ইল্শেপাড় রিপোর্ট
সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে গত ১০ অক্টোবর শেষ হলো চাঁদপুর পৌরসভা নির্বাচন। নির্বাচনের শুরুতেই প্রার্থীদের দৌঁড়-ঝাঁপ আর নানা প্রতিশ্রুতিতে মুগ্ধ ছিলো পৌর নাগরিকরা। নির্বাচনে সব প্রার্থীরাই একটি স্বপ্নের চাঁদপুরের প্রত্যাশার কথাও শুনিয়েছেন পৌর নাগরিকদের। বিশেষ করে এবারের নির্বাচনে মেয়র প্রার্থীদের নির্বাচনী ইশতেহারে ছিলো অনেকটাই দিক-নির্দেশনার মতো। ইশতেহারগুলোতে প্রার্থীদের দিক-নির্দেশনা ছিলো কিভাবে তারা গড়ে তুলবেন আগামির চাঁদপুরকে।
এদিকে নির্বাচিত মেয়র, সাধারণ কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলররা তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে অপেক্ষায় আছেন শপথগ্রহণের জন্য। তারপরই তারা পৌর নাগরিক সেবার মান উন্নয়ন ও আধুনিক চাঁদপুর গড়ে তোলার প্রত্যয়ে তাদের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে কাজ শুরু করবেন বলে আশাবাদী পৌরবাসী।
তবে এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত ও নৌকা প্রতীকের প্রার্থী অ্যাড. জিল্লুর রহমান জুয়েলের ইশতেহার ছিলো ‘ঐতিহ্য, বাণিজ্য ও পর্যটন নির্ভর নান্দনিক চাঁদপুর’। ফলে এমন প্রতিশ্রুতির কারণে তার দায়বদ্ধতাও বেড়ে গেছে বেশি- বলে পৌরবাসী দাবি করছেন। কারণ হিসেবে পৌরবাসী বলছেন, উন্নয়নের ধারবাহিকতা রক্ষার জন্যই মূলত নৌকা প্রতীকের প্রার্থীকে বিজয়ী করেছেন তারা।
এদিকে পৌরবাসী বলছে, তাদের আগের বিজয়ী প্রতিনিধিদের কাছ থেকে নেয়া অভিজ্ঞতা সুখকর ছিলো না। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আগের কোন জনপ্রতিনিধি’ই পৌরবাসীকে দেয়া কথা রাখেননি। এমন পরিস্থিতিতে এবারের মেয়র কাছে তাদের প্রত্যাশা বেশি।
কারণ হিসেবে তারা বলছেন, নির্বাচনে কেবল একজন রাজনৈতিক নেতাকে মেয়র হিসেবে বিজয়ী করা হয়নি, করা হয়েছে একজন পেশাজীবী আইনজীবীকেও। তিনি যেমন আইনের ভাষা বুঝেন, তেমনি বুঝেন জনগণের সাথে প্রতিশ্রুতি আর প্রতারণাটা কি?
অপরদিকে দেশের একটি অন্যতম বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই চাঁদপুর শহরটি বাণিজ্যিক কারণেই ১৮৯৬ সালের ১ অক্টোবর পৌরসভা হিসেবেই স্বীকৃতি পায়। তবে অভিযোগ আছে, সময়ের সাথে এগিয়ে যেতে না পাড়ায় কালের বিবর্তনে চাঁদপুর তার বাণিজ্যিক গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছে অনেক আগেই।
বর্তমানে সময়ের প্রয়োজনেই বাণিজ্যিক চাঁদপুর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। যার জন্য বাণিজ্যিক শহর প্রতিষ্ঠায় বিশেষ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নির্বাচিত পৌর পরিষদ কতোটা অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে, তা দেখার অপেক্ষায় পৌর নাগরিকরা।
এছাড়া চাঁদপুরের অভিশাপ খ্যাত নদী ভাঙন প্রতিরোধে শহর রক্ষা বাঁধটি স্থায়ীভাবে নির্মাণের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। এজন্য নির্বাচিত মেয়র নিতে পারেন গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত। যা বাস্তবায়নে চাঁদপুরের সব দল ও মতের মানুষের উন্মুক্ত মতামত নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে শহরকে রক্ষার পাশাপাশি বাণিজ্যিক ও পর্যটন শিল্পের জন্য যুগপোযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।
