সমলয়ে কৃষি লাল-সবুজের হাসি

মতলব উত্তর ব্যুরো
দেশে বোরো ধান চাষের মৌসুম চলছে। এ বছর জ্বালানি তেল ও সারের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় মতলব উত্তর উপজেলায় বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। চাষিরা বলছেন, বোরো চাষে সেচ বেশি লাগায় চাষের খরচ বেড়ে যাবে। ফলে বর্তমান বাজারদরে ওই ধান বিক্রি করে লোকসান হবে। তবে এতসব শঙ্কার মধ্যেও আশার আলো দেখাচ্ছে সমলয় পদ্ধতিতে বোরো চাষের পরিকল্পনা।
কৃষিকে আধুনিকায়ন ও যান্ত্রিকীকরণে এ বছর উপজেলায় প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় সমলয় পদ্ধতিতে বীজতলা করেছেন চাষিরা। মতলব উত্তর উপজেলার গজরা ও ছেংগারচর পৌরসভার রুহিতারপাড় এলাকায় পরীক্ষামূলক এই বোরো বীজতলা স্থাপন করা হয়েছে। সুস্থ-সবল ধানের চারা নিশ্চিত ও কৃষকের খরচ কমাতে কৃষি বিভাগের সমলয় পদ্ধতির এই বীজতলা, ধান রোপণ ও কর্তন এখন চাষিদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
সমলয় পদ্ধতিতে একেকটি বীজতলায় ৪শ’ কেজি উচ্চ ফলনশীল বোরো ধানের বীজ দিয়ে সাড়ে চার হাজার ট্রেতে বীজতলা স্থাপন করা হয়েছে। সমলয় বীজতলায় উৎপাদিত প্রতিটি প্রকল্পের চারা দিয়ে ৫০ একর জমিতে ধান রোপণ করা যাবে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। এই পদ্ধতির বীজতলায় ধানের চারা হবে সুস্থ-সবল। প্রচলিত পদ্ধতির চাষাবাদের চেয়ে আধুনিক সমলয় পদ্ধতিতে পরিকল্পিত উপায়ে প্রযুক্তিগত চাষাবাদে খরচ কমবে কমপক্ষে ৪০ থেকে ৫০ ভাগ। ফলন বাড়বে অন্তত ২০ ভাগ।
সমলয় নীতিমালা অনুযায়ী, কৃষক নির্বাচন, তাদের অগ্রাধিকার তালিকা প্রস্তুত ও অনুমোদন, উপকরণ বিতরণ এবং চাষাবাদ কার্যক্রম বাস্তবায়নে গবেষণা প্রতিষ্ঠানের আঞ্চলিক কার্যালয়ের আওতাধীন এলাকায় আঞ্চলিক কার্যালয় এবং অন্যান্য এলাকায় উপ-পরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে ব্লকের এসএএও, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা সম্পন্ন করবেন। প্রদর্শনী বাস্তবায়নে ব্রি/বিনা/গম-ভুট্টা গবেষণাসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নতুন জাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিগত ৫ বছরের মধ্যে ছাড়কৃত/নিবন্ধনকৃত বিভিন্ন ফসলের জাতগুলোকে প্রাধান্য দিতে হবে।
