জয়ন্তী হত্যাকান্ডের ঘটনায় এখনো আটক হয়নি কেউ


এস এম সোহেল
চাঁদপুর শহরের ষোলঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা জয়ন্তী চক্রবর্তী খুনের ঘটনায় এখনও কাউকে আটক করতে সক্ষম হয়নি পুলিশ। তবে হত্যার ঘটনায় রহস্য উদঘাটন ও আসামি আটকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এবং চাঁদপুর মডেল থানাসহ একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে।
গতকাল বুধবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে পুলিশ সুপার মো. জিহাদুল কবির সাংবাদিকদের জানান, জয়ন্তী হত্যাকান্ডের তদন্ত চলছে দ্রুতগতিতে। আমরা সন্দেহভাজন একাধিক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আবার কয়েকজনকে ছেড়েও দিয়েছি। এটি চলমান প্রক্রিয়া। এ ঘটনায় আমরা একটি টিম করেছি। তারা তাদের কাজ করছে। ধর্ষণের কোন আলামত আছে কিনা তা পোস্টমর্টেম রিপোর্টের পর জানা যাবে। খুনের ঘটনায় ব্যবহৃত ছুরি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
একটি বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষিকা জয়ন্তী চক্রবর্তীকে ধর্ষণ করা হয়েছে। বিষয়টি কিছুটা নিশ্চিত করছেন ময়নাতদন্তকারী চাঁদপুর সদর হাসপাতালের আরএমও ডা. হাসিবুল হাসান। তিনি আরো জানিয়েছেন, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট আসলে সবকিছু পরিস্কার হবে।
এ ব্যাপারে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা অনুপ চক্রবর্তী জানায়, আমাদের কাছে এ মুহূর্তে কোন খবর নেই। থাকলে আমরা অবশ্যই জানাবো।
এদিকে চাঁদপুর শহরের আলোচিত ষোলঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা জয়ন্তী চক্রবর্তী হত্যার একদিন পর তার স্বামী অলোক কুমার গোস্বামী বাদী হয়ে ২২ জুলাই চাঁদপুর মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলা নং ৪১। মামলায় আসামি হিসেবে অজ্ঞাত খুনিকে উল্লেখ করা হয়েছে। এদিকে জয়ন্তী চক্রবর্তীর হত্যাকান্ডের ঘটনায় মানববন্ধন করেছে প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি ও ফেডারেশন অফ জেলা কিন্ডারগার্ডেন এসোসিয়েশন। সুষ্ঠু তদন্তসাপেক্ষে আসামিদের গ্রেফতার ও বিচারের দাবিতে মানববন্ধনে প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি ২৪ ঘণ্টা ও কিন্ডারগার্ডেন এসোসিয়েশন ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম প্রদান করেছে। অন্যথায় বৃহত্তর আন্দোলনের হুমকি দিয়েছে তারা।
এ ব্যাপারে নিহত জয়ন্তী চক্রবর্তী স্বামী অলোক চন্দ্র গোস্বামী জানান, আমাদের জানামতে এরকম কাউকে দেখতে পাচ্ছি না যে আমার স্ত্রীকে খুন করতে পারে। তবে যারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে আমরা তাদের শাস্তি দাবি করছি। তবে জয়ন্তী চক্রবর্তী হত্যাকান্ডটি রহস্যে ঘেরা। ১৫ জন আনসার সদস্য প্রতিদিন কোয়ার্টারের প্রধান ফটকে ডিউটি করে। তাদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে খুনি বা খুনিরা কিভাবে হত্যাকান্ড করে পালিয়ে গেলো এমন হাজারো প্রশ্ন জনমনে।
এদিকে জানা গেছে, প্রতি বছর পানি উন্নয়ন বোর্ডের সরকারি কোয়ার্টারগুলোর আশপাশে পরিস্কারের জন্য সরকার থেকে বাজেট দেয়া হয়। কিন্তু কোয়ার্টার এলাকায় ঢুকে দেখা গেছে এ যেনো আমাজন গহিন জঙ্গল। তাহলে সরকারি বরাদ্দের টাকা গেলো কোথায়? তাছাড়া আরো জানা গেছে, জয়ন্তী চক্রবর্তী যে ভবনে খুন হয়েছে সে ভবনটি অনেক আগেই পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। কিন্তু পরিত্যক্ত একটি ৪ তলা ভবনে শুধু এ পরিবারটি কিভাবে বসবাস করে আসছিলো তা অনেককেই ভাবিয়ে তুলছে।
নিহতের স্বামী, পরিবারের সদস্য, সহকর্মী, প্রতিবেশী কারোরই কোনো বিষয়ে সন্দেহ জাগছে না যে, খুনের পেছনে কি কারণটি থাকতে পারে।
মামলার এজাহারে সূত্রে বাদী অলোক গোস্বামী উল্লেখ করেন, ঘটনার দিন রোববার সকাল সোয়া ৮টায় বাসা থেকে বের হন ৯টার ঈগলে ঢাকা যাওয়ার উদ্দেশ্যে। সাথে তার ছোট মেয়ে শ্রীপর্ণা গোস্বামী তন্বী ছিলো। তন্বী এবার চাঁদপুর সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছে। সে ঢাকা কোচিং করবে, সেজন্য তাকে নিয়ে বড় মেয়ে অনন্যা গোস্বামীর কাছে যাচ্ছিলেন বাবা অলোক গোস্বামী। রোববার সকালে যখন তিনি ছোট মেয়েকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হন, তখন তার স্ত্রী বাসার নিচে গেট পর্যন্ত এসে তাদের বিদায় জানান। ঈগল-৩ লঞ্চে উঠে পৌনে ৯টার দিকে তিনি তার স্ত্রীকে ফোন করে জানান যে, তারা লঞ্চে উঠেছেন। এটাই জয়ন্তী চক্রবর্তীর সাথে স্বামী অলোক কুমার গোস্বামীর শেষ কথা। এরপর ঢাকা গিয়ে বড় মেয়ের বাসায় পৌঁছে স্ত্রীকে জানানোর জন্যে তিনি ফোন দেন। তখন সময় হবে দুপুর ২টা। কিন্তু অপর প্রান্ত থেকে স্ত্রী আর ফোন রিসিভ করেননি। ফোন কয়েকবার করেছেন, রিং হয়েছে, কিন্তু রিসিভ হয়নি। তখন তিনি (স্বামী) ভেবেছেন, স্ত্রী তো এখন স্কুলে, মোবাইল হয়ত তার ব্যাগের ভেতরে, সেজন্য আওয়াজ শুনছে না হয়তো। বিকেল ৪টার দিকে অলোক কুমার গোস্বামী তার অফিসের স্টাফ থেকে ঘটনা শুনতে পান। পরে তিনি তার তিন সন্তানকে নিয়ে রাতে চাঁদপুর চলে আসেন।

২৫ জুলাই, ২০১৯।