ফরিদগঞ্জে দলিল লেখক আরিফের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার
ফরিদগঞ্জ সাব রেজিস্ট্রার অফিসের যোগসাজে দলিল লেখক আরিফ হোসেনের প্রতারাণার অভিযোগ পাওয়া গেছে। আরিফের প্রতারণার শিকার ভুক্তভোগী মামুন হোসেনসহ একাধিক ব্যক্তি।
ফরিদগঞ্জ উপজেলার ভোটাল গ্রামের ভুক্তভোগী মামুন হোসেন জানান, আমি ফরিদগঞ্জ কেরোয়া মৌজা ১.৫ (দেড় শতাংশ) নাল জমি ক্রয় করি। ক্রয়কৃত জায়গায় আমার পার্শ্ববর্তী আস্টা গ্রামের দলিল লেখক মরহুম মোখলেছ ভেন্ডারের ছেলে দলিল লেখক আরিফ হোসেন (সনদ নং-১০৫) মাধ্যমে আমি ২০১৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ফরিদগঞ্জ কেরোয়া মৌজার (দেড় শতাংশ) জায়গায় ফরিদগঞ্জ সাব রেজিস্ট্রার অফিসে সাবকবলা দলিল রেজিস্টার করি। আরিফ ভেন্ডার সাথে ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা মূল্যে দলিল করার জন্য আমি তাকে নগদ ১ লাখ ৫ হাজার টাকা পরিশোধ করি। সে নিজ দায়িত্বে আমার দলিলটি ফরিদগঞ্জ সাব রেজিস্ট্রার অফিসে সাবকবলা রেজিষ্ট্রেশন করে দেয়।
দলিল করার পরবর্তীতে ২০১৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর আমি ফরিদগঞ্জ সাব রেজিস্ট্রার স্বাক্ষরিত অফিস কতৃক দলিলের অবিকল নকল কপি উত্তোলন করি (যার দলিল নং ৫৯২৭/১৬)। অবিকল নকল কপিতে দেখতে পাই আমার ক্রয়কৃত জায়গার মূল্য ৯ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে। তাৎক্ষণিক আরিফ ভেন্ডারের সাথে যোগাযোগ করি। আমি আপনাকে ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণ করে দলিল খরচ বাবদ ১ লাখ ৫ হাজার টাকা পরিশোধ করি, কিন্তু আমার ৫৯২৭/১৬ নং দলিলে কেনো টাকা কম উঠানো হয়েছে। দলিল লিখতে গিয়ে মিস্টেক হয়েছে। ‘সমস্যা নেই’ বলে সরি বলেন আরিফ।
ইতোপূর্বে আমার সাথে একেই মৌজা ও একই জায়গায় আরেক প্রতিবেশী ববিতা বেগম ২২ লাখ টাকার জমি ক্রয় করেন। আমি এবং ববিতা বেগম একই দিনে আরিফ ভেন্ডারকে দিয়ে দলিলের কাজ সম্পন্ন করি।
সে ববিতা বেগম ৪ বছর পর মূল দলিল হাতে পেয়ে দেখেন তার মূল দলিলে মাত্র ২ লাখ টাকা ক্রয়কৃত সম্পদের মূল্য দেখানো হয়েছে। তখনই আমি বিষয়টি জানতে পেরে আরিফ ভেন্ডার কাছে মূল দলিল চাইলে সে দলিল না দিয়ে বিভিন্ন টালবাহানা করতে থাকেন। পরে ২০২১ সালে ফরিদগঞ্জ সাব রেজিস্ট্রার অফিস থেকে মূল দলিলের নকল কপি সংগ্রহ করি। মূল দলিল নং ৫৯২৭ কপিতে দেখা যায় আমার সম্পত্তির মূল্য মাত্র ১ লাখ টাকা লেখা রয়েছে। ভুক্তভোগী বলেন, অফিসের যোগসাজশে এমন প্রতারণা হচ্ছে। নাহলে অফিস থেকে দেওয়া একই দলিল নম্বর ৫৯২৭নং অবিকল দলিলের নকল কপি ও মূল দলিল ৫৯২৭ নকল কপি ২ রকম হবে কিভাবে? পরবর্তীতে ২০২১ সালের ২৪ জানুয়ারি ববিতা বেগম ও আমি আরিফ ভেন্ডারের প্রতারণা অভিযোগে ফরিদগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রার