হাজীগঞ্জে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেওয়া হচ্ছে বার্ষিক পরীক্ষা

শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ‘ফি’ আদায়

 পরীক্ষা ফি ফেরৎ দেওয়া হবে: ক্লাস্টার কর্মকর্তা।
 জবাবদীহির আওতায় আনা হবে : উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা।
 বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে: উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা

মোহাম্মদ হাবীব উল্যাহ্
চলতি বছর সমাপনী (বার্ষিক) পরীক্ষা বাতিল করেছিল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠান তাদের শিক্ষার্থীদের পরবর্তী ক্লাসের জন্য মূল্যায়ন করবে। বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মাহবুব রহমান তুহিন। কিন্তু হাজীগঞ্জে সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ‘ফি’ নিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বার্ষিক পরীক্ষা।
শনিবার (১১ ডিসেম্বর) সরজমিনে পরিদর্শন করে দেখা গেছে, উপজেলার কালচোঁ উত্তর ইউনিয়নের ভাটরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও চিলাচোঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সব শ্রেণিতে বার্ষিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এছাড়া দ্বাদশগ্রাম ইউনিয়নের কাপাইকাপ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিয়ে নিজ নিজ বাড়িতে যাওয়ার পথে কয়েকজন শিক্ষার্থীর সাথে কথা হয়।
এ সময় বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা জানান, এই পরীক্ষা রাজারগাঁও ও রামপুর ক্লাস্টারের অন্যান্য বিদ্যালয়ে নেয়া হচ্ছে। অথচ কোভিড-১৯ মহামারি কারণে প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী (বার্ষিক) পরীক্ষা বাতিল করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রাণালয়। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ওয়ার্কশিটসহ (বাড়ির কাজ) বা অ্যাসাইনমেন্টের মতো কিছু পদক্ষেপের মাধ্যমে পরবর্তী শ্রেণিতে উন্নীত করার জন্য এই মূল্যায়ন করবে নিজ নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
এ দিন সরজমিনে দেখা গেছে, বিদ্যালয়গুলোতে বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাংলা এবং তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের গণিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এজন্য প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পরীক্ষা ফি বাবদ জনপ্রতি ২০ টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণির ৩০ টাকা, তৃতীয় শ্রেণির ৪০ টাকা, চতুর্থ শ্রেণির ৫০ টাকা এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৬০ করে নেওয়া হয়েছে।
চিলাচোঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী মানহা ও জিহাদ, তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী আব্দুল রাব্বী ও মারিয়া, ৪র্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মেশকাত ও নুরজাহান, পঞ্চম শ্রেণি শিক্ষার্থী ইউনুস ও আব্দুর রহমানসহ অন্যান্য শিক্ষার্থীরা জানান, আজ তাদের যথাক্রমে বাংলা ও গণিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত এবং বার্ষিক পরীক্ষার ফি বাবদ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ক্রমান্বয়ে জনপ্রতি ৩০, ৪০, ৫০ ও ৬০ টাকা নেওয়া হয়েছে।
ভাটরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী নুরুন নাহান, তাপান্না ও মাহিমা, তৃতীয় শ্রেণির উম্মে হাবিবা, নুসরতা জাহান ও চতুথ শ্রেণির শিক্ষার্থী আব্দুল কাইয়্যুম ও মুনতাহি জাহানসহ অন্যান্য শিক্ষার্থীরা জানান, তাদেরও আজ গণিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং বার্ষিক পরীক্ষার ফি বাবদ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ক্রমান্বয়ে জনপ্রতি ৩০, ৪০ ও ৫০ টাকা নেওয়া হয়েছে।
অপরদিকে কাপাইকাপ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী সাদিয়ার সাথে কথা হলে তিনি বলেন, আজ তাদের বাংলা পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং পরীক্ষার ফি বাবদ ২০ টাকা নেওয়া হয়েছে। উল্লেখিত তিন বিদ্যালয়ে প্রায় চার শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে। এর মধ্যে চিলাচোঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ৮৯ জন, ভাটরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৩৬জন এবং কাপাইকাপ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের সাথে কথা বলতে না পারায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা জানা যায়নি।
এ বিষয়ে চিলাচোঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ মনজুর হোসেন জানান, বার্ষিক পরীক্ষা নয়, মূল্যায়ন পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। পরীক্ষা ফি বিষয়ে তিনি বলেন, পরীক্ষার প্রশ্ন ও খাতা ক্রয় বাবদ ন্যূনতম একটা ফি (টাকা) শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে। তার বিদ্যালয় ছাড়াও ওই ক্লাস্টারের অন্যান্য বিদ্যালয়গুলো এই মূল্যায়ন পরীক্ষা নিচ্ছে বলে তিনি জানান।
ভাটরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম তিনিও বলেন, বার্ষিক পরীক্ষা নয়, মূল্যায়ন পরীক্ষা নিচ্ছেন। তবে অভিভাবকদের চাহিদার ভিত্তিতে এবং ক্লাস্টার কর্মকর্তার (সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা) অনুমতি নিয়েই তারা এই পরীক্ষা নিচ্ছেন এবং পরীক্ষার প্রশ্ন তৈরি ও ফটোকপি এবং খাতা ক্রয় বাবদ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফি আদায় করা হয়েছে।
এদিকে কাপাইকাপ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তুহিন হায়দার শিশিরের ব্যবহৃত মুঠোফোনে কয়েকবার ফোন দিলে, তিনি রিসিভ এবং পরবর্তীতে সংবাদ লিখা পর্যন্ত ফোনব্যাক না করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
পরীক্ষার বিষয়টি অবগত জানিয়ে রামপুর ক্লাস্টার কর্মকর্তা ও সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আনিসুর রহমান জানান, সরকারিভাবে সমাপনী পরীক্ষা নেওয়ার নির্দেশনা নেই। তাই আমরা কাউকে পরীক্ষা নেওয়ার নির্দেশনা দেইনি। তবে অভিভাবকদের চাহিদার ভিত্তিতে বিদ্যালয়গুলো মূল্যায়ন পরীক্ষা নিচ্ছে।
এ সময় তিনি বলেন, মূল্যায়ন পরীক্ষার ফি বাবদ টাকা নেওয়ার কথা আমি জানি না। যদি কেউ ফি নিয়ে থাকে, তাহলে শিক্ষার্থীদের সেই টাকা (ফি) ফেরৎ দেওয়া হবে।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবু সাইদ চৌধুরী বলেন, পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়টি আমি জানি না। যেহেতু পরীক্ষা নেওয়ার সরকারি নির্দেশনা নেই, সেহেতু যদি কোন বিদ্যালয় পরীক্ষা নেয়, তাহলে তাকে অবশ্যই জবাবদীহিতার আওতায় আনা হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোমেনা আক্তার জানান, পরীক্ষার বিষয়টি আমার জানা নেই, এখন আপনার মাধ্যমে জানতে পারলাম। তিনি বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী প্রাথমিকের সমাপনী পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। এখন উপজেলার কোন কোন বিদ্যালয় পরীক্ষা নিচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা হবে। এ সময় তিনি আরো বলেন, এ বিষয়ে শিক্ষা কর্মকর্তার সাথে কথা বলে আগামিকাল (আজ রোববার) প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগ্রহণ করা হবে।

১২ ডিসেম্বর, ২০২১।