সমলয় চাষাবাদের আওতায় উৎপাদিত মানসম্পন্ন বীজ উপযুক্ত মূল্যে কিনে পরবর্তী মৌসুমে তা সমলয়ভুক্ত নতুন কৃষকের মাঝে বিতরণ করা যেতে পারে। সমলয় চাষাবাদে অন্যতম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ট্রেতে ম্যাট টাইপ ধানের চারা উৎপাদন। এ পদ্ধতিতে বীজতলা তৈরি না করে পলিথিন অথবা ফ্লেপিবল ট্রেতে চারা তৈরি করা হয়। এজন্য রোপণের পরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন তারিখে বীজ বপন করতে হয়। তাতে ৩:২ অনুপাতে মাটি ও গোবরের মিশ্রন ব্যবহার করা হয়। এরপর বীজ ছিটিয়ে পুনরায় অর্ধেক মাটি ও গোবর মিশ্রণ দিয়ে সমতল জায়গায় রেখে পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখা হয়। বীজতলা তৈরির তিন দিনের মধ্যে অঙ্কুর বের হয়। যদিও ম্যাট টাইপ চারা উৎপাদন কৃষকদের কাছে কিছুটা জটিল বলে মনে হয়, তবে সমন্বিত উদ্যোগে সফলভাবেই ম্যাট টাইপ চারা উৎপাদন করা সম্ভব।
ট্রেতে বীজ বপনের আগে অ্যাজোপিট্রবিন অথবা পাইরাক্লোস্ট্রবিন গ্রুপের ছত্রাকনাশক যেমন- এমিস্টারটপ অথবা সেলটিমা (প্রতি কেজি বীজের জন্য ২-৩ মিলি লিটার) দিয়ে ১৮-২০ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখতে হবে। এরপর পরিস্কার পানি দিয়ে ধুয়ে জাগ দিতে হবে। প্রতি ট্রেতে জাত অনুসারে ১২০-১৪০ গ্রাম বীজ বপন করতে হবে। বীজ এমনভাবে ফেলতে হবে যাতে প্রতি সেন্টিমিটারে দু’তিনটি চারা থাকে। ট্রের চারায় রোগবালাই দেখা দিলে এমিস্টারটপ অথবা সেলটিমা দু’তিন মিলিলিটার পানিতে মিশিয়ে ভালোভাবে স্প্রে করতে হবে। স্প্রে করার পর আনুমানিক ৬ ঘণ্টা ট্রেতে সেচ দেওয়া যাবে না। সমভাবে বীজ ছিটানোর পর হালকাভাবে এক স্তর মাটি দিতে হবে। বেশি পুরু করে মাটি দেওয়া যাবে না। বোরো মৌসুমে ২৫-৩০ দিনের চারা এবং আউশ ও আমন মৌসুমে ১৫-২০ দিনের চারা রোপণ করতে হবে। অর্থাৎ চারার উচ্চতা আনুমানিক ১৫ সেন্টিমিটার হতে হবে। এই পদ্ধতিতে ২০ থেকে ২৫ দিনের মধ্যে চারা বেড়ে ওঠে। পরে রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের মাধ্যমে চারা রোপণ করা হয়। তবে হাতে রোপণ করলেও সারিবদ্ধভাবে চারা রোপণ করতে হবে যেন আন্তঃপরিচর্যা সহজ হয়।
মতলব উত্তর উপজেলার মৈশাদী গ্রামের চাষি আলী হোসেন বলেন, এতসব সমস্যার মধ্যেও এবার সমলয় পদ্ধতির বোরো চাষ আমাদের সফলতায় আশা জাগাচ্ছে। পদ্ধতিগত বীজতলায় সুস্থ-সবল চারা পাচ্ছি। ধান রোপণ, কাটা ও মাড়াই করা হবে মেশিনে। ফলে চাষে খরচ অনেক কমে যাবে। আমরা ভালো লাভবান হবো বলে আশা করছি।
মতলব উত্তর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বলেন, বোরো চাষে খরচ কমাতে কৃষিকে প্রযুক্তিভিত্তিক করা হচ্ছে। যাতে কৃষকের খরচ কম হয়। এবার সমলয় পদ্ধতিতে বোরো চাষ হচ্ছে। এ প্রকল্পের আওতায় বোরো আবাদের বীজতলা থেকে শুরু করে রোপণ, কাটা ও মাড়াই পর্যন্ত প্রযুক্তি ও আধুনিক কৃষিযন্ত্রের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে। তাই বোরা ধান উৎপাদন খরচ কমবে আর ফলন হবে বেশি।

১৬ জানুয়ারি, ২০২২।