পরকীয়া সন্দেহের জের ও টাকার লোভে গলা কেটে হত্যা
নারায়ন রবিদাস
ফরিদগঞ্জে ফরিদ উদ্দিন ভূঁইয়ার হত্যা রহস্য উন্মাচন করছে পুলিশ। পাশাপাশি হত্যাকা-ে জড়িত সালাউদ্দিন (৪১) ও আ. ওহমান (২২) নামে দুইজনকে গ্রেফতার করেছে। এছাড়া হত্যাকা-ে ব্যবহৃত ধারালো বটিদা উদ্ধার করেছে পুলিশ।
আটক সালাউদ্দিনের প্রথম স্ত্রীর সাথে নিহত ফরিদ উদ্দিনের পরকীয়া প্রেমের জের ধরে ও ফরিদ উদ্দিনের মানিব্যাগে থাকা এক হাজার টাকার টাটকা ১০টি নোট আত্মসাৎ করার উদ্দেশেই ধারালো বটিদা দিয়ে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করে পালিয়ে যায় আটকরা। আলোচিত এ হত্যাকা-ের এমনই নির্মম স্বীকরোক্তি দিয়েছে তারা। সোমবার (১৮ এপ্রিল) দুপুরে পুলিশ সুপার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান পুলিশ সুপার মো. মিলন মাহমুদ।
এর আগে গত ১৫ এপ্রিল রাতে উপজেলার রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের ভূঁইয়া বাড়িতে নিজ বসতঘর থেকে ফরিদ উদ্দিনের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সালাউদ্দিন একই এলাকার মৃত গিয়াস উদ্দিন ভূঁইয়ার ছেলে ও আব্দুর রহমান পাশর্^বর্তী বাড়ির দেলোয়ার হোসেন ওরফে দেলুর ছেলে।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে পুলিশ সুপার মো. মিলন মাহমুদ উল্লেখ করেন, ফরিদ উদ্দিন ভূঁইয়া হত্যার ঘটনায় তার ভগ্নিপতি দুলাল চৌধুরী অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে ফরিদগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা করার পর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. রুবেল ফরাজী ঘটনার রহস্য উদঘাটন এবং আসামিদের গ্রেপ্তারে তৎপরতা চালান। এরপর প্রথমে ঘটনার সাথে জড়িত আব্দুর রহমানকে গাজীপুর জেলার বাসন থানা এলাকা থেকে আটক করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আব্দুর রহমান ঘটনার সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে এবং মূল আসামি সালাউদ্দিনের নাম ঠিকানা বলে দেয়। পরে তার দেয়া তথ্যানুযায়ী মূল আসামি সালাউদ্দিনকে ফরিদগঞ্জের নিজ বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
আটকরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকা-ের সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে জানায়, নিহত ফরিদ উদ্দিন ভূঁইয়া ও আটক সালাউদ্দিন ভূঁইয়া একই সাথে চলাফেরা করতো। সালাউদ্দিন ভূঁইয়া পেশায় একজন ড্রাইভার। তার দুই স্ত্রীর মধ্যে একজন চট্টগ্রামে এবং অপরজন ফরিদগঞ্জে থাকেন। সালাউদ্দিন তার প্রথম স্ত্রীর সাথে নিহত ফরিদ উদ্দিনের পরকীয়া প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে বলে সন্দেহ করতো।
ঘটনার আগের রাতে ফরিদ উদ্দিন ও সালাউদ্দিন বাড়ির পাশের দোকানে আইপিএল খেলা দেখছিল। এসময় সালাউদ্দিন ফরিদ উদ্দিনের মানিব্যাগে ১ হাজার টাকার ১০টি নতুন নোট দেখতে পায়। এই নতুন টাকা এবং পূর্ব শত্রুতার জেরে পার্শ্ববর্তী আব্দুর রহমানকে নিয়ে ফরিদকে হত্যার পরিকল্পনা করে সালাউদ্দিন।
ঘটনার দিন (১৫ এপ্রিল) শুক্রবার সকালে সালাউদ্দিন তার ৭ বছর বয়সী ছোট ছেলে আরাফাতকে ফরিদ উদ্দিনের বিল্ডিংয়ের ভেন্টিলেটর দিয়ে ঘরের ভিতরে ঢুকিয়ে দেয়। আরাফাত বিল্ডিং ঘরে ঢুকার পর পিছনের দরজা খুলে দেয়। পরে সালাউদ্দিন ও আব্দুর রহমান ফরিদের ঘরে ঢুকে আরাফাতকে ঘর থেকে বের করে দিয়ে ফরিদের শয়ন কক্ষের দরজায় নক করে ধারালো দা নিয়ে ওৎ পেতে থাকে। ফরিদ উদ্দিন শয়ন কক্ষের দরজা খুলে বাইরে বের হওয়া মাত্রই সালাউদ্দিন ফরিদকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। একপর্যায়ে ফরিদের ঘাড়ে ধারালো দা দিয়ে কোপ দেয়। ফরিদ মাটিতে লুটিয়ে পড়লে আব্দুর রহমান মৃতদেহ গুম করার জন্য তার শয়নকক্ষে তোষকের ভিতরে প্যাঁচিয়ে রাখে। এরপর আসামিরা ফরিদের মানিব্যাগ থেকে এক হাজার টাকার ১০টি নতুন নোট নিয়ে চলে যায়। বাইরে এসে সালাউদ্দিন তার সহযোগী আব্দুর রহমানকে ৫ হাজার টাকা দিয়ে ঢাকায় চলে যেতে বলে।
এরপর শুক্রবার (১৫ এপ্রিল) রাতে সালাউদ্দিন ফরিদের বিল্ডিংয়ের জানালা দিয়ে উঁকি মেরে ডাক-চিৎকার করতে থাকে ফরিদের ঘরে তার লাশ পড়ে থাকতে দেখা যায়। এরই একপর্যায়ে স্থানীয় এউপি চেয়ারম্যান শরীফ খান থানা পুলিশকে সংবাদ দেন। সংবাদ পেয়ে পুলিশ শুক্রবার রাতেই ফরিদের লাশ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। পরদিন সকালে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে।
অপরদিকে, শনিবার (১৬ এপ্রিল) রাতে নিহত ফরিদের ভগ্নিপতি দুলাল চৌধুরী বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে ফরিদগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা (নং ২৩, তারিখ ১৬/০৪/২০২২, ধারা ৩০২/২০১/৩৪) দায়ের করেন। এরপর পুলিশ আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে আব্দুর রহমানকে গাজীপুর জেলার বাসন থানা এলাকা থেকে সালাউদ্দিনকে ও ফরিদগঞ্জের নিজ বাড়ি থেকে আটক করতে সক্ষম হয়।
১৯ এপ্রিল, ২০২২।
