দেয়াল চিত্রের মাধ্যমে প্রাক-প্রাথমিকের পুরো বই উপস্থাপন

হাজীগঞ্জের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর প্রাক-প্রাথমিকের শ্রেণিকক্ষে দৃষ্টিনন্দন ও আকর্ষণীয় পরিবেশ

মোহাম্মদ হাবীব উল্যাহ্
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত বাংলাদেশ গড়তে হলে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। আর মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে শিশুকে বিদ্যালয়মুখী বা বিদ্যালয়ের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। যা প্রাক-প্রাথমিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা শিশুর ব্যক্তিত্বের পূর্ণ বিকাশ ঘটায় এবং আজীবন শিখনের ভিত্তি তৈরি করে।
এছাড়া আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষার প্রথম সোপান ও প্রস্তুতি এবং প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার একটি বিস্তৃত পরিসরের সূচনার অংশ হলো এই প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা। প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়ন ও প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাকে আরো সমৃদ্ধিশীল এবং মানসম্মত করার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে সরকার প্রয়োজনীয় সবধরনের ব্যবস্থাগ্রহণ করেছে। যার বেশিরভাগ কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয়েছে।
এদিকে সরকারের এই কার্যক্রমকে সফল এবং ক্ষুদে শিশুদের স্কুলমুখী ও আনন্দদায়ক পাঠদান কার্যক্রম চালু করার লক্ষ্যে হাজীগঞ্জের প্রতিটি বিদ্যালয়ের সার্বিক পরিবেশের মানোন্নয়ন ও শিশুদের কাছে তা আকর্ষণীয় করতে বিভিন্ন রঙে সাজিয়ে মনোরম পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। এর পাশাপাশি প্রাক-প্রাথমিকের শ্রেণিকক্ষকে ব্যতিক্রমভাবে সুসজ্জিত করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ১৫৭টি বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় ১৩০টি বিদ্যালয় সম্পন্ন হয়েছে।
প্রাক-প্রাথমিকে খেলনাসহ সুসজ্জিত ও নান্দনিক শ্রেণিকক্ষে দেয়াল-চিত্রের মাধ্যমে প্রাক-প্রাথমিকের পুরো বইটি কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মাঝে উপস্থাপন করা হয়েছে। রয়েছে এ্যাকুরিয়াম ও এলইডি টেলিভিশন। ২০১৮ সালের শেষদিকে এই কাজটি শুরু করেন সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহজাহান। তিনি বেসরকারিভাবে সেন্দ্রা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাধ্যমে প্রাক-প্রাথমিকের শ্রেণিকক্ষটি সুসজ্জিত করেন।
এরপর থেকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি ম্যানেজিং কমিটি, স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ও জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় প্রতিটা স্কুলের প্রাক-প্রাথমিকের ব্যাপক উন্নয়ন করা হয়েছে। বিদ্যালয়ের সার্বিক পরিবেশের মানোন্নয়ন ও শিশুদের কাছে তা আকর্ষণীয় করতে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিকক্ষগুলোতে আকর্ষণীয় ছবি, বানী, বর্ণমালা দিয়ে সাজানোসহ বিভিন্ন রঙে মনোরম পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে।
বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখা গেছে, সরকার বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আধুনিক ও বহুতল ভবন নির্মাণ, ওয়াশব্লক ও শিশুদের নিরাপত্তায় বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ, আকর্ষণীয় শিক্ষা ও সংগীত উপকরণ বিতরণসহ শিশুদের জন্য খেলার সামগ্রী (দোলনা, স্লিপার, ব্যালেন্সার ইত্যাদি) দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো ধারাবাহিকভাবে কাজ চলমান রয়েছে। তবে সব প্রতিষ্ঠানেই প্রাক-প্রাথমিকের জন্য সুন্দর পরিবেশ রয়েছে।
