হাজীগঞ্জে গণস্বাস্থ্যের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর সরেজমিন পরিদর্শন

নিরপেক্ষ জাতীয় সরকার গঠনের আহ্বান

মোহাম্মদ হাবীব উল্যাহ্
হাজীগঞ্জে পূজামন্ডপে হামলা ও পুলিশ-জনতা সংঘর্ষে পুলিশের গুলিতে ৪জন নিহতের ঘটনায় উদ্ভুত পরিস্থিতি দেখতে সরজমিনে পরিদর্শনে এসেছেন ভাসানী অনুসারী পরিষদের চেয়ারম্যান ও গণস্বাস্থ্যের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। রোববার (১৭ অক্টোবর) তিনি ভাঙচুরকৃত মন্দির পরিদর্শন এবং নিহতদের কবর জিয়ারত ও স্বজনদের সমবেদনা জানান। এর আগে তিনি একটি স্থানীয় সংবাদকর্মীদের কাছ থেকে ঘটনার বিস্তারিত জানেন।
এ দিন সকালে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী তাঁর সফরসঙ্গীদের সাথে নিয়ে রাজা লক্ষ্মী নারায়ণ জিউর আড়খায় অবস্থিত ত্রিনয়নী সংঘ এবং রামকৃষ্ণ সেবাশ্রমে ভংাচুরকৃত পূজামন্ডপ পরিদর্শন করে হিন্দু সম্প্রদায় নেতৃবৃন্দের সাথে কথা বলেন। এরপর তিনি পুলিশের গুলিতে নিহত কিশোর হৃদয় হোসেনের বাড়িতে গিয়ে তার পরিবার ও নিহত আলামিনের পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানান এবং তাদের কবর যিয়ারত করেন।
বিষয়টি জাতির জন্য দুঃখজনক উল্লেখ করে নিহত হৃদয়দের বাড়িতে সংবাদর্মীদের উদ্দেশে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, দেশে যে ক’জন মন্ত্রী আছে তার মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল অন্যতম। সে একজন ভালো মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধা। উনি খুব সাধারণভাবে বললেন, আমি সব মন্দিরে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছি। আসলে তো উনার কথা কেউ শুনেনি। উনি যদি নিরাপত্তার ব্যবস্থাই করতেন, তাহেল হৃদয় কি মারা যেত?
তিনি বলেন, গোয়েন্দা সংস্থা তাকে (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) বোকা বানিয়ে দিয়েছে। কারণ, আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাতো ভারতীয় গোয়েন্দা বাহিনীর অধঃস্তন কর্মচারী। মৌলভীরা যখন নরেদ্র মোদির বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলো এবং পুলিশ তাদের ধরছিলো। তারা (মাদ্রাসা শিক্ষক) যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলো। উনি (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) একাধিকবার দেখা করেছিলেন। এটা ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা পছন্দ করেনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ ও ঘটনাস্থল পরিদর্শনের দাবি জানিয়ে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, আপনার এখন পদত্যাগ করা উচিত। যদিও দোষটা আপনার না। কারণ, আপনার কথা শুনে নাই এরা (গোয়েন্দা সংস্থা)। আপনাকে মিসলিড করেছে। একজন মুক্তিযোদ্ধাকে মিসলিড করেছে। অতটুকু যদি না করতে পারেন, তাহলে আপনি নিজে আসেন। যেই চারজন মারা গেছে, তাদের প্রত্যেকের বাড়িতে যান। প্রত্যেক ইমামদের যেকে আবেদন নয়, হুকুম করেন, প্রত্যেক আজানের (নামাজ) সময় যেন বলা হিন্দু-মুসলমান ভাই-বান।
তিনি আরো বলেন, আমি হাজীগঞ্জের পুলিশ ও সাংবাদিকদের ধন্যবাদ দিতে চাই। তাদের ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। তারা একত্রিত হয়ে জিনিসটাকে (হামলা ও সংঘর্ষ) ট্যাকেল দিতে পেরেছে। তা নাহলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারতো। কিছু ইয়াং ছেলেদের বিপথে নিয়েছে কিছু মৌলভী ও ধর্মান্ধ ব্যক্তি। আপনারা ঠেকাবার চেষ্টা করেছেন। আপনারা দেশপ্রেমিক সাংবাদিকের কাজ করেছেন। সুতরাং আপনাদের কৃতজ্ঞতা জানাই।
