চাঁদপুর সদরে যুবদলের কমিটি গঠনের নামে পদবাণিজ্য

আহ্বায়কের স্বাক্ষর ছাড়া কমিটি গঠনতন্ত্র বিরোধী : সুলতান সালাউদ্দিন টুকু

এস এম সোহেল
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’র সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যে যুবদল অন্যতম। আন্দোলন সংগ্রামে রাজপথে উত্তপ্ত রাখতে এই সংগঠনটি সব সময়ই অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। শহীদ জিয়ার আদর্শের রাজপথ কাঁপানো এই যুব সংগঠনকে কলুষিত করছে দলের গুটিকয়েক স্বার্থবাজ নেতা। নিজেদের পকেট ভারী করতে জড়িয়ে পড়েছে পদ ও কমিটি বাণিজ্যে। সাংগঠনিক পদ দেওয়ার নামে হাতিয়ে নিয়েছেন মোটা অঙ্কের টাকা। ভবিষ্যতে ভালো একটি পদের আশায় উঠতি নেতারা ও পদ নেওয়ার এ প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়ছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে চাঁদপুর সদর উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের মধ্যে ৬টি ইউনিয়ন যুবদলের আংশিক কমিটি প্রকাশ করা হয়েছে। ঐ কমিটিকে ঘিরে পদবাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। আর এ অভিযোগের আঙুল ইউনিট কমিটিগুলো গঠনের দায়িত্বে থাকা চাঁদপুর সদর উপজেলা বিএনপি ও যুবদেলর নেতাদের দিকে।
স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ করে বলেন, চাঁদপুর সদর উপজেলা যুবদলের কমিটি গঠনের লক্ষ্যে বিভিন্ন ইউনিয়নে কর্মী সমাবেশ করে সেখানে নেতাদের বাণিজ্যিক কমিটি প্রকাশ করতে চাইলে বেশ কয়েক জায়গায় হট্টগোল হয়ে নেতারা ফিরে আসেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন ইউনিয়নের হাইব্রিড কর্মীরা শহরে এসে কমিটি গঠনে দায়িত্বরত নেতাদের মোটা অংকের উপঢৌকনের কারণে নেতারা সুযোগমতো বেশ কয়েকটি আংশিক কমিটি ঘোষণা করেন।
এতে ঐসব ইউনিয়নে ওমুক ভাইয়ের শালা, শ্বশুরের বন্ধু, ওমুক ভাইয়ের মোহরীরা পদ নিয়ে বসে রয়েছে। তাদের বিএনপির ডাকা আন্দোলনেও তাদের দেখা যায় না।
ভাই পরিবর্তন করা গুটিকয়েক নেতার পদবাণিজ্যের কারণে আসন্ন সংসদ নির্বাচনে প্রভাব পড়ার আশংকা করছে ত্যাগী বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলসহ অঙ্গ-সহযোগী নেতা-কর্মীরা।
এদিকে চলতি বছরের গত ২১ মার্চ কল্যাণপুর ইউনিয়ন যুবদলের কমিটি প্রকাশ করা হয়। প্রকাশিত কমিটিতে চাঁদপুর সদর উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক সারোয়ার গাজীর কোন স্বাক্ষর নেই। চাঁদপুর সদর উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম নজু ও ২নং যুগ্ম-আহ্বায়ক আব্দুল মান্নান খান কাজলের স্বাক্ষরে ৯ সদস্যবিশিষ্ট আংশিক কমিটি অনুমোদন দেয়। আহ্বায়কের স্বাক্ষরবিহীন কমিটি কতটুকু আইন ও গঠনতন্ত্র মেনে করা হয়েছে প্রশ্ন বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদলসহ অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের।
এদিকে বিভিন্ন ইউনিয়নে কর্মী সমাবেশ হওয়ার পর থেকে কমিটি গঠনে দায়িত্বরত নেতাদের অর্থ বাণিজ্যের আরও নতুন নতুন তথ্য ইল্শেপাড়ের তদন্তে বের হয়ে আসে। পর্যায়ক্রমে তা প্রকাশ করা হবে। পুরো চাঁদপুরজুড়ে এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠে।
বিভিন্ন মাধ্যমে জানা যায়, চাঁদপুর সদর উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক সারোয়ার গাজীর স্বাক্ষরবিহীন কল্যাণপুর ইউনিয়নের সদ্য প্রকাশিত কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আলী বেপারী জেলা যুবদলের সাবেক দপ্তর সম্পাদক কামরুল ইসলাম জগলুর চাচাতো শালা হওয়ায় ২০২১ সালে ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়ক বানানো হয়। এর আগে মোহাম্মদ আলী বেপারী বিএনপির রাজনীতির সাথে কোনো সম্পৃক্ততা ছিলো না। শালা হওয়ার সুবাদে সে আহ্বায়ক এবং চলতি ২১ মার্চের ৯ জনের আংশিক কমিটির সভাপতি মনোনীত হন।
