনে।
জেলার স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা আশংকা করছেন, মাস্ক ও স্বাস্থ্যবিধি না মেনে চললে এ শীতে ভয়াবহ হতে পারে করোনা। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা আক্রান্ত হলে তা আর নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। এমন পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যবিধি মানার চাপ বাড়ছে। জেলায় করোনা আক্রান্ত উদ্বিগ্ন পর্যায়ে যাওয়ার আগে হাট-বাজার, যানবাহন, সভা-সেমিনার ও সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে প্রশাসনের নজরদারিসহ দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছে সচেতন মহল।
এদিকে প্রশাসনের একটি সূত্র বলছে, করোনা নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসন সব সময়ই আন্তরিক। এজন্য বিভিন্ন সময় ভ্রাম্যমাণ অভিযান পরিচালনা করে সচেতনতা সৃষ্টি আবার কখনো শাস্তি অথবা জরিমানা আদায় করা হচ্ছে। তবে সাধারণ মানুষ এখন আর করোনাকে হুমকি কিংবা রোগ হিসেবে দেখেছে না। ফলে প্রতিনিয়ত অভিযান চালিয়েও তেমন সুফল পাওয়া যাচ্ছে না বলে প্রশাসনের সূত্রে জানা গেছে।
যদিও সচেতন মহল বলছে, করোনার ভয়াবহতার হাত থেকে রক্ষা পেতে প্রশাসনকে আরো কঠোর হতে হবে। পাশাপাশি শহরের সামাজিক অনুষ্ঠানগুলো নিয়মিত মনিটরিং করলে কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। তবে তৃণমূল পর্যায়ে কোন অভিযান পরিচালনা করলে সতর্ক থাকতে হবে শাস্তি কিংবা জরিমানার আওতায় যেন কোন বয়োবৃদ্ধ কিংবা খেটে খাওয়া কৃষক বা শ্রমিক না থাকে।
এজন্য দ্বিতীয় পর্যায়ের সংক্রমন ভয়াবহ পর্যায়ে যাওয়ার আগেই নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে করোনাকে। তাহলেই ভাল থাকবে চাঁদপুর। ভাল থাকবে জেলার সিকি কোটির সাধারণ মানুষ।
৩০ ডিসেম্বর, ২০২০।