প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের দেয়ালে শোভা পাচ্ছে নানা কারুকার্য ও আল্পনা। বারান্দার টবে সাজানো রয়েছে প্রাকৃতিক ফুলের বাগানসহ জীব-জানোয়ারের প্রতিকৃতি। শিশুরা যাতে বাংলায়ও ইংরেজিতে ১২ মাসের ও ৭ দিনের নাম শিখতে পারে কাগজের বিভিন্ন আল্পনার মধ্যে সাজিয়ে রাখা হয়েছে দেয়ালগুলোতে। অংক শিখানোর জন্য রয়েছে অনেক উপকরণ। বড় বড় মনীষীদের ছবি নামসহ দেয়ালে টানানো রয়েছে। এতে করে শিশুরা বিনোদনের সাথে জানতে ও শিখতে পারছে অনেক জানা-অজানা তথ্য।
এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, ‘আনন্দময় ও শিশু-বান্ধব পরিবেশে বিভিন্ন খেলা ও কাজের মাধ্যমে শিশুর সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ, শেখার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি, বিভিন্ন চিত্র ও উপকরণের মাধ্যমে ফুল, ফল, প্রাণি ও পরিবেশের পরিচিতি, নিজস্ব সাংস্কৃতিক আচার-কৃষ্টি-মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয়। শিশুকে পারিবারিক, সামাজিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন এবং শিশুর ভাষা ও দক্ষতা বিকাশে সহায়তা করা।
পুঁথিগত শিক্ষা হিসেবে বাংলা ও ইংরেজি বর্ণমালা পরিচিতি (স্বরবর্ণ ও ব্যাঞ্জনবর্ণ), প্রাক-গাণিতিক ধারণা, সংখ্যা ধারণা, চারুকারু, ছবি আঁকা, ছড়া, গল্প, বিভিন্ন রুপকথার গল্প, ইচ্ছেমত খেলা, নাচ-গান, সাধারণ জ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করছে। সর্বোপরি বিদ্যালয়ের আনন্দঘন পরিবেশের মাধ্যমে কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ের প্রতি আকর্ষিত ও আগ্রহ সৃষ্টি করা।
উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতকরণ ও আকর্ষণীয় পরিবেশ তৈরি এবং শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ের প্রতি আগ্রহী মনোভাব সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি লেখাপড়ার মান ও পরিবেশ নিয়ে খুশি অভিভাবকরা। অভিভাবকরা জানান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে শিশুবান্ধব পরিবেশে সাজানোর ফলে তাদের সন্তানরা আগের তুলনায় বিদ্যালয়ের প্রতি এখন বেশি আগ্রহী হয়েই স্কুলে যায়। লেখাপড়ার মান অনেকটা বেড়েছে।
শিক্ষার্থীরা জানায়, তারা বিদ্যালয়ে এসে পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাধুলা করতে পারে। স্কুলে বাগানসহ সুন্দর করে সাজানোর ফলে বাড়ির চেয়ে স্কুল তার কাছে বেশি ভাল লাগে।
কথা হয় সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহজাহানের সাথে। তিনি জানান, উন্নত জীবন গঠনে সুন্দর পরিবেশের বিকল্প নেই। আর সুন্দর পরিবেশ থাকলে কোমলমতি শিশুরা বিদ্যালয়ের প্রতি আকর্ষিত হবে। এতে করে শিক্ষার্থীদের ঝড়ে পড়া রোধ এবং উপস্থিতির হার বাড়বে। আর এই কাজটি করতে হলে, প্রাক-প্রাথমিকের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। যেহেতু প্রাক-প্রাথমিকই শিক্ষার প্রাথমিক স্তর।
তিনি বলেন, ভয়-ভীতি রোধ ও আনন্দময় পাঠদানের জন্য প্রাক-প্রাথমিকের পরিবেশকে আকর্ষিত করা মানে শিশুদের আকর্ষিত করা। তাই প্রাক-প্রাথমিকের পরিবেশ আকর্ষণীয় করার লক্ষ্য নিয়ে ২০১৮ সালের শেষদিকে ডিপিইও স্যার (জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা) ও তৎকালীন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার সাথে পরামর্শক্রমে কাজ শুরু করি। প্রথমে স্থানীয়দের সহযোগিতায় অর্থাৎ বেসরকারিভাবে উদ্যোগ নেই এবং সফল হই।
