এস এম সোহেল
ত্যাগ ও উৎসর্গের মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে হিংসা-বিদ্বেষ, ভেদাভেদ ও বৈষম্য ভুলে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনার্থে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা চাঁদপুরে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হয়েছে। সামর্থ্যবানরা পশু কোরবানী দিয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে। আর যাদের সামর্থ নেই তাদেরও এই ঈদ-আনন্দের কোনো কমতি ছিলো না। ধনীদের কোরবানীর মাংসে গরিবদের যে অধিকার রয়েছে, সে প্রাপ্য তারা পেয়ে ঈদের আনন্দ উপভোগ করেছে। এভাবে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও আনন্দ-উচ্ছাসে জেলাবাসী ঈদ উদযাপন করেছে।
গত রোববার (১০ জুলাই) ছিলো মুসলমানদের ২য় বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা। চাঁদপুর জেলা শহরের প্রধান ঈদের জামাত চাঁদপুর পৌর ঈদগাহে সকাল সাড়ে ৭টায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। নামাজের আগে বক্তব্য রাখেন জেলা প্রশাসক কামরুল হাসান, চাঁদপুর পৌরসভার মেয়র অ্যাড. জিল্লুর রহমান জুয়েল, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠের সম্পাদক ও প্রকাশক অ্যাড. ইকবাল বিন বাশার।
ঈদের প্রধান জামাতে ইমামতি করেন বাহাদুরপুর পীরের বংশধর মাও. মুফতি সাজ্জাদ হোসাইন। নামাজ শেষে মুসলিম উম্মাহসহ দেশের সব মানুষের উন্নতি, সমৃদ্ধি, সুখ, শান্তি এবং আখেরাতের নাজাত ও মুক্তি, করোনাভাইরাস মহামারীসহ সব প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে মুক্তির জন্য মহান আল্লাহ তাল্লার দরবারে মোনাজাত করা হয়। ঈদের জামাত শেষে চলে কোলাকুলি আর সৌহার্দ্য বিনিময়।
এখানে নামাজ আদায় করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. ইমতিয়াজ হোসেন, চাঁদপুর সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মুহাম্মদ হেলাল চৌধুরী, পৌরসভার প্যানেল মেয়র অ্যাড. মো. হেলাল হোসাইনসহ প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারী, রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিবর্গ।
এছাড়া শহরের পুলিশ লাইন্স ময়দানে পবিত্র ঈদুল আজহার জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে সকাল সাড়ে ৭টায়। এতে ইমামতি করেন মাও. আব্দুস ছালাম। চাঁদপুর সরকারি কলেজ মাঠে জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে সকাল পৌনে ৮টায়। এতে ইমামতি করেন মাও. আবুল খায়ের। শহরের বেগম জামে মসজিদে জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে সকাল সাড়ে ৭টায়। এতে ইমামতি করেন মুফতি মাহবুবুর রহমান। চিশতিয়া জামে মসজিদ সংলগ্ন হাসান আলি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে সকাল সাড়ে ৭টায়। এতে ইমামতি করেন হা. মাও. এনামুল হক এবং সকাল সাড়ে ৮টায় ২য় জামাতে ইমামতি করেন মাও. নুরুল ইসলাম। পুরাণবাজার মধুসূধন উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে সকাল পৌনে ৮টায়। এতে ইমামতি করেন মুফতি ইব্রাহিম খলিল মাদানী। বাবুরহাট স্কুল ও কলেজ মাঠে জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে সকাল সাড়ে ৭টায়। এতে ইমামতি করেন হাফেজ মাও. মো. জাহিদ হোসেন। পুরাণবাজার এমদাদিয়া মাদ্রাসা মাঠে জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে সকাল সাড়ে ৮টায়। এতে ইমামতি করেন মুফতি জাফর আহমাদ। জেলা কারাগার জামে মসজিদে জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে সকাল পৌনে ৮টায়। এতে ইমামতি করেন মাও. কবির উদ্দিন। পুরাণবাজার হাফেজিয়া মাদ্রাসা মাঠে জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে সকাল সাড়ে ৭টায়। এতে ইমামতি করেন মুফতি ত্বোহা খান। দক্ষিণ গুণরাজদী আহম্মদিয়া ঈদগাহ ময়দানে জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে সকাল ৮টায়। এতে ইমামতি করেন মাও. অলিউর রহমান। পূর্ব শ্রীরামদি ৩নং বালক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে সকাল ৮টায়। এতে ইমামতি করেন মাও. মুসা বিন ওমর। টেকনিক্যাল স্কুল মাঠে জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে সকাল ৮টায়। এতে ইমামতি করেন মুফতি মো. রুহুল আমিন। শাহী জামে মসজিদে জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে সকাল সাড়ে ৭টায়। এতে ইমামতি করেন মাও. আব্দুল্লাহ আল মামুন। মসজিদে গৌর-এ-গরীবাঁ জামে মসজিদে জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে সকাল ৭টায়। এতে ইমামতি করেন মাও. আব্দুর রশিদ। চেয়ারম্যানঘাটা ঈদ জামাতে জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে সকাল সাড়ে ৭টায়। এতে ইমামতি করেন মাও. মো. মোশাররফ হোসাইন। চাঁদপুর স্টেডিয়ামে জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে সকাল সাড়ে ৭টায়। এতে ইমামতি করেন মুফতি কাজী মশিউর রহমান। ওসমানিয়া কামিল মাদ্রাসায় জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে সকাল ৮টায়। এতে ইমামতি করেন মাও. হাফেজ জালাল উদ্দিন। বায়তুল আমিন রেলওয়ে জামে মসজিদে জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে সকাল পৌনে ৮টায়। এতে ইমামতি করেন হাফেজ মাও. বোরহানউদ্দিন সিদ্দিকি।
অপরদিকে, প্রতি বছরের মতো এ বছরও হাজীগঞ্জের ঐহিত্যবাহী আলীগঞ্জ হযরত মাদ্দাহ্ খাঁ (রহ.) জামে মসজিদে পবিত্র ঈদুল আযহার জামাতটি সকাল ৮টায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে ইমামতি করেন মসজিদের খতিব ও পেশ ইমাম মুফতি ফজলুল কাদের বাগদাদী।
হজ ও কোরবানীর স্মৃতিকে ধারণ করে মুসলিম উম্মাহর এই ধর্মীয় উৎসব। যাদের ওপর হজ ফরজ হয়েছে তারা পবিত্র মক্কা-মদীনায় গিয়ে হযরত ইব্রাহীম (আ.) ও ইসমাঈল (আ.) সহ অন্য নবীদের স্মৃতি বিজড়িত স্থানসমূহ এবং বায়তুল্লাহ শরীফ ও নবীজীর রওজা মোবারক জিয়ারতের মধ্য দিয়ে হজ পালন করে থাকেন। হজের পরদিন অর্থাৎ ১০ জিলহজ হচ্ছে ঈদুল আজহা। বাংলাদেশে জিলহজের চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করে এ বছর ১০ জিলহজ ছিলো ১০ জুলাই। ইসলামের বিধান মতে, যাদের ওপর হজ ফরজ হয়নি, তারা পবিত্র মক্কা-মদীনায় না যেতে পারলেও তাকবীর পাঠের মধ্য দিয়ে হজের মতো একটি মহাপূণ্য কাজের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছে।
