মোহাম্মদ হাবীব উল্যাহ্
হাজীগঞ্জে করোনা ভীতিতে লাশ দাফনে দেখা দিয়েছে অহেতুক আতঙ্ক, অনীহা ও বিড়ম্বনা। করোনা উপসর্গ ও অন্যান্য রোগসহ স্বাভাবিকভাবে প্রতিনিয়ত উপজেলার কোন না কোন স্থানে দুই/চারজন লোক মারা যাচ্ছেন। আর এই মৃত ব্যক্তির মরদেহ নিয়ে পরিবারের লোকজনকে পড়তে হচ্ছে নানা জটিলতা ও বিড়ম্বনায়। করোনা ভীতিতে জনমনে অহেতুক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় লাশ দাফন বা সৎকারে এগিয়ে আসছে না পরিবারের লোকজনসহ আত্মীয়-স্বজনরা।
অথচ করোনা সংক্রমণ হওয়ার আগেও প্রতিনিয়ত উপজেলার কোন না কোন স্থানে দুই/চারজন লোক মারা যেতেন। ফলে যার যার ধর্মীয় রীতি এবং প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির দাফন বা সৎকার সম্পন্ন করা হতো। আর এই কাজ করতেন স্থানীয় দাফন কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরা। তাদের সহযোগিতা করতেন পরিবারের লোকজন ও স্থানীয়রা। কিন্তু গত ২৯ এপ্রিল উপজেলায় প্রথম করোনা আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হওয়ার পর এই চিত্র পাল্টে যায়। শুরু হয়, মৃতের প্রতি পরিবার ও সমাজের নির্দয় আচরণ।
দেখা গেছে, করোনা উপসর্গে ও অন্যান্য রোগে নিহতদের দাফনে মৃত ব্যক্তির গোসল ও কাফন জড়ানো এবং জানাযা পড়ানো ও কবর খননকারীরা তো দূরের কথা, পরিবারের লোকজন ও আত্মীয়-স্বজনরা অসহযোগিতা করছেন। ফলে মৃতদেহ দাফনে কয়েক ঘণ্টা, এমনকি দিন পার হয়েছে। আবার পারিবারিক কবরস্থানে মরদেহ দাফনে, বাড়ির লোকজন, স্থানীয় ও এলাকাবাসী বাঁধা প্রদান করেছেন এমন নজিরও উপজেলার রাজারগাঁও ও বলিয়া গ্রাম এবং হাজীগঞ্জ পৌর মহাশশ্মানে দেখা গেছে।
গত ২৯ মার্চ থেকে উপজেলায় অদ্যাবধি অর্ধ শতাধিক ব্যক্তি করোনা উপসর্গে মারা গেছেন। কিন্তু এই অর্ধ শতাধিক মৃত ব্যক্তির মধ্যে মাত্র চারজন মৃত ব্যক্তির করোনা পজেটিভ আসে। তারা হলেন- হাজীগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী বিদ্যা সাগর বনিক, জাহাঙ্গীর হোসেন ও আবুল কাশেম এবং রাজারগাঁও গ্রামের ফাতেমা বেগম। অথচ করোনা উপসর্গে নিহতদের দাফন ও সৎকারে পরিবারের লোকজনকে পড়তে হয়েছে নানা জটিলতা ও বিড়ম্বনায়।
এর মধ্যে রাজারগাঁও গ্রামের মৃত ফাতেমা বেগম ও বলিয়া গ্রামের মজিবুর রহমানের দাফন এবং একজন হিন্দু ধর্মালম্বী ব্যক্তির সৎকার স্থানীয়দের বাধার কারণে প্রশাসন ও পুলিশের হস্তক্ষেপে সম্পন্ন করা হয়েছে। এই অর্ধ-শতাধিক মৃত ব্যক্তির মধ্যে হিন্দু ধর্মাবলম্বী চারজন ছাড়া অন্যদের দাফন কাজ সম্পন্ন করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের চাঁদপুর জেলা ও হাজীগঞ্জ উপজেলা নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে গঠিত স্বেচ্ছাসেবক কমিটির সদস্যরা।
এসব স্বেচ্ছাসেবীরা নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ধর্মীয় বিধান ও প্রচলিত রীতি এবং স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী মরদেহের গোসল, কাফন (পোশাক) জড়ানো ও জানাযা পড়ানো এবং কবরস্থ করেছে। যা এখনো চলমান রয়েছে। এই কাজটি তারা সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় এবং বিনা পারিশ্রমিকে করে আসছেন। অথচ মৃত ব্যক্তিদের পরিবারের লোকজন, আত্মীয়-স্বজন এবং যারা স্থানীয়ভাবে এতোদিন মরদেহ দাফন-কাফনের কাজ করছেন তারা আজ মৃতদেহের পাশে নেই।
