হাজীগঞ্জের শিশুকে রামগঞ্জে নানার বাড়িতে নিয়ে হত্যা

সন্তানকে হত্যা করে মাটির নিচে পুঁতে রাখলেন সৎ মা

মোহাম্মদ হাবীব উল্যাহ্
হাজীগঞ্জ থেকে নিখোঁজ এক শিশুর মরদেহ নানার বাড়ির বসতঘরের মেঝের মাটির নিচে থেকে উদ্ধার করেছে রামগঞ্জ থানা পুলিশ। শিশুটিকে তার সৎ মা হত্যা করে মাটির নিচে পুঁতে রাখে। সোমবার (২৯ আগস্ট) বিকালে আহম্মেদ হোসেন নামের ৩ বছর বয়সি ওই শিশুর মরদেহ লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার দরবেশপুর গ্রামের চকিদার বাড়ির মোবারক কুট্টির বসতঘরের মাটি খুঁড়ে উদ্ধার করা হয়।
এর আগে গত শনিবার (২৭ আগস্ট) শিশু আহম্মেদ হোসেন নিজ বাসা থেকে নিখোঁজ হয় বলে জানান তার সৎ মা কোহিনুর বেগম। তিনি হাজীগঞ্জ উপজেলার বড়কুল ইউনিয়নের রায়চোঁ গ্রামের দক্ষিণ ছৈয়াল বাড়ির হাফেজ শাহমিরানের দ্বিতীয় স্ত্রী এবং লক্ষ্মীপুর জেলা রামগঞ্জ উপজেলার দরবেশপুর গ্রামের চকিদার বাড়ির মৃত মোবারক হোসেন কুট্টির মেয়ে।
এদিকে হাফেজ শাহমিরান কোহিনুর বেগমের দ্বিতীয় স্বামী। প্রায় ১৪ মাস আগে তাদের বিয়ে হয়। শাহমিরানের প্রথম স্ত্রীর ঘরের একমাত্র ছেলে আহম্মেদ হোসেন। অপর দিকে কোহিনুর বেগমেরও প্রথম স্বামীর ঘরে ৯ বছর বয়সী একটি ছেলে সন্তান রয়েছে এবং বর্তমানে তিনি ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। তিনি স্বামীর শাহমিরানের সাথে রায়চোঁ গ্রামের হাজি বাড়িতে ভাড়া বাসায় বসবাস করে আসছেন।
হত্যাকা-ের শিকার শিশু আহম্মেদ হোসেনের বাবা শাহমিরান জানান, তিনি পেশাগত কাজে ঢাকায় থাকেন। গত শনিবার তার স্ত্রী কোহিনুর বেগমের মাধ্যমে জানতে পারেন, ছেলে আহম্মেদ হোসেনের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। এরপর আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে খোঁজ করে শিশুটিকে না পাওয়ায় রোববার হাজীগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের লোকজন ওই বাড়ির পুকুরে নামে। এরপরও শিশুটিকে না পাওয়ায় বিষয়টি স্থানীয়দের মাঝে আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
পরে রোববার বিকালে হাজীগঞ্জ পৌরসভাধীন জিয়ানগর এলাকায় ধারণকৃত একটি ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরায় স্থানীয়রা দেখতে পান, শুক্রবার শিশুটিকে নিয়ে তার সৎ মা কোহিনুর বেগম চলে যাচ্ছেন, কিন্তু শনিবার তিনি একাই ফিরে আসেন। বিষয়টি সন্দেহজনক হওয়ায় তারা হাজীগঞ্জ থানা পুলিশকে বিষয়টি জানান। এরপর কোহিনুর বেগমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে আসে পুলিশ।
পরবর্তীতে হাজীগঞ্জ থানায় পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে কোহিনুর বেগম শিশু আহম্মেদ হোসেনকে হত্যার কথা স্বীকার করেন এবং মরদেহ তার বাবার বাড়ির বসতঘরের মাটিতে পুঁতে রাখেন বলে তথ্য দেন। এরপর হাজীগঞ্জ থানা পুলিশ হত্যাকা-ের বিষয়টি রামগঞ্জ থানা পুলিশকে জানায়।
খবর পেয়ে সোমবার দুপুরে রামগঞ্জ থানা পুলিশ হাজীগঞ্জ থানায় এসে কোহিনুর বেগমকে নিয়ে শিশুর মরদেহ উদ্ধারে কোহিনুর বেগমের বাবার বাড়ি যায়। এরপর তার দেখানো স্থান বাবার ঘরের বারান্দার (এক চালা টিনের কক্ষ) মেঝের মাটির নিচে পুঁতে রাখা অবস্থায় শিশু আহম্মেদ হোসেনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এসময় লক্ষ্মীপুরের সহকারী পুলিশ সুপার (রায়পুর সার্কেল) আব্দুল্লাহ মো. শেখ সাদী, রামগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. এমদাদুল হক, তদন্ত কর্মকর্তা কার্তিকসহ অন্যান্য কর্মকর্তা ও শিশুটির বাবা হাফেজ শাহমিরান, সৎ মা কোহিনুর বেগম, নানী রাহেলা বেগমসহ তাদের পরিবারের লোকজন উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে শিশু আহম্মেদ হোসেনের মরদেহ উদ্ধারকালীন সময়ে তার সৎ মা কোহিনুর বেগম উপস্থিত সংবাদকর্মীদের জানান, শুক্রবার রাতে শিশুটিকে তিনি লাথি দিয়েছেন। এতে শিশুটি মারা যায়। পরে তিনি ভয়ে কাউকে না জানিয়ে শিশুটিকে মাটিতে পুঁতে রাখেন।
এর আগে ওই বাড়ির লোকজনের সাথে কথা হলে তারা সংবাদকর্মীদের জানান, শুক্রবার দুপুরে শিশু আহম্মেদ হোসনেকে তার নানার বসতঘরের সামনে খেলাধুলা করতে দেখেছেন। তবে কোহিনুর বেগম কোনদিন শিশুটিকে নিয়ে বেড়াতে এসেছেন, আবার কোনদিন তিনি চলে গেছেন, তা কেউ জানাতে পারেননি। তবে রোববার দুপুর থেকে তাদের বসতঘরে তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখতে পান তারা।
তারা আরো জানান, কোহিনুর বেগমের বাবা মারা গেছেন। তারা ৪ বোন ও ১ ভাই। ভাই বিবাহিত, ঢাকায় থাকেন। কোহিনুরসহ ৩ বোনের বিয়ে হয়েছে। সবাই স্বামীর বাড়িতে থাকেন। অপর এক বোন (অবিবাহিত) সাথি আক্তার, তার মা রাহেলা বেগমকে নিয়ে বাড়িতেই থাকেন। যেদিন কোহিনুর বেগম শিশু আহম্মেদ হোসেনকে নিয়ে বেড়াতে এসেছেন সেদিন তার মা রাহেলা বেগম বাড়িতে ছিলেন। কিন্তু সাথি আক্তারকে বাড়িতে দেখতে পাননি বলে জানান।
এ বিষয়ে লক্ষ্মীপুরের সহকারী পুলিশ সুপার (রায়পুর সার্কেল) আব্দুল্লাহ মো. শেখ সাদী জানান, শিশুটির মা কোহিনুর বেগমের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী মরদেহ উদ্ধার এবং তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।
এসময় তিনি বলেন, সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে এবং পরবর্তীতে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থাগ্রহণ করা হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরো বলেন, এ ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত রয়েছে কিনা তা তদন্তসাপেক্ষে বলা যাবে।

৩০ আগস্ট, ২০২২।