তবে নব-নির্বাচিত মেয়রের ইশতেহারে উল্লেখিত বড়স্টেশন ঐতিহ্যবাহী মাছ ঘাটটিকে আধুনিকায়ন করা। পাশাপাশি মাছ সংরক্ষণ, প্যাকেজিং ও প্রক্রিয়াজাতকরণে কমপ্লেক্স পুনঃর্নির্মাণ করে ঐতিহ্যবাহী ইলিশ রফতানিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করার উদ্যোগটি নিতে হবে অতি দ্রুত।
তবে পৌর নাগরিকরা বলছেন, চাঁদপুরের সাবেক জেলা প্রশাসক আবদুস সবুর মন্ডলের উদ্যেগে পর্যটন শিল্পের প্রসারে ব্র্যান্ডিং জেলা হিসেবে ‘ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর’ ইতোমধ্যে দেশে খ্যাতি অর্জন করেছে। তবে তা ধরে রাখাসহ নদীকেন্দ্রিক পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে এখনই। বড়স্টেশনের মোলহেড অংশটিকে আরো নান্দনিকভাবে গড়ে তোলা প্রয়োজন।
এজন্য নির্বাচিত মেয়রের ইশতেহারের উল্লেখিত প্রতিশ্রুতিগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রতিশ্রুতিগুলো ছিলো- পুরাণবাজার ও নতুনবাজার প্রান্তের নির্মিতব্য স্থায়ী বাঁধের দীর্ঘ অংশ জুড়ে রিভার ড্রাইভের পাশাপাশি সবুজায়ন, দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য শৈলী ও বসার স্থান নির্মাণ করা হবে। ডাকাতিয়া ও মেঘনা নদীতে ভাসমান রেস্তোরাঁ ও ওয়াটার বাস চালু করা, পৌরসভার অর্থায়নে তারকাখচিত একটি আধুনিক আবাসিক হোটেল নির্মাণ করা, যা দেশী-বিদেশী পর্যটকদের চাঁদপুরে অবস্থানকে নিরাপদ ও আকর্ষণীয় করতে সহায়তা করবে।
নান্দনিক চাঁদপুরের জন্য ইশতেহারের নির্বাচিত মেয়রের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রথমেই অগ্রাধিকার দিতে হবে, শহরের ঐতিহ্যবাহী এসবি খাল, বিদ্যাবতী খালের সংস্কার। পাশাপাশি নদীর সাথে সংযোগ স্থাপন করতে হবে পানির প্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য। সাথে খাল দখলদারকে আইনের আওতায় আনার জন্য সুশীল সমাজের মতামত গ্রহণ করতে হবে।
চাঁদপুর শহরের লেকগুলোর দৃষ্টিনন্দন করা, পাবলিক লাইব্রেরি, আর্কাইভ, মিনি অডিটোরিয়াম, জ্যেষ্ঠ নাগরিক ও নারীদের জন্য পৃথক ব্যবস্থাগ্রহণ। শহরকে অপ্রয়োজনীয় বিলবোর্ড মুক্ত করার সাথে চাঁদপুর শহরকে সবুজায়ন করা প্রয়োজন।
নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতকল্পে উদ্যোগ নিতে হবে- পৌরসভার সব কার্যক্রম প্রযুক্তি নির্ভর, পৌর এলাকাগুলো পর্যায়ক্রমে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা, ড্রেনেজ সিস্টেমে ব্যাপক সংস্কার, সড়কগুলো প্রশস্তকরণ ও ফুটপাথ পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা, যানজট নিরসনে একাধিক বিকল্প সড়ক নির্মাণ, সব সড়কেই এলইডি লাইট স্থাপন ও বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
এছাড়া অতিদ্রুত এ পৌরসভায় একটি আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প গড়ে তুলতে হবে। সাথে বর্জ্য সংগ্রহ ও ডাম্পিং পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। শহরের সব ডাস্টবিনগুলো অপসারণ করে দুষণমুক্ত করতে হবে। বর্ষা ও শীত মৌসুমের শুরুতেই মশক নিধনে কার্যকরী ব্যবস্থা, প্রতিটি ওয়ার্ডে আধুনিক পাবলিক টয়লেট স্থাপন করা প্রয়োজন।
অপরদিকে নকশা বহির্ভূত কোন স্থাপনা কিংবা ভবন নির্মাণে কঠোর প্রদক্ষেপ গ্রহণ করা অতিজরুরি। পৌর এলাকায় অবৈধ যান চলাচল বন্ধ করার পাশাপাশি নতুনভাবে অটোরিক্সার লাইসেন্স দেয়াও বন্ধ করতে হবে।
১৩ অক্টোবর, ২০২০।
- Home
- চাঁদপুর
- চাঁদপুর সদর
- প্রতিশ্রুত স্বপ্নের চাঁদপুর কত দূর?
