৬৬ শিক্ষার্থীর জন্য সরকারের বার্ষিক ব্যয় ১৬ লাখ টাকা
অনিয়মের মাধ্যমে স্লিপ, রুটিন মেইটেনেন্স ও প্রাক-প্রাথমিকের ১ লাখ টাকা উত্তোলন।
ম্যানেজিং কমিটির ৯টি সভায় সভাপতির অনুপস্থিতি।
ঈদুল আজহার পর কোন সভা না হলেও রেজুলেশনে চলতি মাসে দুইটি সভা দেখানো হয়েছে।
সহ-সভাপতির স্বাক্ষরের ভিন্নতাসহ নানা অনিয়ম।
মাত্র ৪ বছরে অর্ধেকে নেমে এসেছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা।
মোহাম্মদ হাবীব উল্যাহ্
হাজীগঞ্জের ১৫২নং কাইজাংগা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কাগজে-কলমে ভর্তিকৃত মাত্র ৬৬ জন শিক্ষার্থীর জন্য সরকারের বার্ষিক ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১৬ লাখ টাকা। মাত্র ৪ বছরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা নেমে এসেছে অর্ধেকে। মাস শেষের হিসাব কষছেন, আর বেতন নিচ্ছেন। অথচ শিক্ষার্থী বৃদ্ধির প্রতি মনযোগ না দিয়ে, অনিয়মের প্রতি মনযোগ দিয়েছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সেলিম খাঁন। যার ফলে এই বিদ্যালয়ে অনিয়ম এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। বিদ্যালয়টি উপজেলার বড়কুল পূর্ব ইউনিয়নের কাইজাংগা গ্রামে অবস্থিত।
জানা গেছে, বিদ্যালয়ে চলতি বছর স্লিপের ৫০ হাজার, রুটিন মেইনটেন্সের ৪০ হাজার এবং প্রাক-প্রাথমিকের ১০ হাজার টাকাসহ মোট ১ লাখ টাকা বরাদ্দ এসেছে। নিয়ম অনুযায়ী রেজুলেশন ও বিদ্যালয়ের সভাপতির স্বাক্ষর ছাড়া ব্যাংক থেকে এ টাকা তোলা যাবে না। বিদ্যালয়ের সভাপতি ফয়েজ মো. জহির উদ্দিন প্রবাসে (আমেরিকা) রয়েছেন। যার ফলে বিদ্যালয়ে তার উপস্থিতি নেই। অথচ সভাপতির স্বাক্ষর ছাড়াই প্রধান শিক্ষক বরাদ্দের টাকা তুলে নিয়েছেন।
আবার বরাদ্দকৃত টাকা দিয়ে বিদ্যালয়ের রঙয়ের কাজ ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোন কাজ করা হয়নি। প্রধান শিক্ষক বলেছেন, রঙয়ের কাজ ৩৭ হাজার টাকায় সম্পন্ন করা হয়েছে। যদিও কাজ চলমান। বাকি টাকা দিয়ে শিশু শ্রেণির শিক্ষা উপকরণ এবং শিক্ষকদের জন্য পাঠ উপকরণ ক্রয় করেছেন। অথচ শিক্ষা ও পাঠ উপকরণে সর্বোচ্চ ১৫-২০ হাজার টাকার বেশি ব্যয় হওয়ার কথা নয়।
বিদ্যালয়ের রেজুলেশন বইতে দেখা গেছে, চলতি মাসসহ গত ৮ মাসে বিদ্যালয়ে ম্যানেজিং কমিটির ৯টি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভাগুলোর তারিখ যথাক্রমে ২৪ জানুয়ারি, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০ মার্চ, ২৮ এপ্রিল, ২৫ জুন, ২১ জুলাই, ২৪ আগস্ট, ৮ সেপ্টেম্বর ও ১৮ সেপ্টেম্বর। সভাপতির উপস্থিতি না থাকার কারণে সহ-সভাপতি সবকটি সভায় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। সভাপতির নামের পাশে স্বাক্ষরের স্থান ফাঁকা রয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী সভাপতির অনুপস্থিতিতে সহ-সভাপতি সভায় সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। কিন্তু তিনি আর্থিক লেনদেন করতে পারবেন না। অথচ প্রধান শিক্ষক সভাপতির স্থলে সহ-সভাপতি স্বাক্ষর নিয়ে বিদ্যালয়ের সরকারি বরাদ্দকৃত টাকা তুলে নিয়েছেন। এছাড়াও নিয়ম অনুযায়ী পর-পর তিন সভায় ম্যানেজিং কমিটির কোন সদস্য উপস্থিত না থাকলে তার পদ শূন্য হয়ে যায়। এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক পরবর্তী ব্যবস্থাগ্রহণ করবেন। কিন্তু তিনি গত ৮ মাসেও কোন ব্যবস্থা নেননি।
ঈদুল আজহার পরবর্তী সময়ে (১২ আগস্ট থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) বিদ্যালয়ে পরিচালনা পর্ষদের কোন সভা হয়নি বলে জানিয়েছেন সভাপতির দায়িত্ব পালনকারী সহ-সভাপতি আনোয়ার মিজি, প্রধান শিক্ষক, শিক্ষক প্রতিনিধিসহ দু’জন সহকারী শিক্ষক। অথচ রেজুলেশন বইতে চলতি (সেপ্টেম্বর) মাসে দু’টি সভা দেখানো হয়েছে।
যেদিন সংবাদকর্মীরা বিদ্যালয় পরিদর্শনে গেছেন সেদিন সকালেও (১৮ সেপ্টেম্বর) একটি সভা দেখিয়েছেন প্রধান শিক্ষক। অথচ প্রধান শিক্ষক নিজেই বলেছেন, এদিন কোন সভা হয়নি। এছাড়া রেজুলেশনে সহ-সভাপতির উপস্থিতির স্বাক্ষরে ভিন্নতা রয়েছে (একেকটা একেক রকম)।
বিদ্যালয়ে নেই পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী। মাত্র ৬৬ জন শিক্ষার্থী নিয়ে চলছে বিদ্যালয়টি। প্রধান শিক্ষকসহ ৫ জন শিক্ষক রয়েছেন বিদ্যালয়ে। জানা গেছে, ১৯৯৯-২০০০ খ্রিস্টাব্দে বিদ্যালয়টি চালু হওয়ার পর ওই বছর একতলা ভবন নির্মাণ করা হয়। বিদ্যালয়ে রয়েছে ছোট-বড় চারটি কক্ষ। একটি কক্ষে অফিস এবং অপর তিনটি কক্ষে প্রাক-প্রাথমিকসহ অন্যান্য শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
