স্টাফ রিপোর্টার
চাঁদপুর জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভা জুম অ্যাপস্রে মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত মঙ্গলবার বেলা ১১টায় সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিশ।
তিনি তার বক্তব্যে বলেন, চাঁদপুরের করোনা পরিস্থিতি খুব খারাপ পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। প্রতিদিনই তিন থেকে চারভাগ হারে করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেখানে কয়েকদিন আগে আক্রান্তের হার ১৪ ভাগ ছিলো সেখানে আজ তা বিশ ভাগে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই হারে করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় মাদারীপুরে লকডাউন দেয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ কেউই করছেন না। কাঁচাবাজার, বিপণীবিতানে জনসমাগম হচ্ছে, এতে কোনো ধরনের স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছেনা। কেউ মাস্ক ঠিকমত পড়ছেন না। সব জায়গায় জনসমাগম বৃদ্ধি পেয়েছে। সভা, সমাবেশে জনসমাগম হচ্ছে।
তিনি বলেন, আর হয়ত দুুই তিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। যদি সঠিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলেন, তাহলে চাঁদপুরে লকডাউন দেয়া ছাড়া বিকল্প নাই। করোনার জন্য আমাদের সকল উদ্যোগ, আয়োজন ভেস্তে যেতে বসেছে। আমরা আগে কিছুটা ভালো ছিলাম কিন্তু এখন ভালো বলা যাবে না।
তিনি আরো বলেন, দোকান মালিক সমিতি, বিপণী বিতানের ব্যবসায়ীরা, গণপরিবহণের নেতৃবৃন্দ কথা দিয়েছিলেন যে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে তারা সবকিছু পরিচালনা করবেন। তাদের বহুবার সতর্ক ও অনুরোধ করার পরেও তারা তা মেনে চলছেন না। তাদের কথাও তারা রাখছেন না। লকডাউন যে কতটা ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় তা সব শ্রেণি-পেশার মানুষই উপলব্ধি করতে পেরেছেন। আমরা কারো ক্ষতির কারণ হতে চাই না। কিন্তু নিজেরাই যদি নিজেদের ক্ষতি ডেকে আনেন, তাহলে আমাদের করার কিছুই থাকবে না।
তিনি আরো উল্লেখ করেন, জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন পেশাজীবীদের সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে গত বৃহস্পতিবার ও রোববারে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপুমনি করোনা প্রতিরোধ কমিটির পরপর দু’টি সভায় যোগ দিয়ে বক্তব্য রেখেছেন। তিনি সবাইকে সতর্ক করেছেন এবং সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য বলেছেন। কিন্তু এতেও কোন উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।
সভার শুরুতে বিগত সভার কার্যবিবরণী পাঠ করে শোনান স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাহমুদ জামান। সভায় জেলার বিভিন্ন বিভাগের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বিষয়ে আলোচনায় অংশ নেন।
সিভিল সার্জন ডা. সাখাওয়াত উল্লাহ সভায় বলেন, চাঁদপুরে করোনায় আক্রান্তের হার উর্ধ্বমুখী। চাঁদপুর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের জন্যে ৯৬০০টি সিনোভ্যাক্সের টিকা পাওয়া গেছে। ঐ কেন্দ্রের জন্য রেজিস্ট্রেশনকৃত বাদপড়া স্বাস্থ্যকর্মী, মেডিকেল শিক্ষার্থী, নার্স, পুলিশ সদস্য এবং বিদেশগামীদের এই টিকা দেয়া হবে। এখন কোন উপজেলায় টিকা সরবরাহ করা হবেনা। পর্যায়ক্রমে অন্যদের টিকা দেয়া হবে। আসছে জুলাই মাসে চীনা ভ্যাকসিনার আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তখন উপজেলাগুলোতে টিকা সরবরাহ করা হবে।
আলোচনায় চাঁদপুর ২৫০ জেনারেল হাসাপাতালের তত্ত্বাবধায়ক বলেন, চলতি জুন মাসের মধ্যে হাসপাতালে অক্সিজেন প্লান্টটি চালু করা যাবে। তবে আইসিইউর বিষয়ে তিনি বলেন, এটির যন্ত্রপাতি এবং লোকবল সংকটের কারণে তা চালু হতে বিলম্ব হচ্ছে।
ইসলামী ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালক মো. খলিলুর রহমান বলেন, কচুয়া উপজেলার মডেল মসজিদটি উদ্বোধন করা হলেও এখন নামাজ আদায় শুরু করা হয়নি। মসজিদ পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ইমাম ও মুয়াজ্জিন নিয়োগের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মসজিদটি উদ্বোধন হলেও মসজিদটি গণপূর্ত বিভাগ থেকে এখনও হস্তান্তর করা হয়নি।
এ বিষয়ে গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, মসজিদের সামান্য কিছু কাজ বাকি রয়েছে, তা সম্পন্ন হলেই ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কাছে তা হস্তান্তর করা হবে। তবে এখন নামাজ পড়া যাবে। এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক বলেন, যত দ্রুত সম্ভব মসজিদটি হস্তান্তর করতে হবে। শুরু থেকেই যদি মসজিদটি রক্ষণাবেক্ষণ করা না হলেও মসজিদের সৌন্দর্য নষ্ট হবে। মানুষজন সমালোচনা করবে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, চাঁদপুর সেতুর টোলঘর দক্ষিণ পাশে চলে গেছে তবে পূর্ণাঙ্গভাবে সরাতে আরো দু’একদিন সময় লাগতে পারে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী কাছে সভাপতি চাঁদপুর শহর রক্ষা বাঁধ এবং ভাঙন পরিস্থিতির কোন আশঙ্কা আছে কিনা জানতে চান। এ প্রসঙ্গে নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, এ পর্যন্ত প্রায় ২৭ হাজার ব্লক ও ১২ হাজার জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে এবং জরুরি প্রয়োজনে ১০ হাজার জিও ব্যাগ সংরক্ষণ করা আছে।
সভায় জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু নঈম পাটওয়ারী দুলাল বলেন, রঘুনাথপুর, মৈশাদী এলাকায় ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে। তিনি এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সভায় জানান, মতলব উত্তরে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর কর্তৃক ৩০ থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভবনটি নির্মাণ কাজ এখনো সম্পন্ন হয়নি অথচ ২০২১ সালের জুন মাসের মধ্যে এটা হস্তান্তর হবার কথা রয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধা এম এ ওয়াদুদ বলেন, মতলব উত্তরের মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন তৈরি করা হলেও তা এখনো হস্তান্তর করা হয়নি। এটি কিভাবে ব্যবহার করা হবে সে বিষয়ে কোন নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। এটি এভাবে অব্যবহৃত পরে থাকলে নষ্ট হয়ে যাবে।
মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন, বারবার তাগাদা দেয়া সত্ত্বেও বিটিসিএল উপজেলা পরিষদের টেলিফোনগুলো সচল করেনি। কবে সচল করা হবে, সেটিও জানায়নি। তিনি আরো বলেন, উপজেলা প্রাথমিক বিদ্যালয় ও উচ্চ বিদ্যালয়গুলোতে এসাইনমেন্ট জমার জন্য দলে-দলে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে যাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে জেলা শিক্ষা অফিসার ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার সভাপতিকে জানান যে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষার্থীর অভিভাবকরা এসে এসাইনমেন্ট জমা এবং নিতে পারবেন। অভিভাবকরা না আসলে শিক্ষার্থীরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে বিদ্যালয়ে আসতে পারবে।
সভাপতি এ প্রসঙ্গে বলেন, অধিকাংশ বিদ্যালয়গুলোতে অনলাইনে ক্লাস হয় না। বিশেষ করে সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে এর প্রবণতা বেশি। বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোতে বেতনাদি আদায়ের জন্য হয়ত অনলাইন ক্লাস পরিচালনা করা হয়। কিন্তু সরকারি বিদ্যালয়ে বেতনা আদায়ের বিষয় না থাকায় অনলাইনে শিক্ষকরা ক্লাস নিচ্ছেন না, যা অনৈতিক। করোনাকালীন সময়ে বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় কিছু শিক্ষার্থী মাদকাসক্তসহ বিপদগামী হচ্ছে এমনকি কিছু শিক্ষকও এ পথে পা বাড়িয়েছেন বলে তথ্য রয়েছে। তাই বিষয়টি গুরুত্বের সাথে জেলা শিক্ষা অফিসার ও প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারকে পর্যবেক্ষণের জন্য নির্দেশনা প্রদান করেন।
জেলা প্রশাসক আসন্ন কোরবানী ঈদের হাট সম্পর্কে বলেন, জেলায় কোন ধরনের অবৈধ হাট বসতে দেয়া হবে না। হাটে স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সভায় জানান, কৃষকদের কার্ড থেকে তাদের সার, বীজসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণ দেয়া হচ্ছে। এ পর্যন্ত ৮ লাখ ৫ হাজার টাকা প্রণোদনা পাওয়া গেছে, যা সঠিকভাবে বিতরণ করা হচ্ছে।
জেলা নিয়ন্ত্রক সভায় জানান, সাড়ে ১৯ হাজার মেট্রিক টন খাদ্যশস্য জেলা খাদ্য গুদামে রক্ষিত আছে। ৭ হাজার মেট্রিক টন ধান এবং চাল ক্রয়ের কথা থাকলেও এ পর্যন্ত ৫ হাজার একশ’ মেট্রিক টন চাল ও ধান কেনা হয়েছে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, খাদ্য গুদামের ট্রাকগুলো খাদ্যদ্রব্য নিয়ে আসা যাওয়া করতে গেলে পুলিশি বাঁধার সম্মুখীন হয়।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অপরাধ ও প্রশাসন সুদীপ্ত রায় বলেন, বিষয়টি আমরা জেনেছি, এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। ভবিষ্যতে আর কোন জটিলতা হবেনা।
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নাছির উদ্দিন আহমেদ বলেন, ভাঙন কবলিত এলাকায় কোনো ভারী স্থাপনা করা উচিত নয়। আমি সেটিকে সমর্থন করি না। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে ভাঙন কবলিত এলাকায় কোন ভারী স্থাপনা না করার নির্দেশনা রয়েছে। এসব বিষয়ে চিন্তা ভাবনা করা প্রয়োজন।
সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন এনএসআইয়ের উপ-পরিচালক শেখ আরমান আহমেদ, ফরিদগঞ্জ পৌরসভার মেয়র মুক্তিযোদ্ধা আবুল খায়ের পাটওয়ারী, চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি ইকবাল হোসেন পাটওয়ারী, জেলা সমাজসেবা উপ-পরিচালক রজত শুভ্র সরকার, হাজীগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী অফিসার মোমেনা আক্তার।
সভায় জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বিভিন্ন পৌরসভার মেয়র, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত নারী মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দা বদরুন নাহার চৌধুরীসহ বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তারা ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন।
২৪ জুন, ২০২১।
