পুরাণবাজারে গরিবের একমাত্র ভরসা বৌ-বাজার

স্টাফ রিপোর্টার
নিম্ন শ্রেণির মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যের বাজার চাঁদপুর শহরের পুরাণবাজার নতুন রাস্তা সংলগ্ন বৌ-বাজার। বাজারটি নিম্ন শ্রেণির মানুষের একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে। বাজারটি সকাল ৮টা থেকে শুরু হয়ে দুপুর ১২টা পর্যন্ত চলে। এখানে ২ শতাধিক ভ্রাম্যমাণ দোকানী নিত্য প্রয়োজনীয় পরসা সাজিয়ে বসে প্রতিনিয়ত। এই বাজারে ৫ টাকার তরকারি, ২০ থেকে ৫০ টাকার মাছ, ৫০ টাকার গোশত, ৫ টাকার মসলাসহ নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রয় হয়। বাজারটি গরিব, অসহায়, দিনমজুরসহ নিম্ন শ্রেণির মানুষের জন্য খুবই জনপ্রিয়। বাজারের বেশিরভাগ ব্যবসায়ীরা হলেন নারী, স্বামীহারা, প্রতিবন্ধী, বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা।
গতকাল সোমবার সকালে সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পুরাণবাজার নতুনরাস্তা সংলগ্ন বৌ-বাজারে ২ শতাধিক ভ্রাম্যমাণ নারী-পুরুষ ব্যবসায়ী রাস্তার দু’পাশে ড্রেনের ঢাকনার (স্লাব) উপর নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য কম দামে বিক্রি করছে। মোম ফ্যাক্টরী ও রিফিউজি কলোনীর বিধবা ও আসহায় নারীসহ নিম্ন শ্রেণির মানুষ তরি-তরকারি, মাছ ও মাংস কম দামে বিক্রি করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে। নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে সেখানে ভিড় করছেন নিম্ন আয়ের মানুষজন। এ বাজারের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো মানুষের চাহিদা অনুযায়ী কেনা-কাটা করতে পারা যায়।
গোশত ব্যবসায়ী আব্দুল শুক্কুর জানায়, আমি প্রতিদিন ৫২০ টাকা দরে বাজার থেকে গরুর গোশত কিনে এনে ৫৫০ টাকা করে বিক্রি করি। ২শ’ গ্রাম থেকে আড়াইশ’ গ্রাম গোশত নেওয়ায় খরিদ্দার বেশি। আবার কখনো ৫০ থেকে ১শ’ টাকার গোশতও বিক্রি করতে হচ্ছে।
তরকারি বিক্রেতা স্বামীহারা নয়ন বেগম ও শাহনাজ বেগম জানায়, বাজারে ৪০ টাকা করে বিক্রি করা কুমড়া এখানে ক্রেতার সাধ্য অনুযায়ী ১০ টাকারও বিক্রি করতে হয়। কম দামে আমরা তরকারি কিনে এনে কমেই বিক্রি করি। কারো কাছে হাত না পেতে নিজেরা নিজেদের সংসার পরিচালনা করি।
নার্গিস বেগম ও রানু জানায়, স্বামী লেবারের কাজ করতে গিয়ে আহত হয়ে এখন শয্যাসায়ী। আড়ত থেকে কম মূল্যে তরকারি এনে এখানে বিক্রি করি। বিক্রির টাকা থেকে যা আয় হয় তা দিয়ে সংসার চালাই।
পেঁয়াজ, আঁদা, রসুন ও আলু বিক্রেতা হালেমা বেগম ও রেহানা জানান, একজনের আয় দিয়ে সংসার চলে না। তাই পাশাপাশি এগুলো বিক্রি করি। ৫, ১০ ও ২০ টাকার খরিদ্দারই এখানে বেশি।
মাছ ব্যবসায়ী বাচ্চু, নাজিম উদ্দিন, খলিল শিকদার, শেলী আব্দুস ছাত্তার ও শেলী জানান, গরিব, অসহায়, দিনমজুরসহ নিম্ন শ্রেণির মানুষ এখানে বেশি। চাহিদা অনুযায়ী ৩০ থেকে ৫০ টাকার মাছও বিক্রি করতে হয়। কেজি পরিমাণ মাছ কিনার ক্রেতা এখানে কম।
বাজারে পণ্য ক্রয় করতে আসা মাসুদা বেগম, তাসলিমা বেগম, আক্কাস বেপারী, শহীদ ও জব্বার জানান, এই বাজার থেকে কম মূল্যে সাধ্য অনুযায়ী যে কোন মাছ, তরি-তরকারি, গোশত কিনতে পারি। যা বড় বাজারে গেলে পারা যায় না। বরং বড় বাজারের ব্যবসায়ীরা অল্প জিনিস কিনতে গেলে খারাপ আচরণ করে।
মুদি দোকানদার পারভেজ লস্কর জানায়, ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী ১০ টাকার ডাল, ৫ থেকে ১০ টাকার মশলা ও অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করতে হয়। এ এলাকায় যারা বসবাস করে সবাই দিনমজুর ও গরিব। তাই তাদের চাহিদা অনুযায়ী সদাই বিক্রি করতে হয়।
প্রতিবন্ধী কুট্টু ত্রিপুরা ও আনোয়ার হোসেন জানান, লেবারের কাজ করতে গিয়ে বস্তা চাপায় আহত হই। আড়ৎ থেকে কমমূল্য লেবু, পেয়াজ, রসুন এনে বিক্রি করে সংসার চালাই।
কাপড় ব্যবসায়ী বৃদ্ধ আরশাদ বেপারী জানান, বাসা-বাড়ি থেকে পুরাতন জামা কাপড় সংগ্রহ করে ২০ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি করি। তবে আজ একটাও বিক্রি হয় নাই।
স্থানীয় কয়েকজন এলাকাবাসী ও ব্যবসায়ীর সাথে কথা হলে তারা জানান, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এই বাজারটি অনেক জনপ্রিয়। এখানে সাধ্যের মধ্যে পণ্য বিক্রি করা হয়। এই রাস্তাটি দিয়ে পণ্য আনা নেয়ার জন্য ট্রাক-ভ্যান চলাচল করে। বাজার চলাকালীন সময়ে রাস্তায় যেন যান চলচলে কোন সমস্যা না হয় সেজন্য মো. সোহাগ সর্দার নামে একজন শ্রমিক রেখেছি শৃঙ্খলা ঠিক রাখতে। কিছু লোক বাকালী পট্টির বাজারের ব্যবসায়ীদের পক্ষ নিয়ে বিভিন্ন মহলে অভিযোগ করছেন, যাতে নিম্ন শ্রেণির মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যের বাজারটি যাতে উচ্ছেদ করে দেয়। তাতে ঐ ব্যবসায়ীরা বেশি দামের ফায়দা লুটতে পারবে।
পুরাণবাজারবাসীর দাবি, নিম্ন আয়ের মানুষের কথা চিন্তা করে এই বাজারটি যাতে উচ্ছেদ করা না হয়। বাজারটি সকাল ৮টা থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত চলে। এতে যানবাহন চলাচলের কোন সমস্যা হওয়ার কথা না। নিম্ন শ্রেণির মানুষের কথা চিন্তা করে বাজারটি সচল রাখতে সবার সহযোগিতা কামনা করেন স্থানীয়রা।
২৫ নভেম্বর, ২০২০।