বরাবর লিখিত অভিযোগ করি। সাব-রেজিস্ট্রার আশ্রাফুল ইসলাম বিষয়টি আমলে নিয়ে ফরিদগঞ্জ দলিল লেখক সমিতির সভাপতি হাছান রাজা পাটোয়ারীকে দায়িত্ব দেন সমস্যা সমাধানের জন্য। সভাপতি হাছান রাজা পাটোয়ারী ও সাব রেজিস্ট্রার অফিসের অফিস সহকারী আবুল বাসারসহ আরিফ ভেন্ডার ও আমাকে ববিতা বেগম নিয়ে ফরিদগঞ্জ দলিল লেখক সমিতি অফিস কক্ষে বৈঠকের আয়োজন করেন। ঐ বৈঠকে আরিফ ভেন্ডারের প্রতারণা বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় ঐ সালিসি বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়। আরিফ ভেন্ডার ভুক্তভোগী থেকে দলিলের জন্য যে টাকা নিয়েছে সে টাকা থেকে দলিলে উল্লেখকৃত টাকার সরকারি খরচ রেখে বাকি সম্পন্ন টাকা আমাদের ফেরত দেওয়ার। সে সিদ্ধান্ত মোতাবেক ববিতা বেগমকে ২০২১ সালে তার বাকি টাকা ফেরত দিলেও আমাকে আজ-কাল করে অদ্যাবধি একটি টাকাও দেয়নি আরিফ ভেন্ডার। উল্টো সে আমাকে বিভিন্ন ধরনের বাজে কথা বলে। ‘কে তোর দলিল করছে’ ‘কিসের টাকা’ এবং আমার নানা শ্বশুর আবুল হোসেন গাজী এখন সমিতির সেক্রেটারি, কিভাবে টাকা নেছ- বলে আমাকে হুমকি প্রদান করেন।
এ বিষয়ে অপর ভুক্তভোগী ববিতা বেগম জানান, আমার প্রতিবেশী আরিফ ভেন্ডার সাথে ফরিদগঞ্জ কেরোয়া মৌজা ক্রয়কৃত ৩ শতাংশ জায়গার মূল্য ২২ লাখ টাকা নির্ধারণ করে আরিফ ভেন্ডারকে আমি নগদ ২ লাখ টাকা দেই। ২০১৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ফরিদগঞ্জ সাব রেজিস্ট্রার অফিসে আমার জায়গায় সাবকবলা রেজিস্ট্রি করি এবং কিছু দিন পরে ফরিদগঞ্জ সাব রেজিস্ট্রার স্বাক্ষরিত অফিস থেকে দলিলের অবিকল নকল সংগ্রহ করি। সেখানেও দেখি ২২ লাখ টাকা মূল লেখা রয়েছে। কিন্তু ২০২১ সালে আরিফ ভেন্ডার থেকে অনেক কষ্টে মূল দলিল সংগ্রহ করার পর দেখি আমার দলিলে মাত্র ২ লাখ টাকা সম্পদের মূল্য দেখানো হয়েছে। তখনই আমি ফরিদগঞ্জ সাব রেজিস্ট্রার বরাবর আরিফ ভেন্ডারের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করি। অনেক হয়রানি ও গুড়াগুড়ির পর দলিল লেখক সমিতির সভাপতি হাছান রাজা পাটোয়ারী সমিতির অফিসে বৈঠকে করেন এবং আরিফ ভেন্ডারের প্রতারণার প্রমাণ পায়। আমার থেকে নেওয়া অতিরিক্ত টাকা ফেরতের ব্যবস্থা করেন। অফিসের যোগসাজে দলিল লেখক ও অফিসের কিছু অসাধু ব্যক্তির জন্য আমরা দলিল গ্রহীতারা এমন হয়রানিতে পড়ি। আমার অনুরোধ কোন দলিল গ্রহীতার সাথে যেনো এমন প্রতারণা না করে চক্রটি। সে বিষয়ে ব্যবস্থাগ্রহণ করতে আমি প্রশাসনের প্রতি আহবান জানাই।
