সৌদিতে হাজীগঞ্জের নয়নের আত্মহত্যা

ঋণের ৫ লাখ টাকা ও দু’শিশু সন্তানকে নিয়ে অন্ধকারে বিধবা

মোহাম্মদ হাবীব উল্যাহ
জীবিকার তাগিদে ও পারিবারিক সচ্ছলতার আশায় গত বছরের এপ্রিল মাসে ৫ লাখ টাকা ঋণ করে সৌদিআরবে যান হাজীগঞ্জের মো. আরিফুল ইসলাম নয়ন (২৮) নামের এক যুবক। কিন্তু হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে বছর শেষের আগেই মৃত্যুর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে পরপাড়ে পাড়ি দিলেন তিনি। গত ২১ ফেব্রুয়ারি দুপুরে তিনি সৌদিআরবের দাম্মাম শহরের নিজ বাসার ছাদে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন।
এতে করে ঋণের ৫ লাখ টাকা ও দু’কন্যা শিশু সন্তানকে নিয়ে শুধুই অন্ধকার দেখছেন বিধবা স্ত্রী মাহিনুর বেগম। বিষয়টি জানতে পেরে বুধবার (২২ ফেব্রুয়ারি) ওই যুবকের বাড়িতে যান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাশেদুল ইসলাম। তিনি মৃতের বাবা-মা ও স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যদের সান্ত¡না দেন এবং ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক সহযোগিতা করেন। পরবর্তীতে সরকারিভাবে সর্বোচ্চ সহযোগিতার আশ^াস দেন তিনি।
মো. আরিফুল ইসলাম নয়ন হাজীগঞ্জ উপজেলার বাকিলা ইউনিয়নের দক্ষিণ শ্রীপুর গ্রামের মো. সিরাজুল ইসলাম খানের ছোট ছেলে। তার মা-বাবা ও স্ত্রীসহ নুহা নামের ৭ বছর ও নুসাইবা নামের ২ বছরের দু’শিশু সন্তান রয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ওই ইউপির চেয়ারম্যান মো. মিজানুর রহমান মিলন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ৫ লাখ টাকা ঋণ করে ফ্রি ভিসায় গত বছরের এপ্রিল মাসে তার ছোট ভায়রা কচুয়া উপজেলার উজানী গ্রামের বাসিন্দা ইব্রাহিমের মাধ্যমে সৌদিআরবে যান আরিফুল ইসলাম নয়ন। সেখানে দু’মাস ভায়রার সাথে থাকার পর তিনি অন্যত্র চলে যান। ভারতীয় মালিকের অধীনে নতুন কর্মস্থলে আকামা (কাজের অনুমতিপত্র) না হলেও প্রথম পাঁছ-ছয় মাস কোনো মতে চলে যায়। কিন্তু শেষ দু’মাস তিনি হতাশায় ভুগছিলেন।
তার স্ত্রী মাহিনুর বেগম জানান, মালিক তার পাসপোর্ট নিয়ে গেছে। অনেক চেষ্টা করেও তিনি আকামা (স্থায়ী প্রত্যয়ন) যোগাড় করতে পারেননি। এর মধ্যে হঠাৎ করে অসুস্থ (প্রচ- মাথা ব্যাথা) হয়ে পড়েন এবং শেষ দু’মাস তিনি বেতনও পাননি। আবার ঋণের টাকা পরিশোধের জন্য পাওনাদাররাও তার সাথে যোগাযোগ করেছেন। সবশেষ গত এক সপ্তাহ ধরে তিনি মাথা ব্যথায় ভুগছিলেন। বিষয়টি তিনি মালিককে জানালে, উল্টো মালিক তাকে বকাঝকা করেন।
তিনি বলেন, পাসপোর্ট, আকামা ও টাকা না থাকায় তিনি বাসা থেকে বের হতে পারেননি। তাই চিকিৎসাও হয়নি। খাওয়া-দাওয়ায়ও কষ্ট পেয়েছেন। ঋণের টাকা পরিশোধ ও সংসার খরচ নিয়েও তিনি দুঃশ্চিন্তা করতেন। সোমবার দুপুরে তিনি আমাকে ও আমার আত্মীয়-স্বজনকে ফোন দিয়ে জানান, তিনি মরে যাবেন। এরপর আমার সাথে কথা বলা অবস্থায় তিনি ফোন কেটে দেন। পরে জানতে পারি, তিনি গলায় ফাঁস দিয়েছেন। এসময় তিনি কিভাবে ঋণের টাকা পরিশোধ এবং দু’শিশু সন্তানকে নিয়ে কী করবেন- এই বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
এদিকে এ বিষয়ে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান মিলন জানান, ফেসবুকে লাইভের মাধ্যমে নয়নের আত্মহত্যার বিষয়টি জানতে পারি। পরে আমি তার সাথে ফোনে যোগাযোগ করি এবং সৌদিআরবে থাকা আমার ইউনিয়নের অন্যদের তার (নয়ন) সাথে যোগাযোগ করার জন্য বলি। তিনি বলেন, আমি তাকে বার-বার বলেছি, সে যেনো ফাঁসি না দেয়। তার এবং তার পরিবারের সবকিছু আমি দেখব। কিন্তু সে আমার কথা শুনেনি। আমি উপায়ন্ত না দেখে তার কাছে লোক পাঠিয়েছি। কিন্তু তারা গিয়ে তাকে জীবিত পায়নি। তিনি জানান, এলাকার লোকজন তার কাছে যেতে সময় লেগেছে। এর মধ্যে সে বাসার ছাদে গিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে।
এদিকে আরিফুল ইসলাম নয়নের মারা যাওয়ার খবর পেয়ে বুধবার দুপুরে নিহতের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তার সন্তানদের খোঁজখবর নিয়ে স্ত্রী আর বাবা-মাকে সান্ত¡না দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাশেদুল ইসলাম। এসময় তিনি ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করেন এবং স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের মাধ্যমে নয়নের পরিবারকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা প্রদানের কথা বলেন। পরবর্তীতে সরকারি সুযোগ-সুবিধাসহ উপজেলা পরিষদ ও প্রশাসন থেকে আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩।