ধনাগোদা নদীর ভাঙনের শিকার দুই হাজার পরিবার
স্টাফ রিপোর্টার
চাঁদপুর সদর উপজেলার বিষ্ণপুর ইউনিয়নের দামোদরদী গ্রামসহ আশপাশের গ্রামের প্রায় দুই হাজার পরিবারের বাড়ি-ঘর ও ফসলি জমির ভাঙন ঠেকাতে সাড়ে ৭ হাজার বালির বস্তা ফেলার স্থলে ৫০টি বালু ভর্তি জিও টেক্সটাইল ফেলে ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ধরনের ফাঁকির মাধ্যমে ঠিকাদার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে যোগসাজশে কাজ করে সরকারের ২৭ লাখ টাকা ব্যয় বরাদ্দ ধরা হলেও সেখানে সামান্য কিছু বালু ভর্তি জিও টেক্সটাইল ব্যাগ ফেলে পুরো ২৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পাঁয়তারায় লিপ্ত রয়েছে বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ। এ ভাঙনস্থলে অস্থায়ীভাবে ৮০ মিটার নদী পাড়ে ৮০ কেজির সাড়ে ১১ হাজার এবং ১৭৫ কেজি ওজনের ৫ হাজার বালু ভর্তি জিও টেক্সটাইল ব্যাগ ফেলার কথা রয়েছে। এতে ২৭ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।
চাঁদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, ভাঙনস্থলে গতকাল মঙ্গলবার সাড়ে ৭ হাজার বালু ভর্তি জিও টেক্সটাইল ব্যাগ ফেলার জন্য সব ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছে। তার কথামত স্থানীয় সাংবাদিকরা মঙ্গলবার দুপুরে সেখানে গিয়ে ঠিকাদার ও সংশ্লিস্ট কর্তৃপক্ষের কাউকে পায়নি।
তখন সাংবাদিকরা মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, ঘটনাস্থলে থাকা একটি বিদ্যালয়ে সাড়ে ৭ হাজার ব্যাগ রক্ষিত আছে। কিন্তু সেখানে খালি অবস্থায় মাত্র ১৫০টি ব্যাগ পাওয়া যায়। এ ভাঙনস্থলে ২৭ লাখ টাকার বরাদ্দকৃত কোন কাজ না হলেও ঠিকাদারের পক্ষ নিয়ে স্থানীয় একটি অসাধু চক্র প্রচার করছে যে ধনাগোদা নদীর ভাঙন রক্ষায় ব্যাপক কাজ চলছে। আসলে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।
এলাকাবাসীর মধ্যে এ ধরনের চোরাগুপ্তা কাজ বন্ধ করে সঠিক কাজ করার জন্য তাদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করতে দেখা যাচ্ছে। এখানে বসবাসরত ও ভাঙনের শিকার ২ হাজার পরিবার যদি তাদের এ সঠিক কাজ ঠিকাদার কর্তৃক বুঝে না পায় বা না করে তাহলে তারা বড় ধরনের পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত রয়েছেন বলে জানান।
এদিকে দেখা যায় যে, বেশি স্রোতের কারণে চাঁদপুর সদর উপজেলার বিষ্ণপুর ইউনিয়নের দামোদরদী গ্রামসহ আশপাশের গ্রামের প্রায় দুই হাজার পরিবার বহু বছর ধরে ধনাগোদা নদীর ভাঙনের শিকার। সম্প্রতি সময়ে এই ভাঙন আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। নদীতে পানি বাড়লেই ভাঙন শুরু হয় এবং ফসলী জমিসহ বসতবাড়ি বিলীন হচ্ছে। ভাঙন প্রতিরোধে স্থায়ী বাঁধের দাবি জানিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামবাসী।
মঙ্গলবার (২৫ মে) সরেজমিন দামোদরদী গিয়ে দেখা গেছে, গ্রামের একমাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ভাঙনের হুমকির মুখে। নদীর খুবই নিকটে অবস্থান করছে বিদ্যালয়টি। পাশেই ছিলো মুক্তিযোদ্ধা আরিফ উল্যাহর বাড়ি। সেটিও কয়েকমাস আগে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এভাবে প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙনের শিকার হয়েছে বহু মানুষের বসতঘর এবং ফসলী জমি।
ভাঙন প্রতিরোধে এক মাস আগে চাঁদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড অস্থায়ী ভিত্তিতে বিদ্যালয় এলাকায় ৫০টি বালু ভর্তি জিও টেক্সটাইল ফেলে। কিন্তু ভাঙন প্রতিরোধে পুরোদমে এখনো কাজ শুরু হয়নি।
ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা ভাঙনের শিকার তৈয়ব আলী হাওলাদার বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৩ বার ভাঙনের শিকার হয়েছি। বর্তমান নদীর উত্তর পাশে আমাদের বাড়ি ছিলো। এখন কমপক্ষে আধা কিলোমিটার দক্ষিণে নদী চলে এসেছে। তারপরেও নদীর ভাঙন থামছে না। আমরা সরকারের কাছে ভাঙন প্রতিরোধে স্থায়ী বাধের দাবি করছি।
স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা সমির গোলদার বলেন, আমাদের দমোদরদী গ্রাম থেকে শুরু করে মতলব আড়ংবাজার খেয়াঘাট পর্যন্ত প্রায় দুই হাজারের বেশি পরিবার বসবাস করে। বর্তমানে ৪টি মসজিদ, ৩টি পাকা ব্রিজ, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বহু স্থাপনা নদী ভাঙনের হুমকিতে। ভাঙন প্রতিরোধে আমরা স্থানীয় সংসদ সদস্য ও শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির কাছে স্থায়ী বাঁধের দাবি জানিয়েছি।
ক্ষতিগ্রস্ত জুয়েল প্রধানিয়া ও মো. কামাল বকাউল বলেন, সম্প্রতি সময়ের ভাঙনে আমাদের বসতঘর নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে অন্যের আশ্রয়ে রাস্তার পাশে থাকতে হচ্ছে। অনেকেই এখন বাড়ি-ঘর ভেঙে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন।
দামোদরদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আবুল বাশার মিয়াজী বলেন, ভাঙন আতংকে সব সময় থাকতে হয়। নদীর নিকটবর্তী বিদ্যালয় হওয়ার কারণে নতুন ভবনের বরাদ্দও পাই না। বিদ্যালয়সহ হাজার হাজার পরিবার এখন ভাঙন হুমকিতে। স্থানীয় মন্ত্রী ও সরকারের কাছে আবেদন ভাঙন প্রতিরোধে যেন সরকার স্থায়ী বাঁধের ব্যবস্থা করেন।
এদিকে ভাঙন বেড়ে যাওয়ার কারণে এবং অস্থায়ী প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এমপির প্রতিনিধি চাঁদপুর সদর উপজেলা পরিষদ ভাইস চেয়ারম্যান আইয়ুব আলী বেপারী ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করছেন।
এ ব্যাপারে চাঁদপুর সহকারী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের সাথে তার কার্যালয়ে গিয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, ভাঙনস্থলে মঙ্গলবার সাড়ে ৭ হাজার বালু ভর্তি জিও টেক্সটাইল ব্যাগ ফেলার জন্য সব ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছিল। ঠিকাদার সেখানে বালু ভর্তি জিও টেক্সটাইল ব্যাগ না ফেলে ফাঁকি দিচ্ছে, তা আমাদের জানা ছিল না। আমাদের প্রতিদিনের রুটিন মত মঙ্গলবার সাড়ে ১৬ হাজার ব্যাগের মধ্যে সাড়ে ৭ হাজার বালু ভর্তি জিও টেক্সটাইল ব্যাগ ফেলার কথা ছিল। যেহেতু ঠিকাদার বালু ভর্তি জিও ব্যাগ ফেলেনি তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ ব্যাপারে ঠিকাদার আয়াত আলীর সাথে মুঠো ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমার সাইড দেখার জন্য লোক নিয়োগ রয়েছে। তারা সেখানে থেকে কেন সাড়ে ৭ হাজার বালু ভর্তি জিও টেক্সটাইল ব্যাগ ফেললো না তা’ আমি দেখছি। এ ব্যাপারে রিপোর্ট করার দরকার নেই। সাক্ষাতে কথা হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড চাঁদপুরের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী নকিব আল হাসান বলেন, সম্প্রতি ভাঙনের সংবাদ পেয়ে আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। অস্থায়ীভাবে ৮০ মিটার নদী পাড়ে ৮০ কেজির সাড়ে ১১ হাজার এবং ১৭৫ কেজি ওজনের ৫ হাজার বালু ভর্তি জিও টেক্সটাইল ব্যাগ ফেলা হবে। এতে ২৭ লাখ টাকা ব্যয় হবে। জরুরিভিত্তিতে খুব দ্রুত সময় এই কাজ করা হবে। ঠিকাদারকে দু’একদিনের মধ্যে কাজ শুরু করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এর বাইরে আমি কিছু বলতে পারবো না। এ কাজ তদারকির জন্য সদর এসও সহকারী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর হোসেনকে দায়িত্ব দেওয়া রয়েছে।
২৬ মে, ২০২১।
