

প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমাদের স্বপ্নগুলো সব হাতের মুঠোয়
…………শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এমপি
সজীব খান/শাহ আলম খান
শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এমপি বলেছেন, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল শক্তি হয় সাবেক শিক্ষার্থীরা। তাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করলে অনেক সমস্যার সমাধান খুব সহজভাবে করা সম্ভব। দেশ-বিদেশে সব স্থানেই সাবেক শিক্ষার্থীদের দিয়ে প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয়। গতকাল শনিবার দুপুরে চাঁদপুর শহরের বাবুরহাট স্কুল ও করেজের ১২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রাক্তন ছাত্র পুনর্মিলনী দু’দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের সমাপনী দিনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অভিভাবকদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, এখন শিক্ষার্থীদের চাইতে বেশি প্রতিযোগিতা করেন তাদের বাবা ও মায়েরা। তারা নিজেরাই একটি সামাজিক চাপ তৈরী করেন। কার সন্তান জিপিএ ফাইভ পেলো কিংবা পেলো না এই নিয়ে যে অবস্থার সৃষ্টি করেন, তা গিয়ে আমাদের কোমলমতি শিশুদের উপরে গিয়ে পড়ে। জিপিএ-৫ পাওয়া জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হতে পারে না। জীবনের উদ্দেশ্যে হতে হবে আমি মানুষের মত মানুষ অর্থাৎ মূল্যবোধ সম্পন্ন হবো। আমার উদ্দেশ্যে হতে হবে অন্যের প্রয়োজনে তার পাশে দাঁড়ানো। কিন্তু আমরা এখন জিপিএ ফাইভের যাঁতাকলে শিশুদের পিষ্ট করছি।
শিক্ষামন্ত্রী আরো বলেন, আমরা এখন শিশুদের সারাক্ষণ বইয়ের মধ্যে ডুবিয়ে রাখছি। সামাজিক যোগাযোগ ব্যবহারের নামে চূড়ান্ত রকমের অসামাজিকের মধ্যে চলে যাচ্ছি। এটির কারণে আমাদের পরিবার পরিজন ও প্রিয় মানুষকে ভুলে যাচ্ছি। আমাদের এই দেশটি অসম্ভব দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। আজ আমাদের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমাদের স্বপ্নগুলো সব হাতের মুঠোয়। এক সময় আমাদের স্বপ্ন দেখারও সাহস ছিলো না আমরা পদ্মা সেতু বানাবো। যখন পদ্মা সেতু তৈরী কথা শুরু হয়, তখন অনেকেই আমাদের নিয়ে কটাক্ষ্য করেছিলেন। অথচ আজকে নিজেদের টাকায় পদ্মা সেতু তৈরী হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষিপ্ত হয়েছে। কর্ণফুলি নদীর নিচে ট্যানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র হচ্ছে।
তিনি বলেন, এখন আর আমরা স্বল্পোন্নত দেশ নই, আমরা এখন উন্নয়নশীল দেশ। বঙ্গবন্ধু কন্যা আমাদের যে স্বপ্ন দেখিয়েছেন যে ২০৪১ সালে আমরা উন্নত ও সমৃদ্ধশীল বাংলাদেশ হবো, সেটি আমরা নিশ্চয়ই হতে পারবো। আজকে সারা বিশ^ বাংলাদেশের উন্নয়ন বিস্ময়ের সাথে দেখছে এবং প্রধানমন্ত্রীকে বলছে আপনার এই উন্নয়নের ম্যাজিক কি? আমি বিশ^াস করি তার উন্নয়নের ম্যাজিক তার দেশপ্রেম। দেশের মানুষের প্রতি তার অকুণ্ঠ ভালোবাসা এবং তাঁর বাবার মতো তিনিও দেশ ও দেশের মানুষর প্রতি নিজেকে উৎসর্গ করে দিয়েছেন উন্নয়নের জন্য।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আমরা কোন টেবিলে বসে সমঝোতা করে এই দেশের স্বাধীনতা পাইনি। অনেক যুদ্ধ সংগ্রাম করে রক্ত দিয়ে কেনা আমাদের এই স্বাধীনতা। সেই স্বাধীনতাকে অর্থবহ করার জন্য প্রধানমন্ত্রী তার বাবার মতো নিরলস পরিশ্রম করে চলেছেন। আমি প্রায়ই বলি এখন আর আমাদের ভাষা, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য রক্ত দেয়া প্রয়োজন নেই। এখন প্রয়োজন আমাদের মেধা ও দক্ষতা অর্জন করা। আরই মেধা ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে দেশের জন্য কাজ করা। তা করতে পারলেই আমাদের দেশটা এগিয়ে যাবে। আসুন আমরা শপথ করি আমরা ভালোবাসা দিয়ে এই দেশটিকে এগিয়ে নিয়ে যাই।
তিনি আরো বলেন, আমাদের চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্য দক্ষতাসম্পন্ন জনশক্তি প্রয়োজন। আর সেই লক্ষ্যে আমরা শিক্ষার কারিকুল্যাম পরিবর্তন আনছি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় কাজ করছে। শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন পদ্ধতি পরিবর্তন আসছে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে। সব মিলিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়ন আমাদের প্রধান লক্ষ্য। আর সেই শিক্ষার মানোন্নয়নের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাব। আমরা শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য অনেক বিনিয়োগ করেছি, আরো বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা হবে। বাবুরহাট উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে বিগত দিনে অনেক উন্নয়ন হয়েছে, এখনো হচ্ছে, আগামিতেও হবে।
বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি শহীদ উল্যাহ মাস্টারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উদ্বোধকের বক্তব্য রাখেন এই প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন ছাত্র বাংলাদেশ পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী।
উদ্বোধকের বক্তব্যে বাংলাদেশ পুলিশের আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী বলেন, বাবুরহাট স্কুল ও কলেজের এই বড় ধরণের আয়োজন সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। আমি বিজয়ের মাসে আজকের এই অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে স্মরণ করছি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক জবঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। তিনি সেইদিন অনন্য সাধারণ নেতৃত্ব দিয়ে আমাদের বাংলাদেশ নামক ভূখন্ডটি উপহার দিয়েছেন। আমি বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি স্বাধীনতা অর্জনে জীবন উৎসর্গকারী অকুতভয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের। যাদের প্রাণের বিনিময়ে আমরা এই দেশটি পেয়েছি। আমি আরো স্মরণ করছি জাতীয় চার নেতাসহ যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আমাদের এই বিজয় অর্জন কাজ করেছেন।
তিনি বলেন, আমি বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে যোগ দিয়েছি, তাতে নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করি। কারণ স্বাধীনতা যুদ্ধের সাথে বাংলাদেশ পুলিশ অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত আছেন। আপনারা জানেন ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ কালো রাতে প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ গড়েছিলো আমাদের উত্তরসূরি পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা এবং তারা অকাতরে প্রাণ দিয়েছিলো। আমি আজকের এই অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে এই বিদ্যালয়ের পুরনো দিনের স্মৃতি মনে পড়ছে। আজ এই বাবুরহাটসহ চাঁদপুরের অনেক পরিবর্তন ও উন্নতি হয়েছে। আগে আমরা চাঁদপুরে আসার জন্য অনেক সময় লাগলেও এখন খুব দ্রুত সময় আসা সম্ভব হয়।
অভিভাবকদের উদ্দেশে ড. পাটওয়ারী বলেন, পৃথিবীতে অনেক মহান ব্যক্তি আছেন, যারা স্কুল-কলেজে না পড়েও অনেক ভালো অবস্থানে আছেন। সন্তানদের পড়া-শোনাই নয়, তাদের বাহ্যিক জ্ঞানের জন্যও অনুপ্রেরণা দিতে হবে। ক্লাশে প্রথম হলেই সাফল্য আসে না। সাফল্য সেটাই ভাল মানুষ হওয়া। আমি বলবো, আপনারা সন্তানদের ভাল মানুষ হওয়ার জন্য শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা দিন। পাশাপাশি বই পড়ার জন্য উৎসাহিত করুন। আপনার সন্তানের প্রতিভাকেও গুরুত্ব দিন।
সামাজিক যোগাযোগ সম্পর্কে আইজিপি বলেন, বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সন্তানদের একটি নেশার মত হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা নেশার চাইতেও খারাপ। মাদক আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম একই। বর্তমান প্রজন্ম থ্রিজি’র (ঘাড় গুজা জেনারেশন) মতো হয়ে গেছে।
প্রাক্তন ছাত্র ও চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি রহিম বাদশার পরিচালনায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী একেএম ফজলুল হক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হাসপাতালের প্রফেসর ডা. মো. হাবিবুর রহমান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ জামান, চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নাছির উদ্দিন আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম দুলাল পাটওয়ারী, সাংগঠনিক সম্পাদক তাফাজ্জল হোসেন এসডু পাটওয়ারী, শিক্ষা ও মানবসম্পদ বিষয়ক সম্পাদক অ্যাড. জিল্লুর রহমান জুয়েল, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নুরুল ইসলাম নাজিম দেওয়ান, চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি শহীদ পাটওয়ারী প্রমুখ।
অনুষ্ঠানের শুরুতে দ্বিতীয় দিনের কর্মসূচি বেলুন উড়িয়ে উদ্বোধন করেন প্রধান অতিথিসহ অতিথিবৃন্দ। আলোচনা পর্বের মাঝে দশ যুগপূর্তি উপলক্ষে একটি স্মরণিকা উন্মোচন করা হয়। দু’দিনব্যাপী অনুষ্ঠানে বর্ণাঢ্য র্যালি, স্মৃতিচারণ, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