শুরুর দিকে এবং জাতীয়করণের আগে বিদ্যালয়ে প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষার্থী ছিলো। কিন্তু জাতীয়করণের পরবর্তী সময় থেকে আশংকাজনক হারে কমতে থাকে। গত চার বছরে অর্ধেকে নেমে এসেছে শিক্ষার্থী। বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিলো ১শ’ ৩৮ জন। ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে ৬৭ জন। ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে ৭২ জন, ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে ৭১ জন এবং চলতি বছরে মাত্র ৬৬ জন শিক্ষার্থী নিয়ে চলছে পাঠদান কার্যক্রম। যদিও কাগজে-কলমে ৬৬ জন শিক্ষার্থী রয়েছে, কিন্তু নিয়মিত উপস্থিতি থাকে ৪০-৫০ জন।
বর্তমানে বিদ্যালয়ের শিশু শ্রেণিতে ১৫ জন, প্রথম শ্রেণিতে ১৩ জন, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১০ জন, তৃতীয় শ্রেণিতে ১২ জন, চতুর্থ শ্রেণিতে ৬ জন এবং পঞ্চম শ্রেণিতে মাত্র ১০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। অথচ বিদ্যালয়ে প্রতিমাসে শিক্ষক বেতন বাবদ সরকার ব্যয় হচ্ছে ১,১৮,৭২০ টাকা। যার বার্ষিক ব্যয় ১৪,২৪,৬৪০ টাকা।
বিদ্যালয়টি এবছর পেয়েছে স্লিপের ৫০ হাজার, রুটিন মেইটেনেন্সের ৪০ হাজার এবং প্রাক-প্রাথমিকের জন্য ১০ হাজার টাকাসহ মোট ১ লাখ টাকা। এছাড়া শিক্ষার্থীরা উপবৃত্তিসহ নিয়মিত সরকারি সব বরাদ্দ পাচ্ছে বিদ্যালয়টি। যা সব মিলে এ বিদ্যালয়ের জন্য সরকারের বার্ষিক ব্যয় প্রায় ১৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ সরকারি সব সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার পরও বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী দিন-দিন হ্রাস পাচ্ছে এবং অনিয়মের আখড়ায় পরিণত হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধ করতে না পারায় বিদ্যালয়টি দিন-দিন শিক্ষার্থীহীন হয়ে পড়ছে। বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটিও এ ব্যাপারে কোনো ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। এমনকি বিদ্যালয়ে ৫ জন শিক্ষক থাকার পরেও তারা শিক্ষার্থী বাড়ানোর বিষয়ে ন্যূনতম চেষ্টা করেনি বলে জানা যায়। বিদ্যালয়টি বন্ধ হওয়ার উপক্রম বলে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তারা তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীল মনিটরিং কথা বলেন।
এ ব্যাপারে আত্মপক্ষ সমর্থন করে প্রধান শিক্ষক মো. সেলিম খান বলেন, পাশে দুটি নূরাণী মাদরাসা থাকার কারণে তাদের শিক্ষার্থী কমে যাচ্ছে। টাকা উত্তোলনের বিষয়ে তিনি বলেন, সভাপতি দেশের বাইরে, তাই ব্যবস্থা করে টাকা তুলেছেন। তবে রেজুলেশনের বিষয়ে তিনি সদুত্তর দিতে পারেননি।
গত একমাসের মধ্যে ম্যানেজিং কমিটির সভা হয়নি উল্লেখ করে বিদ্যালয়ের সহ-সভাপতি আনোয়ার মিজি বলেন, সভাপতি প্রবাসে রয়েছেন। তিনি দু’তিন মাস পর-পর দেশে আসেন। বিদ্যালয়ের উন্নয়নের স্বার্থে আমরা নিয়মিত ম্যানেজিং কমিটির সভা করে থাকি।
ভারপ্রাপ্ত উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা একেএম মিজানুর রহমান জানান, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী হ্রাসের বিষয়টি ক্ষতিয়ে দেখা হবে এবং আগামি শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী বৃদ্ধির বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি বলেন, সভাপতির অনুপস্থিতিতে যিনি সহ-সভাপতি থাকবেন তিনি সভায় সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। তবে অর্থনৈতিক সংক্রান্ত কোন কাজ করতে পারবেন না।
তিনি আরো বলেন, সভাপতি দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতির বিষয়ে শিক্ষা অফিসকে না জানানো এবং সভাপতির স্বাক্ষর ছাড়া সরকারি বরাদ্দ টাকা উত্তোলন শিষ্টাচার বহির্ভূত। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
চাঁদপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহাব উদ্দিন বলেন, এ বিষয়ে জবাবদিহীতা নিশ্চিতকরণে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থাগ্রহণ করা হবে।
২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯।