স্টাফ রিপোর্টার
বাংলাদেশ রেলওয়ে চাঁদপুরে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান ডাকাতিয়ার পাড়ে ‘মডেল স্টেশনে’ রুপ দিতে প্লাটফর্ম বাড়ানো ও চারিদিকে বাউন্ডারি দেয়াল ও ওভার ব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে। অথচ ইতোপূর্বে ডাকাতিয়া নদীর ওই স্থানের রেলওয়ে ও বিআইডব্লিউটিএ’র কয়েকশ’ কোটি টাকার সম্পদ নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে। তাই রেলওয়ের এ সিদ্ধান্তকে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বলে মনে করছে চাঁদপুরের সচেতন জনগণ। তাই স্থানীয় বিভিন্ন মহল থেকে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে।
স্থানীয় সুধীজনের অভিমত- যেখানে বড় স্টেশন মোলহেড এলাকায় জনগণের প্রবেশাধিকার সবসময় সীমিত রাখা হয় এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে কোনো সিগনাল হলে মোলহেড এলাকায় মানুষের প্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়া হয়। অথচ ভাঙন ঝুঁকির সে জায়গায় রেলওয়ে বিভাগ অর্থ ব্যয় করার পরিকল্পনা নিয়েছে। এটি কি কার্যত অর্থাৎ টেকসই মডেল স্টেশন করার পরিকল্পনা নাকি সরকারি অর্থ যেনতেনভাবে খরচ করার উপায় বের করে লুটপাট করার ধান্ধা-এসব প্রশ্ন এখন সচেতন জনগণের মাঝে। চাঁদপুর রেলওয়ে বড় স্টেশনকে ‘মডেল স্টেশন’ করার কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনার কথা জেনে চাঁদপুর পৌরসভার মেয়রসহ সচেতন অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেন। তাঁরা কর্তৃপক্ষের এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্তে হতবাক হয়েছেন।
১৯৯৮ সালে মেঘনা ও মেঘনার তীরবর্তী ডাকাতিয়ার ভয়াবহ ভাঙনে চাঁদপুর লঞ্চঘাট, রেলওয়ে বড় স্টেশন ও মাছঘাটসহ আশপাশের কয়েকশ’ কোটি টাকার সম্পদ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। তখন রেলওয়ে স্টেশনসহ রেলের ওভার ব্রিজ নদীগর্ভে চলে যায়। এখনো পর্যন্ত এটিই চাঁদপুর শহরে সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়। ওই ঘটনার পর চাঁদপুর শহরকে রক্ষা করতে সরকারের বড় মাথা ব্যথা হয়ে দাঁড়ায়। এরপর থেকে নানাভাবে বড় স্টেশন মোলহেড এলাকাকে প্রটেকশান দেয়া হয়। ওই ঘটনার পর মাছঘাটটি অনেক পিছনে এনে স্থানান্তরিত করা হলেও লঞ্চঘাট এখান থেকেই সরিয়ে ফেলা হয়। মাদ্রাসা রোড এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয় লঞ্চঘাট। আর রেলওয়ে স্টেশনকেও পিছনে এনে জোড়াতালি দিয়ে কোনোরকম সচল রাখা হয়। মূলত ওই ভাঙনের পরেই দাবি উঠে রেলওয়ের জংশনসহ পুরো বড় স্টেশনকে কোর্ট স্টেশন এলাকায় অথবা বড় স্টেশন ও কোর্ট স্টেশনকে চাঁদপুর শহর থেকে সরিয়ে নিয়ে মৈশাদী এলাকায় করার জন্যে। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতাসহ নানা কারণে জনগণের এই দাবি আর আলোর মুখ দেখেনি। বর্তমানে বড় স্টেশন এলাকায় রেলওয়ের জংশনসহ যে প্লাটফর্ম এবং অন্যান্য যেসব স্থাপনা রয়েছে, তা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সকলেই মতামত ব্যক্ত করেছে। তাছাড়া দেশের ইলিশের আমদানি-রপ্তানির বড় বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে চাঁদপুর মাছটি বড় স্টেশন এলাকার ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে অবস্থিত। বড় স্টেশন এলাকায় রেলওয়ের এ ধরনের সিদ্বান্তের ফলে চাঁদপুরে ইলিশের বড় বাণিজ্য কেন্দ্র ধ্বংশ হয়ে যাবে বলে মনে করেন মৎস্য ব্যবসায়ী নেতারা।
চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমিতির সভাপতি রোটারিয়ান আবদুল বারী জমাদার মানিক ও সাধারণ সম্পাদক রোটারিয়ান শবেবরাত বড় স্টেশন এলাকায় রেলওয়ের কোনো উন্নয়নমূলক কাজ করাকে রেলওয়ের হঠকারী কাজ হিসেবে দেখছেন। রেলওয়ের এ ধরনের সিদ্বান্তকে ‘উলু বনে মুক্তা ছড়ানোর’ সাথে তুলনা করেন তারা।
এ ব্যাপারে রেলওয়ের লাকসামের ঊর্ধ্বতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী আতিকুর রহমান বলেন, আসলে সারা দেশে রেলওয়ে বিভাগ যতগুলো প্রান্তিক স্টেশন আছে সবগুলিকে যাত্রী সুবিধা বাড়াতে মডেল স্টেশনে রুপ দিচ্ছে। চাঁদপুর বড় স্টেশনের ক্ষেত্রে অবশ্যই সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে।
কয়েকদিন আগে বাংলাদেশ রেলওয়ে চট্টগ্রাম পূর্বাঞ্চলের ডিইএন-১ আব্দুল হানিফ চাঁদপুর সফরে এসে চাঁদপুর রেলওয়ে বড় স্টেশনকে ‘মডেল স্টেশন’ করার রেলওয়ের পরিকল্পনার কথা সাংবাদিকদের জানান। বিষয়টি নিয়ে অনুষ্ঠিত জেলা আইন-শৃঙ্খলা সমন্বয় সভায় চাঁদপুর পৌরসভার মেয়র জিল্লুর রহমান জুয়েলসহ কমিটির সদস্য অনেকেই রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের এ সিদ্ধান্তে বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং এটিকে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বলে অভিহিত করেন। ওই সভায় রেল কর্তৃপক্ষের এ সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের আহ্বান জানানো হয়।
২৯ জুন, ২০২১।
