
স্টাফ রিপোর্টার
মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলা মঞ্চে গতকাল রোববার ১০ম দিনে নিয়মিত আয়োজন হিসেবে মুক্তি যোদ্ধাদের স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন মুক্তিযুদ্ধকালীন বিমানবাহিনীর স্কোয়ার্ডেন লিডার মফিজুল ইসলাম।
তিনি বলেন, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ছিলো ব্যাপক পার্থক্য। তৎকালীন সময়ে শিক্ষাখাতে পূর্ব পাকিস্তানের বাজেট ৪৭ কোটি অপরদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের বাজেট ছিলো ১২৪ কোটি টাকা। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করলেও ক্ষমতা হস্তান্তর না করে উল্টো শুরু হয় নানা ষড়যন্ত্র। ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ডাকে আমি সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পরি। নিজ এলাকায় যুবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করি। আমরা খবর পেলাম পাকিস্তানি সৈন্যরা আমাদের বাড়ি রেইড দিবে। আমি এলাকা ছাড়লাম। খুঁজে-খুঁজে বিভিন্ন বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত বা চাকরিজীবী ১০ জনকে ম্যানেজ করে তাদের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ভারতের উদ্দেশে রওয়ানা দেই। এক পর্যায়ে মাগরিবের পর দেখি শত-শত লোক স্বতঃস্ফূর্তভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য প্রস্তুত। যার মধ্যে আমার স্কুলের ছাত্র ইলিয়াস ও মতিন তারা যেতে চাইছিলো, কিন্তু যেতে পারেনি। পরবর্তীতে চাঁদপুরের রঘুনাথপুর যুদ্ধে নিহত হয়।
তিনি তাঁর বক্তব্যে আরো বলেন, আমার সাথের ১০ জনের মধ্যে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। আমরা ৬ জন এখনো বেঁচে আছি। আমরা বক্সনগর ক্যাম্প স্মরণার্থী হয়ে নাম লেখিয়ে সারারাত হেটে হাজার হাজার মানুষ বর্ডার পার হয়ে মতিনগর ক্যাম্পে মেজর খালেদ মেশারফের কাছে রিপোর্ট করে অংশ নেই। যুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অনেক ত্যাগের। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করি। আমরা ছাত্রদের ট্রেনিং দেই। কথা একটাই বর্ডার এলাকায় তোমরা গিয়ে পাকিস্তানিদের গুলি করবে। তোমরা বর্ডারে গিয়ে পাকিস্তানিদের গুলি করবে। তাদের বুঝতে দিবে মুক্তিযুদ্ধ চলছে। মুক্তিযোদ্ধারা আছে। রব ও রফিক ভাই বিমানবাহিনী ছিলেন। বাঙালিরা এত চৌকস ও সাহসী এটা পাকিস্তানিরা কখনই দেখেনি। আমরা ক্যাম্প পরিবর্তন করতে থাকি। রাত ১২টা কী ১টা। বৃষ্টি হচ্ছে। তখন জুন মাস। বিমানবাহিনীর একটা সাদা চাদর গায়ে দিয়ে টিলার পাশে শুয়ে পড়লাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি একটি বিষধর সাপ আমার পাশে শুয়ে আছে। কিন্তু আমাকে কোন দংশন করেনি। বিষাক্ত প্রাণিটি বুঝেছে আমরা বিপদে আছি। আমরা বেশিরভাগ সময় থাকতাম খালি গায়ে। জুন মাসের শেষের দিকে আমাদের ক্যাম্প পরিদর্শন করলেন কর্নেল ওসমানী, মিজানুর রহমান চৌধুরী ও মতিয়া চৌধুরী। কর্নেল ওসমান বলেলন, তোমাদের জন্য বিমানবাহিনী গঠন করা হচ্ছে। কুমিল্লার প্রফেসর খোরশেদ আলম রেকি করতে গেলেন পাকিস্তানিদের ক্যাম্প। খালের ভেতর দিয়ে তার নেতৃত্বে আমরা গিয়ে ওই ক্যাম্পে গুলি ছুড়ি। আমরা যুদ্ধকালীন সময়ে পাথরভর্তি ভাত খেতাম। যুদ্ধ চলছে একদিন এক আনা দিয়ে মুরগি কিনে রান্না করছি। এমন সময় গুলি শুরু হলো কোথায় গেল রান্না করা মুরগি বুঝতে পারিনি। রাত ১২টায় এলএমজি নিয়ে চলে যাই এক ছাড়াবাড়িতে। সেখানে আমাদের যুদ্ধ চলে। এভাবে ৯ মাস যুদ্ধ করে এ দেশকে শত্রু মুক্ত করি। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের আরও বহু স্মৃতি রয়েছে। যা বলে শেষ করা যাবে না।
বিজয় মেলা স্টিয়ারিং কমিটির সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা মহসিন পাঠানের সভাপতিত্বে ও মুক্তিযোদ্ধা মো. সানাউল্লাহ খানের পরিচালনায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন তপন সরকার। উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা ওয়ারেন্ট অফিসার মো. হাফিজুর রহমান।
স্মৃতিচারণ শেষে সাংস্কৃতিক পরিষদের ব্যবস্থাপনায় সপ্তরূপা নৃত্য শিক্ষালয়ের মনোজ্ঞ নৃত্যানুষ্ঠান পরিবেশিত হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতেই বিজয় মেলার কর্মকর্তারা সপ্তরূপা নৃত্য শিক্ষালয়ের অধ্যক্ষ অনিমা সেন চৌধুরীর কাছে স্মারক ক্রেস্ট প্রদান করেন। নৃত্যানুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশন করে প্রান্তিকা, ইফতেদা, তমা, সূতি, আউশি, সম্পূর্ণা, আরাধা, আকিবা, আহরিমা, তানজিলা, তানহা, জুথি, বীরেন সাহা, জুয়েল ও প্রদীপ।
ক্রেস্ট প্রদান শেষে স্বাগত বক্তব্য রাখেন চাঁদপুর সাহিত্য একাডেমির মহাপরিচালক রোটারিয়ান কাজী শাহাদাত।