এছাড়া ঐ কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি মো. কালাম ভাট সদর উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক সারোয়ার গাজীর আপন ফুফাতো ভাই, সহ-সভাপতি মো. বনি আমিন জেলা যুবদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মানিকুর রহমান মানিকের মামা শ্বশুরের বন্ধু, সাধারণ সম্পাদক মো. সবুজ গাজী জেলা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদকের একনিষ্ঠ আস্থাভাজন, সহ-সাধারণ সম্পাদক মো. মোস্তফা গাজী জেলা যুবদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মানিকুর রহমান মানিকের মামাতো শালা হওয়ায় কমিটিতে স্থান পায়। এ ইউনিয়নের ত্যাগী ও ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে আসা নেতা-কর্মীরা জেলা ও সদর উপজেলা যুবদলের নেতাদের আত্মীয় না হওয়ায় কমিটি থেকে বাদ পড়ে যায়। এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় বইছে।
এছাড়া রামপুর ইউনিয়ন যুবদলের কমিটির সভাপতি সভাপতি জুলহাস হোসেন চাঁদপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. সলিম উল্যাহ সেলিমের মুহুরী এবং যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল রাজা জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. নূরুল আমিন খান আকাশের মুহুরী হওয়ায় কমিটিতে স্থান পায়। মৈশাদী ইউনিয়নে নূরুল আমি খান সিন্টুকে যুবদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি করে কমিটি ঘোষণা করে তা বন্ধ রেখে সালাহ উদ্দিন মৃধাকে সিনিয়র সহ-সভাপতি কমিটি ঘোষণা করেন। এ নিয়েও ঐ ইউনিয়নে তোলপাড় চলছে।
এখানেই শেষ নয়। বালিয়া ইউনিয়নের যুবদলের মনগড়া কমিটি করতে গেলে সেখানে সংঘর্ষ হয়। পরে জেলা যুবদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি মো. আক্তার হোসেন সাগরের ফুফাতো ভাই এজাজ আহমেদ তালুকদারকে সভাপতি করে কমিটি গঠন করা হয়। চান্দ্রা ইউনিয়নে মোটা অর্থের বিনিময়ে কমিটি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠে। রাজরাজেশ্বর ইউনিয়নে অর্থের বিনিময়ে রমজান আলীকে সভাপতি এবং জেলা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদকের আত্মীয় কবির চোকদারকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানা যায়।
চাঁদপুর সদর উপজেলা যুবদলের কয়েকজন নেতা জানান, যুবদলের কমিটির নামে পদবাণিজ্য করছে কমিটি গঠনে দায়িত্বরত নেতারা। তারা আরো জানান, ইউনিয়নের কমিটিগুলো গঠনের সময় সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি শাহজালাল মিশন, সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. জাহাঙ্গীর খান, চাঁদপুর সদর উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম নজু ও ২নং যুগ্ম-আহ্বায়ক আব্দুল মান্নান খান কাজলের মতামতের ভিত্তিতে উৎকোচ পাওয়া লোকদের দিয়ে কমিটি করে জেলা বিএনপির সভাপতি শেখ ফরিদ আহমেদ মানিকের কাছ থেকে অনুমোদন নিয়ে কমিটিগুলো প্রকাশ করেন।
চাঁদপুর সদর উপজেলা যুবদলের ৩নং যুগ্ম-আহ্বায়ক এবং কল্যাণপুর ইউনিয়ন যুবদলের সমন্বয়কারী সৈয়দ হোসেন জানান, কল্যাণপুর ইউনিয়ন যুবদলের কমিটি গঠনের বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারবো না। সিনিয়র নেতৃবৃন্দ কমিটি করছে। আমি কোন মন্তব্য করতে পারবো না।
চাঁদপুর সদর উপজেলা যুবদলের ২নং যুগ্ম-আহ্বায়ক আব্দুল মান্নান খান (কাজল) জানান, ৩ মাসের আহ্বায়ক কমিটি ২ বছর অতিবাহিত হচ্ছে। এখনো ইউনিয়নের কমিটিগুলো গঠন হয়নি। তাই জেলা যুবদল কেন্দ্রিয় যুবদলের নির্দেশে আমাকেসহ আহ্বায়ক এবং সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়কে সাইনিং পাওয়ার দেয় এবং ৮ রমজানের মধ্যে সবগুলো কমিটি করার নির্দেশ দেয়।
