বাড়ছে চুরি-ছিনতাই হাজীগঞ্জে বিপিএল নিয়ে জুয়ার মহোৎসব


এস এম চিশতী :
বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ (বিপিএল) ক্রিকেট খেলা কেন্দ্র করে প্রশাসনের দৃষ্টি এড়িয়ে হাজীগঞ্জে জুয়ার মহোৎসবে মেতে উঠেছে এক শ্রেণির যুবক ও কিশোররা। এতে বাড়ছে চুরি ও ছিনতাই। শহর থেকে গ্রাম গঞ্জের অলিগলির ছোটখাটো চা দোকান থেকে শুরু করে বাজারের চাইনিজ হোটেল ও বাংলা হোটেলোর কেবিনেও চলছে বিপিএল নিয়ে জুয়ার আসর। কেবল ম্যাচে হার-জিত নিয়েই বাজি নয়, ওভারে ওভারে এমনকি বলে বলে বাজি ধরছেন ছোট-বড় সব বাজিকর। বিপিএল ম্যাচ যতই ফাইনালের দিকে গড়াচ্ছে ততই রমরমা হয়ে উঠছে জুয়ার আসর।
প্রতিদিন হাজীগঞ্জে ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকার হাতবদল হচ্ছে এসব আসরে। অনেকেই সর্বস্ব হারাচ্ছেন। এর আগেও বিপিএল ও ভারতীয় আইপিএল খেলা চলাকালীন সময়ে হাজীগঞ্জের বিভিন্ন অলি-গলিতে পুলিশ টহল দিয়ে তাদেরকে আটক করে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে সাজা প্রদান করেছিলো। এবার পুলিশের কোন টহল না থাকায় বেপরোয়া হয়ে উঠছে জুয়াড়িরা। ফলে বাড়ছে চুরি, ছিনতাই ও মাদক ব্যবসা।
অভিযোগ আছে, বিপিএল নিয়ে জুয়ার টাকা জোগাড় করতে না পেরে হাজীগঞ্জের অনেক যুবক এলাকা ছাড়া রয়েছে। আবার এক যুবক আত্মহত্যা পর্যন্ত করেছেন বলেও খবর রটেছে। সম্প্রতি ক্রিকেট খেলা নিয়ে জুয়ার আসরকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকার বাড্ডায় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র খুন হয়েছেন।
বিপিএলকে ঘিরে হাজীগঞ্জের হকার্স মার্কেট, পশ্চিম বাজারস্থ বিশ^ রোড, ডিগ্রি কলেজ রোড, স্টেশন রোড, কাপড়িয়া পট্টি ও হলুদ পট্টিতে কয়েজন প্রভাবশালী এ জুয়ার সাথে জড়িত রয়েছে।
বিপিএল জুয়ার সঙ্গে জড়িতরা বলেছেন, ম্যাচের পাওয়ার প্লেতে কত রান হবে, ৫ বা ১০ ওভারে কত রান হবে, কোন বলে ছক্কা হবে, কে কত উইকেট পাবে কিংবা খেলায় কোন দল জিতবে এসব নিয়ে হাজার টাকা থেকে লাখ টাকার বাজি ধরছেন জুয়াড়িরা। বেশির ভাগ জুয়াড়ি বিপিএলে বাজি ধরছে ‘বেট ৩৬৫’ সফটওয়্যার ব্যবহার করে। এটি বেশির ভাগ সময় শিক্ষিত জুয়াড়িরা ব্যবহার করে থাকেন।
খেলা শেষে কেউ কেউ পকেট ভর্তি করে বাসায় ফেরেন। আবার কেউ হয়ে যান নিঃস্ব। হাজীগঞ্জ পৌর এলাকার রিক্সাচালক, ট্যাক্সিচালক থেকে শুরু করে খেটে খাওয়া দিনমজুররাও জুয়ায় মেতে উঠেছেন। থেমে নেই বাস শ্রমিক-ট্রাক শ্রমিকরাও। এসব জুয়ার আসরে দিনে অন্তত ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা হাতবদল হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে।
এদিকে হাজীগঞ্জের কাপড়িয়া পট্টি ও হলুদ পট্টির এক ব্যবসায়ীর কাছে এসব জুয়ার টাকা জমা থাকে। যার কাছে জমা থাকে সে একটা কমিশন পায়। যারা জুয়া লাগিয়ে দেয় সেও একটা কমিশন পায়। এভাবেই নিঃস্ব হচ্ছে অনেকে। জুয়ার টাকা জোগাড় করতে না পেরে অনেক যুবকই ইয়াবা ব্যবসা ও মোটর সাইকেল চুরিতে নামছে। ফলে হাজীগঞ্জে সম্প্রতি সময়ে কোন না কোন দিন মোটর সাইকেল চুরি হচ্ছে। থেমে নেই বাসাবাড়িতে চুরিও।
হাজীগঞ্জে ১৫-২৮ বছর বয়সী কিশোর-যুবকরা ক্রিকেট জুয়ায় মেতে উঠছেন বেশি। ধনীর দুলালরা বাজি ধরেন মোবাইলের মাধ্যমে ক্ষুদে বার্তা দিয়ে। তাদের বাজি ধরার ধরনও ভিন্ন এবং বাজেটও বড়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাজিকর জানান, বিভিন্ন স্থানে বিপিএল ঘিরে গড়ে ওঠা অস্থায়ী জুয়ার আসরগুলোতে সর্বনি¤œ ২ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতবদল হচ্ছে। সন্ধ্যার পরপরই টিভি সেটের সামনে বিশেষ করে কাপড়িয়া পট্টি, হলুদ পট্টি ও হকার্স মার্কেটের বিভিন্ন টিভি সেটের সামনে জুয়াড়িরা ভিড় করছেন। বাজিকরদের মাধ্যম হিসেবে টাকা জমা, আদান-প্রদানসহ বাজি ধরার টাকা তাদের পছন্দের তৃতীয় ব্যক্তির কাছে জমা রাখা হয়।
‘জ’ নামে অপর এক জুয়াড়ি জানান, তিনি বলাখালে বিপিএল ক্রিকেট জুয়ায় বাজি ধরেন। প্রতিটি খেলায় ও প্রতিটি ওভারে বাজি ধরা হয়। তিনি বলেন, বাজি ছাড়া এখন বিপিএল ম্যাচ দেখতে ভালো লাগে না। সর্ট ভার্সনের ম্যাচ মানেই বাজি থাকতে হয়। না হয় খেলা দেখতে মন চায় না। ব্যাপক আকারে জুয়া ছড়িয়ে পড়ায় তা সামাজিক সমস্যায় রূপ নেয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এগুলো দ্রুত বন্ধ হওয়া জরুরি বলছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে ওই জ অদ্যক্ষরের ছেলেটি কোটি টাকার দেনাদার হয়ে এলাকা ছেড়ে পলাতক রয়েছে।
ক্রিকেট জুয়া প্রসঙ্গে হাজীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাং জাবেদুল ইসলাম বলেন, ক্রিকেট নিয়ে যারা জুয়া খেলছে আমরা ইতোপূর্বে এমন অনেককে আটক করেছি। তাদের মোবাইল কোর্টে সাজা প্রদান করে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। আবার অনেককে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অর্থদ- প্রদান করা হয়েছে। যেকোন জুয়ার ব্যাপারে পুলিশ জিরো টলারেন্স দেখাবে। বিপিএল খেলা চলার সময় যেখানে জটলা থাকবে পুলিশ সেখানেই হানা দেবে।