এ বিষয়ে ফরিদগঞ্জ দলিল লেখক সমিতির সভাপতি হাছান রাজা পাটোয়ারী কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, ববিতা বেগম ও মামুন হোসেন আমাদের সমিতির দলিল লেখক আরিফ হোসেন (সনদ নং-১০৫) বিরুদ্ধে ফরিদগঞ্জ সাব রেজিস্ট্রার বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন ২০২১ সালের ২৪ জানুয়ারি। পরবর্তীতে সাব রেজিস্ট্রার আশ্রাফুল ইসলাম আমাকে দায়িত্ব দেন উভয় পক্ষকে নিয়ে অভিযোগটি সমাধান করে দিতে। অভিযুক্ত দলিল লেখক আরিফ হোসেন আমাদের দলিল লেখক সমিতির সেক্রেটারি আবুল হোসেন গাজীর নাতনি জামাই। পরবর্তীতে আমরা উভয় পক্ষকে নিয়ে সমিতির অফিস কক্ষে বৈঠকের আয়োজন করি। উভয় পক্ষের কথা শুনার পর আরিফ ভেন্ডার প্রতারণার প্রমাণ পাওয়া বিষয়টি এখানে সমাধান করতে সেক্রেটারি ও অনান্য সদস্যদের উপস্থিতে সিদ্ধান্ত হয়। দলিলে উল্লেখকৃত সম্পদের মূল্য অনুযায়ী সরকারি খরচ রেখে বাকি টাকা ববিতা বেগম ও মামুনকে ফেরত দেওয়ার। আরিফ ভেন্ডার উক্ত সিদ্ধান্ত একমত হয়ে তাদের টাকা ফেরত দিবেন বলেন শিকার করেন। উক্ত সিদ্ধান্তের বিষয়ে আমি সাব রেজিস্ট্রার আশ্রাফুল ইসলামকে অবগত করি। কিন্তু এখন জানতে পারি ববিতা বেগমের টাকা ফেরত দিলেও মামুন হোসেনকে কোন টাকা দেননি। আরিফ ভেন্ডার যে কাজটি করছে তা আমাদের দলিল লেখকদের জন্য সত্যি লজ্জা জনক।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও জানান, তার এমন প্রতারণার জন্য শাস্তি হিসেবে দলিল লেখক সনদ নবায়ন না করতে ফরিদগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রারকে অনুরোধ করি। আরিফ ভেন্ডারকে দীর্ঘদিন সমিতির অফিসে ঢুকতেও দেওয়া হয়নি বলেও জানান সমিতির সভাপতি হাছান রাজা পাটোয়ারী।
ফরিদগঞ্জ সাব রেজিস্ট্রার অফিস সহকারী আবুল বাসার কাছে সাব রেজিস্ট্রার স্বাক্ষরিত একই দলিল নম্বরের অবিকল নকল ও মূল দলিল ২টি দুই রকম ও গড়মিল হওয়ার কারণ কি? তিনি জানান, আমাদের কিছু নকলনবিসের দায়িত্ব অবহেলা এমন হতে পারে। তাদের আরও সতর্কভাবে কাজ করা উচিত ছিলো।
এ বিষয়ে ফরিদগঞ্জের সাব-রেজিস্ট্রার আশ্রাফুল ইসলাম কাছে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, দলিল লেখক আরিফ হোসেনের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে সে বিষয়ে দলিল সমিতি সভাপতির থেকে জানতে পারেন। আমি রোববার বদলি হয়ে নতুন কর্মস্থল সাভার সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে যোগদান করবেন।
সাব রেজিস্ট্রার অফিসে একই দলিল নম্বরের অবিকল নকল কপি ও পরবর্তীতে গ্রাহকের পাওয়া মূল দলিলে সম্পদের মূল্যের অমিল হওয়ার সুযোগ আছে কিনা- জানতে চাইলে প্রথমে তিনি না বলেন। কিন্তু যখন ভুক্তভোগী ববিতা ও মামুন গংদের দলিলের গড়মিল বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি তখন দায়িত্বে ছিলেন না বলে এড়িয়ে যান এবং কোন কথা বলতে চাচ্ছেন বলে জানিয়ে দেন।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত দলিল লেখক আরিফ হোসেনের বক্তব্যের জন্য তার অফিসে একাধিকবার গেলেও পাওয়া যায়নি। একাধিকবার ফোন করলেও রিসিভ করেননি তিনি।

১৮ ডিসেম্বর, ২০২২।