হাজীগঞ্জে গত একমাস ধরে এভাবেই বন্ধ রয়েছে ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো
মোহাম্মদ হাবীব উল্যাহ্
দিন যত গড়াচ্ছে, দেশে করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) সংক্রমণে মৃত ও আক্রান্তের সংখ্যা আশংকাজনকহারে ততই বাড়ছে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সরকার কর্তৃক ঘোষিত ছুটি। বন্ধ সরকারি-বেসরকারি অফিস, আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। লকডাউন করা হচ্ছে একের পর এক জেলা ও উপজেলা। এমন পরিস্থিতিতে চাঁদপুর জেলাও পিছিয়ে নেই।
লকডাউনের কবলে পড়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন জেলার অন্যতম সমৃদ্ধ উপজেলা, হাজীগঞ্জের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা। এতে করে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী ও কর্মচারীরা। একে তো দোকান বন্ধ, তার ওপর মাস শেষে মোটা অংকের দোকান ভাড়াসহ অন্যান্য খরচ গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ যেন মরার ওপর খাঁড়ার ঘা।
এদিকে পরিবার-পরিজন নিয়ে কষ্টে থাকলেও লোক-লজ্জার কথা চিন্তা করে সহায়তা চাইছেন না তারা। সবচেয়ে বেশি বিপাকে রয়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। কয়েকজন মাঝারি ব্যবসায়ী জানান, এভাবে চলতে থাকলে তাদেরও ত্রাণ চাইতে হবে। ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বললে এমন তথ্যই উঠে আসে। গত কয়েকদিন হাজীগঞ্জ বাজারসহ উপজেলার হাট-বাজারগুলোতে পরিদর্শন করে দেখা গেছে, ঔষুধ ও মুদি দোকান ছাড়া সব ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে।
কথা হয় হাজীগঞ্জ বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মো. আনন্দ গাজীর সাথে। তিনি জানান, প্রায় মাসখানেক ধরে বন্ধ রয়েছে তার সিমন রেক্সিন, সানিম বেল্ট হাউজ ও সিমন বেল্ট কর্নার নামের তিনটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। যেখানে ১১ জন কর্মচারী রয়েছে। তাদের মাসিক বেতন ৯৩ হাজার, দোকান ভাড়া ৪২ হাজার, বিদ্যুৎ বিল ৫ হাজার ও ন্যাট বিল ৯০০ টাকা।
তিনি বলেন, এছাড়া লোনের টাকা এবং পারিবারিক ব্যয় (খাদ্য সামগ্রী ও ঔষুধ ক্রয়, গ্যাস বিল, বিদ্যু বিল, মোবাইল খরচ ইত্যাদি) সহ সব মিলিয়ে মাস শেষে প্রায় দুই লাখ টাকা পরিশোধ করতে হয়। শুধু আনন্দ গাজী নয়, একই কথা জানান মুক্তা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী খোরশেদ আলম। তিনি বলেন, প্রতি মাসে দোকান ও গোডাউন ভাড়া, স্টাফ বেতন এবং বিদ্যুৎ বিলসহ প্রায় লক্ষাধিক টাকা খরচ হয়, রয়েছে ব্যাংক লোন।
এই এক মাসে কোন ধরনের আয় নেই। উল্টো এতগুলো টাকা খরচ করে তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, দেশের যে অবস্থা, তাতে মনে হয় না সহসা মুক্তি পাবো। চলমান বৈশ্বিক বিপর্যয়ের কারণে এভাবেই দিশেহারা হয়ে পড়েছেন হাজীগঞ্জ বাজারসহ উপজেলার সব হাট-বাজারের প্রায় সব ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা। দোকানের আয়ে যাদের পরিবার চলে সেসব ব্যবসায়ীরা সীমাহীন কষ্টে দিন পার করছেন।
গত একমাস ধরে বন্ধ রয়েছে হোটেল-রেস্তোরাঁসহ অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান
প্রিন্স হোটেল এন্ড চাইনিজ রেস্টুরেন্টের পরিচালক বাহালুল আলম খোকন জানান, হোটেল বন্ধ থাকলেও ভাড়া বাবদ মাসিক ১ লাখ ৪২ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হয়। সাথে রয়েছে গ্যাস বিল ও বিদ্যুৎ বিল। প্রতিমাসে নিয়মিত গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল প্রায় ৩ লাখ টাকা পরিশোধ করতে হতো। এখন সব মিলিয়ে প্রায় দুই লাখ খরচ করতে হয়। সাথে রয়েছে সিসি লোন।
তিনি বলেন, হোটেলে ৯৫ জন স্টাফ রয়েছে। তাদের দৈনিক বেতন বাবদ প্রায় ২৮ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হতো। প্রথম কয়েকদিন স্টাফদের সহযোগিতা করেছি। কিন্তু হোটেল বন্ধ থাকায় এখন আর পারি না। তাই তারা মানবেতর জীবন-যাপন করছে। কি করবো আমরা, ব্যবসা তো হচ্ছে না। এভাবে আর কতদিন? তিনি ব্যবসায়ীদের বিষয়টি সব মার্কেট মালিক পক্ষকে ভেবে দেখার আহ্বান জানান।
হাজীগঞ্জ বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হায়দার পারভেজ সুজন জানান, এই বিপর্যয়কালীন সময়ে ক্রান্তিকাল পার করছে কিছ ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা। একে তো দোকান বন্ধ, তার ওপর মাস শেষে মোটা অংকের ভাড়া এবং ব্যাংক লোন। এ যেন মরার ওপর খাঁড়ার ঘা। নিয়মিত লেনদেন না থাকায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পুঁজি হারাতে বসেছে।
বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আলহাজ আসফাকুল আলম চৌধুরী জানান, ব্যবসার সাথে শুধুমাত্র ব্যবসায়ী জড়িত নয়। তাদের সাথে উৎপাদনকারী ও দোকানের স্টাফ জড়িত। এভাবে চলতে থাকলে সব ধরনের ব্যবসায়ীরা ক্ষতির সম্মুখিন হবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের অবস্থা সংকটাপন্ন।
তিনি বলেন, সরকারিভাবে প্রণোদনা অথবা স্বল্প সুদে কিংবা বিনা সুদে ঋণের ব্যবস্থা হলে, ব্যবসায়ীরা হয়তো কিছুটা ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারবে।
২০ এপ্রিল, ২০২০।