তিনি বলেন, যে মন্দিরগুলো ভেঙেছে, তার ক্ষতিপূরণ সরকারকে দিতে হবে। তাই দেরি নয় কাল (আজ) থেকেই দেওয়া শুরু করতে হবে। দ্বিতীয় হচ্ছে, পুলিশি পাহারা দিয়ে মসজিদ-মন্দির রক্ষা করা যাবে না, আমরা অন্তর দিয়ে রাখবো। আমরা সবাই মিলে আমার অপর (হিন্দু ধর্মালম্বী) ভাই-বোনকে রক্ষা করবো। এ সময় তিনি নিহত ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী আরো বলেন, সরকার সব হিন্দু-মুসলমানের জানমালের নিরপাত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এটা না হওয়ার একটাই কারণ হচ্ছে, দেশে গণতন্ত্র নেই। সরকারের এখন সময় এসেছে, পদত্যাগের মাধ্যমে জাতীয় সরকার গঠন এবং নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের এনে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা।
সংবাদকর্মীদের প্রশ্নের জবাব দিয়ে ভাসানী অনুসারী পরিষদের মহাসচিব শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু বলেন, এই ঘটনার জন্য সরকার একমাত্র দায়ী। এটা সরকারের ব্যর্থতা। আপনারা জানেন, এ দেশে একটি গণঅভ্যূত্থান আসন্ন। ঠিক এই সময়ে মানুষের দৃষ্টিকে অন্য খাতে প্রবাহিত করার জন্য, সরকার সুপরিকল্পিতভাবে মসজিদ-মন্দিরে হামলা করাচ্ছে। এই হামলার পিছনে জামায়াত-শিবির যেমনি দায়ী, সংগে সরকারি দলও দায়ী।
তিনি বলেন, মানুষের জানমাল নিরাপদ ও হেফাজত করার জন্য সংবিধান সরকারকে দিয়েছে। সে সরকার সেখানে ব্যর্থ হয়েছে। এজন্য সরকারকে আমরা ধিক্কার জানাই এবং এর প্রতিবাদ ও নিন্দা জানাচ্ছি। এ সময় ভাসানী অনুসারী পরিষদের প্রেসিডিয়াম সদস্য মুক্তিযোদ্ধা নঈম জাহাঙ্গীর, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রেস উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম মিন্টু, ৬৯‘ শহীদ আসাদের ছোট ভাই ডা. নুরুজ্জামান ও ভাসানী অনুসারী পরিষদের সদস্য ব্যারিস্টার সাদিয়া আরমানসহ বেশ কিছু নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, কুমিল্লা শহরের দিঘিরপাড়ের একটি দুর্গাপূজার মণ্ডপে হনুমান মূর্তির কোলে পবিত্র কোরআন শরিফ রাখার একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে বুধবার রাত আনুমানিক আটটার দিকে হাজীগঞ্জ-রামগঞ্জ সড়কের দিক থেকে হাজীগঞ্জ বাজারে দিকে একটি মিছিল আসে।
মিছিলটি বাজার প্রদক্ষিণ করে পশ্চিম বাজারস্থ রাজা লক্ষ্মী নারায়ন জিউর আখড়ায় অবস্থিত পূজামন্ডপে সামনে আসলে মিছিল থেকে কে বা কারা পূজামন্ডপের গেইটের দিকে ইট-পাটকেল ছুড়ে মারে। এতে ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশ মিছিলকারীদের প্রতিরোধের চেষ্টা করলে পুলিশের উপর ইট-পাটকেল ছুড়ে মারে মিছিলকারীরা।
এ সময় মিছিলকারীর পুলিশের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে হামলা চালালে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার সৃষ্টি হয় এবং পুলিশ আত্মরক্ষার্থে গুলি ছুড়ে। এদিকে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় এবং পুলিশের গুলিতে চারজন নিহত এবং ৪ জন আহত হয়। এছাড়া মিছিলকারীদের ইট-পাটকেলের আঘাতে ১৭ জন পুলিশসহ সাংবাদিক ও পথচারী আহত হয়েছেন।

১৮ অক্টোবর, ২০২১।