ঈদের দিন সকালে মুসলমানরা নামাজ আদায়ের জন্য দলে দলে ঈদগাহের দিকে ছুটতে থাকে। ধনী-গরিব, ছোট-বড়, ও বর্ণের কোনো ভেদাভেদ ছিল না। এক কালেমার পরিচয়ে সবাই একাকার হয়ে গেছে ঈদগাহে। সবাই কাতারবন্দী হয়ে দু’রাকাত ঈদুল আজহার ওয়াজিব নামাজ আদায় করে খুতবাহ পাঠ শেষে দোয়া ও মোনাজাত করে যার যার বাড়ি-ঘরে ফিরে আসেন। তবে নামাজ শেষে অনেকেই আপনজনদের কবর জিয়ারত করে এই পবিত্র দিনের ফজিলতে তাদের শামিল করে তাদের জন্য মাগফিরাত কামনা করেন। বাড়িতে এসে সবাই পশু কোরবানীতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কোরবানী শেষে গোস্ত নিজেদের জন্যে রেখে আত্মীয়-স্বজন, গরিব ও প্রতিবেশীদের মধ্যে বিলি-বণ্টন করে দেন।
ঈদের নামাজ আদায় শেষে শুরু হয় আল্লাহর নামে পশু কোরবানী দেয়া। শহরের লোকজনের পশু কোরবানী দেয়ার মত পর্যাপ্ত স্থান না থাকায় অধিকাংশ লোকজনই শহরের মেইন সড়ক ও মহল্লার সড়কে পশু কোরবানী করেন। তবে পৌরসভার নির্দেশনা ছিলো ময়লা-আবর্জনা যেন ড্রেনের মধ্যে না রাখেন। উপরে রাখা হলে পৌরসভার গাড়ি এসে নিয়ে যাবে। কিন্তু এই নিয়ম অনেকেই মানেননি। এ বিষয়ে পৌরসভার পক্ষ থেকে মাইকিংও করা হয়েছে।
ঈদ জামাতেই নামাজ ও মোনাজাত শেষে সবাই একে অপরের সাথে আলিঙ্গন করেছে। ঈদ মুসলিম বিশ্বের জন্য এক আনন্দঘন উৎসব। ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করার জন্য একসঙ্গে নামাজ আদায় করে শিশু-বৃদ্ধ সবাই শামিল হয়। ঈদের নামাজ শেষে মুসল্লিরা কোলাকুলি করেন একে অপরের সঙ্গে। মুহূর্তে গোটা এলাকা সৌহার্দ্য আর সম্প্রীতির মিলন মেলায় পরিণত হয়। দোয়া ও মোনাজাত করেন বিশ্ব মুসলিমের ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং মুসলিম জাহানের উন্নতি ও সমৃদ্ধি কামনার অঙ্গীকারে। সব শত্রুতা ও বৈরিতা ভুলে যেনো সৃষ্টি হয় এক স্বর্গীয় পরিবেশ, সামনের দিনগুলোও যেনো ঈদের মতো হয় এ কামনা ছিলো সবার। শহরের বড় বড় মসজিদ, পাড়া-মহল্লার মসজিদেও ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ঈদের জামাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রায় প্রত্যেক ঈদগাহে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, পুলিশ ও আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্কাউটস্ সদস্যরা সার্বক্ষণিক নজরদারি বজায় রেখেছে।
ঈদে প্রত্যেক বাড়িতে সেমাইয়ের সঙ্গে থাকে ফিরনি, পিঠা, পায়েস, গরুর গোস্ত, কোরমা ও পোলাওসহ সুস্বাদু সব খাবারের সম্ভার। রোগীদের জন্য হাসপাতাল এবং এতিমখানা ও বন্দিদের জন্য জেলখানায় থাকে বিশেষ খাবারের আয়োজন।
এ দিন ধনী-গরিব, আশরাফ-আতরাফ নির্বিশেষে সবাই এক কাতারে শামিল হন এবং ঈদের আনন্দ ভাগভাগি করে নেন। তাই শান্তিপূর্ণ ও সৌহাদ্যপূর্ণ সমাজ গঠনে ঈদুল আজহার আবেদন চিরন্তন। ঈদুল আজহা আমাদের সুন্দর ও সমৃদ্ধ সমাজ গঠনে উদ্বুদ্ধ করে।
১০ জুলাই, ২০২২।