পরবর্তীতে বিদ্যালয় সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের এই ধারণা দেওয়ায় তারা অংশীদারিত্ব অনুভব করছে। ফলে এলাকাবাসী নিজেদের প্রতিষ্ঠান মনে করে নিজেদের আগের তুলনায় অনেক বেশি সম্পৃক্ত করেছেন। এরপর সরকারি বরাদ্দ, ম্যানেজিং কমিটি ও প্রধান শিক্ষকসহ অন্যান্য শিক্ষক এবং স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় প্রতিটি স্কুলেই এই কাজ চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যে উপজেলার ১৫৭টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৩০টিতে এই সৌন্দয্যবর্ধনের কাজ শেষ হয়েছে বলে তিনি জানান।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবু সাঈদ চৌধুরী বলেন, মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। একটি আকর্ষণীয় বিদ্যালয় বা শ্রেণিকক্ষ শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট এবং বিদ্যালয়ে নিয়মিত আসার পথ সুগম করে। ইতোমধ্যে দেখা গেছে, যেসব প্রতিষ্ঠানে আকর্ষণীয় পরিবেশ রয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানে উপস্থিতির হার বেশি।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমন আকর্ষণীয় পরিবেশ উপস্থাপনে তিনি সংশ্লিষ্ট সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা, বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি, প্রধান শিক্ষকসহ সব শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষানুরাগী, স্থানীয় এবং সংবাদকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোমেনা আক্তার বলেন, উন্নত বিশ্বের মতো আনন্দের সাথে পাঠদান ও পড়ালেখা নিশ্চিতকরণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী প্রাক-প্রাথমিকের শ্রেণিকক্ষসহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিবেশকে আকর্ষণীয়ভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে। এমন পরিবেশ শিশু-কিশোরদের ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করে। এতে করে তাদের মানসিক দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে এবং শিক্ষার প্রতি মনযোগী হবে।
প্রাক-প্রাথমিকের শ্রেণিকক্ষ সজ্জিতকরণে হাজীগঞ্জ মডেল ও অনুকরণীয় উল্লেখ করে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সাহাব উদ্দিন বলেন, সরকার প্রাক-প্রাথমিকের জন্য প্রতিবছর একটা বরাদ্দ দিয়ে থাকে। এছাড়া স্লিপের বরাদ্দ থেকে কিছু টাকা নিয়ে এবং স্থানীয় শিক্ষানুরাগীদের সহযোগিতায় প্রাক-প্রাথমিকের শ্রেণিকক্ষকে চমৎকার ও আকর্ষণীয় একটি পরিবেশে উপস্থাপন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এজন্য আমার এইউইও’রা (সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা) পরিশ্রম করেছেন, আমিও তাদের উৎসাহিত করেছি। তাদের পরিশ্রমে উপজেলার বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একটি সুন্দর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। যার ফলে প্রাক-প্রাথমিকে শিশু শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বেড়েছে এবং শিশুরাও একটি আনন্দঘন ও স্বস্তিদায়ক পরিবেশে পড়ালেখা করতে পারছে।
এসময় তিনি হাজীগঞ্জকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে একটি মডেল ও অনুকরণীয় উপজেলা হিসেবে অন্য উপজেলায় এই কার্যক্রম (প্রাক-প্রাথমিকের শ্রেণিকক্ষ সজ্জিতকরণ) ছড়িয়ে পড়বে বলে জানান।
১১ অক্টোবর, ২০২১।