কল্যাণপুর ইউনিয়ন যুবদলের কমিটির আহ্বায়কের স্বাক্ষর না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আহ্বায়ক সরোয়ার গাজী ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকায় সংগঠনে সময় কম দিতে পারে। তাই তিনজনের মধ্যে যে কোন দু’জনের স্বাক্ষরে কমিটি অনুমোদন হবে। তাই আমি এবং সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়কের স্বাক্ষরে কমিটি দেয়া হয়।
কল্যাণপুর ইউনিয়ন যুবদলের কমিটির বিষয়ে আহ্বায়কের সাথে যোগাযোগ হয়েছে কি না জানতে চাইলে আব্দুল মান্নান খান (কাজল) জানান, তার সাথে যোগযোগ হয়েছে। সে বলেছে- কমিটি অনুমোদন দিবে না।
চাঁদপুর সদর উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়ক কে এম নজরুল ইসলাম (নজু) বলেন, আহ্বায়ক সরোয়ার গাজীর কাছে কয়েকবার গেছি। তিনি স্বাক্ষর করেননি। আমরা তো আর কমিটি আটকে রাখতে পারি না। আমরা কল্যাণপুর ইউনিয়ন যুবদলের কমিটির প্রকাশ করিনি। কেউ যদি করে থাকে তা তাদের ব্যাক্তিগত বিষয়। আহ্বায়কের স্বাক্ষরের জন্য এখনো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আহ্বায়ক ছাড়া কোন কমিটি অনুমোদন হয় কিনা তা গঠনতন্ত্রে উল্লেখ নাই। তারপরও আমরা আহ্বায়ক ছাড়া কাজ করতে রাজি নই, এখনো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
তিনি আরো জানান, কলম আপনার কাছে আপনি আপনার ইচ্ছে মতো লিখতে পারেন। যদি কেউ দেখাতে পারে আমি এক টাকার বিনিময়ে হলেও কোন কমিটি স্বাক্ষর করেছি, সেদিন আমি রাজনীতি ছেড়ে দেবো। অথচ আমি আমার পক্ষ থেকে অনেকে নেতা-কর্মীকে সহযোগিতা করেছি। বিভিন্ন ইউনিয়নের নেতাদের সাথে আমার লাখ লাখ টাকা হাওলাতের লেনদেন আছে।
চাঁদপুর সদর উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক সারোয়ার গাজী বলেন, তাদের আমাকে প্রয়োজন নেই বলেই আমার স্বাক্ষর ছাড়া কমিটি অনুমোদন দিয়েছে। এটি আইন ও গঠনতন্ত্রকে লঙ্ঘন করা হয়েছে। যোগ্য আছে তাদের দিয়ে কমিটি দিতে চেয়েছিলাম। কেউ আমার কথা শুনে না। যে বিষয়ে নিয়ম আছে; তারা কোন নিয়ম মানেনি। আমি চেয়েছিলাম যারা যোগ্য তারা কমিটিতে আসুক। জেলা যুবদলের সহ-সভাপতি মানিকুর রহমান মানিক ভারপ্রাপ্ত লাগিয়ে পত্রিকায় বিবৃতি দিয়েছে- কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে ৩ জনের সাইনিং পাওয়ার বাড়াচ্ছে। আমার জানা মতে, তাদের কাছে কোন কেন্দ্রের কাজ নেই। মৌখিক কোন সিদ্ধান্ত হতে পারে না। আহ্বায়ক ছাড়া কোন কমিটি কেউ দিতে পারে না।
চাঁদপুর জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. নূরুল আমিন খান আকাশ বলেন, সদর উপজেলার যুবদলের কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে ৩ জনের সাইনিং পাওয়ার দেওয়া হয়েছে। এখানে সাইনিং পাওয়ারের যে কোন দু’জনের স্বাক্ষর হলেই চলবে। কল্যাণপুর ইউনিয়ন যুবদলের কমিটিতে দু’জনের স্বাক্ষর রয়েছে।
চাঁদপুর জেলা যুবদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মানিকুর রহমান মানিক বলেন, আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না। কমিটির স্বাক্ষরের বিষয়ে চাঁদপুর সদর উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক, সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়ক ও ২নং যুগ্ম-আহ্বায়কের এখতিয়ার। আমার কাছে এখানো কোন ইউনিয়নের কমিটি আসেনি। কমিটি গঠনে যদি কোন অনিয়ম থাকে তাহলে তা খতিয়ে দেখা হবে।
কেন্দ্রিয় যুবদলের সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, কোন ইউনিটের কমিটি গঠন করতে হলে আহ্বায়ক/সভাপতি স্বাক্ষর অবশ্যই থাকতে হবে। আহ্বায়ক/সভাপতি স্বাক্ষর ছাড়া কোন কমিটি গ্রহণযোগ্য নয়। এরকম কোন কিছু যদি হয়ে থাকে তা গঠনতন্ত্র বিরোধী। এরকম কোন প্রমাণ পাওয়া গেলে গঠনতন্ত্র বিরোধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

৩০ মার্চ, ২০২৩।