জনমনে করোনা ভীতির এই অহেতুক আতঙ্কের কারণে করোনা (কোডিভ-১৯) ছাড়াও অন্যান্য রোগ বা অসুস্থতা নিয়ে কেউ মারা গেলেই তাকে নিয়ে চলছে গুজব এবং দাফন নিয়ে জটিলতা। ফলে মৃত ব্যক্তিদের কবর দেয়ার ক্ষেত্রে স্বজনদের পড়তে হচ্ছে নানা জটিলতা ও বিড়ম্বনায়। মৃতের প্রতি এই নির্দয় আচরণ কারো কাম্য না হলেও এই পরিস্থিতির পেছনে গুজব, অজ্ঞতা এবং ধর্মীয় জ্ঞানের অভাব অনেকাংশেই দায়ী।
অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আইইডিসিআর’র বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মৃতের দেহ থেকে করোনা সংক্রমণ ছড়ায় না এবং মাটিতে লাশ দাফনে নেই কোনো ঝুঁকি। এজন্য তারা কিছু নিয়মকানুন ও পরামর্শ দিয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনও করোনা আক্রান্ত বা উপসর্গে কোন ব্যক্তির মৃত্যু হলে তার গোসল ও দাফন সম্পর্কে ইসলামের বিধান সংবলিত পরামর্শ অনুসরণ করতে বলেছে।
বিষয়টি নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন করোনা আক্রান্ত ও উপসর্গে মৃত ব্যক্তিদের দাফন বিষয়ক স্বেচ্ছাসেবক কমিটির টিম প্রধান ও দ্বীনি সংগঠন বাংলাদেশ মুজাহিদ কমিটির জেলা সাধারণ সম্পাদক মাও. যোবায়ের আহমেদ। তিনি জানান, মানুষ ভয়ে চরম আতঙ্কিত। পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের বন্ধনগুলো এক নাজুক পরিস্থিতির সম্মুখীন। মরদেহ ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ে থাকলেও কেউ এগিয়ে আসছে না এবং কেউ কাউকে দিয়ে সহযোগিতা করছে না। এমন বহু ঘটনার চাক্ষুস স্বাক্ষী আমি নিজেই।
তিনি বলেন, যে কোন মৃত্যুকে করোনা আক্রান্ত বা করোনা উপসর্গ মৃত্যু বলে মহল্লায় আতঙ্ক সৃষ্টি করতে না পারে, সে ব্যাপারে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের জরুরিভাবে উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। সাথে স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও খতিবদের অবশ্যই ধর্মীয় আলোকে মানুষকে বুঝিয়ে এমন অমানবিক আচরণ থেকে করে ফিরে আসার ব্যাপারে উৎসাহিত করতে হবে। বিষয়টা মৃত ব্যক্তির পরিবার ও স্বজনদের বুঝিয়ে দাফন কাজে স্বেচ্ছাসেবকদের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার জন্য উৎসাহ দেয়া প্রয়োজন বলে তিনি জানান।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এসএম সোয়েব আহমেদ চিশতী জানান, এখনো পর্যন্ত প্রমাণিত হয়নি যে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মৃতব্যক্তির দেহ থেকে সুস্থ কোন ব্যক্তির মধ্যে করোনাভাইরাস ছড়ায়। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে ‘করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মৃত ব্যক্তির শরীরে তিন ঘণ্টা পরে এই ভাইরাসের কার্যকারিতা থাকে না।’ তাছাড়া মৃতদেহ দাফন বা সৎকার করতে তিন/চার ঘণ্টা সময় এমনিতেই লেগে যায়। সুতরাং স্বাস্থ্যবিধি মেনে মরদেহ দাফন বা সৎকারে কোন ঝুঁকি নেই।
বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বৈশাখী বড়ুয়া সরব। তিনি তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেসবুকে এ ব্যাপারে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। পাঠকদের জন্য তা হুবহু তুলে ধরা হলো। ‘হাজীগঞ্জে করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তির দাফনসংক্রান্ত বিষয়ে কোন সমস্যা পরিলক্ষিত হলে উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে জানানোর জন্য অনুরোধ করছি। সৃষ্টিকর্তা আমাদের সকলের মঙ্গল করুন।’
১১ জুন, ২০২০।
